জাতীয় সংসদে সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করবেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা- এটাই স্বাভাবিক। দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থেই জাতীয় কিংবা জনস্বার্থ-সংশ্নিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যের প্রয়োজন জরুরি। প্রায় প্রত্যেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই এমনটি দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যতিক্রম ঘটনাই দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। সম্প্রতি সরকারি দলের সদস্যরাই সরকারের কাজের সমালোচনা করছেন। এ ক্ষেত্রে ৭০ ধারার 'জুজু' তাদের নিবৃত্ত করতে পারেনি। তারা প্রমাণ করে দিলেন, প্রয়োজনে এই 'জুজু' অকার্যকর। ৭০ ধারায় নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোটদানের কথা বলা হয়েছে। সমালোচনা করতেও বাধা দেওয়া হয়নি। তেমনি পরামর্শ দিতেও কোনো প্রতিবন্ধকতা নয় ৭০ ধারা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, এটা জানার পরও দলীয় সমালোচনা থেকে বিরত থাকেন সংসদ সদস্যরা। সেই হিসেবে বলতে হয়, এবার এর ব্যত্যয় ঘটালেন এবং এ জন্য নন্দিতই হলেন সরকারি দলের ক'জন সংসদ সদস্য।

সরকারি দলের সংসদ সদস্য কুমিল্লার আলী আশরাফ অর্থ পাচার নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটালেন জাতীয় সংসদে। সরকারি দলের আরেক সদস্যও তার সুরেই কথা বললেন। বিরোধী সদস্যদেরও দেখা গেল একই বিষয়ে আলী আশরাফের মতোই অভিমত ব্যক্ত করতে। বিরোধী দলের দুর্বল অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে উত্তাপহীন ছিল জাতীয় সংসদ, যে কারণে গণমাধ্যমও দুর্বল ট্রিটমেন্ট দিতে থাকে সংসদের খবরগুলো। হঠাৎ করেই পত্রিকাগুলোতে প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হলো 'বড় চোরদের দুর্নীতিতে মাথা হেঁট হয়ে যায়...' শিরোনামের সংবাদ। তাও আবার সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্য উদ্ৃব্দত করে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যও ছিল ব্যতিক্রমী, যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত সংবাদে গুরুত্বের সঙ্গে জায়গা পায়। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আলী আশরাফ সংসদে বলেছেন, 'বড় চোরদের দুর্নীতি, অর্থ পাচারের কারণে ঘৃণা ও লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। এসব বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা না বাড়ালে, দুর্নীতি বন্ধ করা না গেলে বাজেটের লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না।' এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনের কথা। সাধারণ জনমনের কথা সংসদ সদস্য যেভাবে তুলে ধরেছেন, তাতে তিনি সাধুবাদ পেতেই পারেন।

বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাও সরকারের স্বাস্থ্য খাত, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের এমন সমালোচনা সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পদ্ধতিতে স্বাভাবিক এবং কাঙ্ক্ষিতও। কিন্তু একসময় বিরোধীদলীয় সদস্যদের আক্রমণের পর যেভাবে পাল্টা আক্রমণে তাদের নাস্তানাবুদ হতে দেখেছি, এই অধিবেশনে তেমনটা দেখা যায়নি। শুধু তাই নয়, সরকারদলীয় সদস্যদের সুর আর বিরোধীদলীয় সদস্যদের সুরে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায়নি। সংসদীয় কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমনটিই তো প্রত্যাশিত। এর ফলে বিকশিত হয় গণতন্ত্র এবং জাতিও উপকৃত হয়।

জাতীয় পার্টির জি এম কাদের এবং কাজী ফিরোজ রশীদও একইভাবে কড়া ভাষায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেন। তার মানে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল সবাই একমত হয়েছেন, দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে এবং সবাই এও উপলব্ধি করছেন, এই দুরাচার বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। সাধারণত বিরোধীদলীয় সদস্যরা যখন কোনো আলোচনা-সমালোচনা করেন, এর বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন সরকারদলীয় সদস্যরা। পাল্টা যুক্তি-তর্কও উপস্থাপন করেন সেই আলোকেই। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সমালোচনার জবাব দেন আত্মপক্ষ সমর্থন করে গতানুগতিকভাবে। ওই দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের বক্তব্য খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য সংসদের বাইরেও তার মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ও স্বাস্থ্য খাতের অসাধুদের পক্ষেই কথা বলেন এমন অভিযোগ ইতোমধ্যে উঠেছে। সাংবাদিক রোজিনাকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে যখন তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল তখনও তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিমুক্ত প্রমাণে ব্যস্ত ছিলেন- এমনটি যেমন দেখা গেছে তেমনি সংবাদমাধ্যমেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। জাতীয় সংসদেও তাকে সেই পথেই হাঁটতে দেখা গেল।

কিন্তু অর্থ ও ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-অস্বচ্ছতা নিয়ে যখন ওই দিন সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের আলোচনা হচ্ছিল তখন অর্থমন্ত্রীকে ভিন্ন রকম অবস্থান গ্রহণ করতে দেখা গেল। এ জন্য তাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানানো যেতে পারে। তিনি সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। তাদের সুরে সুর মিলিয়ে বলেছেন, 'হ্যাঁ, অর্থ পাচার রোধ করতে হবে।' এর মানে হচ্ছে, তিনিও স্বীকার করে নিলেন দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। অবশ্য অর্থ পাচারকারীদের তালিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, তাদের কোনো তালিকা তার কাছে নেই। ওই দিন তিনি জাতীয় সংসদে যে বক্তব্য রেখেছেন, এমন প্রশ্নের সৃষ্টি হতে পারে অর্থ পাচারকারীদের তালিকা তার কাছে না থাকার বিষয়ে। হ্যাঁ, তিনি এমনটা বলতে পারেন একজন ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে এই বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থেকেই যায়। কারণ অর্থ পাচার বন্ধ করার দায়িত্ব সরকারের। সে ক্ষেত্রে পাচারকারীদের চিহ্নিত করার প্রশ্নটিই সর্বাগ্রে এসে যায়।

এ প্রসঙ্গে প্রকাশিত একটি সংবাদের উল্লেখ করা যায়। গত ১৮ নভেম্বর মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, 'রাজনীতিবিদরা নন, বিদেশে অর্থ পাচার করেন সরকারি চাকরিজীবীরা।' হয়তো বেগমপাড়া উদাহরণের মাধ্যমে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বেগমপাড়ার সংবাদও তো অনেক আগেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। সুতরাং পাচারকারীদের তালিকা না থাকা কিংবা তাদের চিহ্নিত করতে না পারাটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। আর অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী তালিকা না থাকার বিষয়ে পি কে হালদারের প্রসঙ্গটিও আলোচনায় আসতে পারে। পাচারকারীরা তো পি কে হালদারের মতোই ব্যক্তিবিশেষ। এমন অনেক প্রশ্নের পরও জাতীয় সংসদে এমন আলোচনা-সমালোচনা ইতিবাচক হিসেবেই জনপরিসরে আলোচনায় এসেছে। জাতীয় ইস্যুতে সংসদ সদস্যরা যদি মন্ত্রণালয়ের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক করেন ও যথাযথ পরামর্শ এবং তথ্য সরবরাহ করেন, তাহলে আপাতদৃষ্টিতে তা সরকারের জন্য বিব্রতকর মনে হলেও জাতীয় স্বার্থরক্ষায় তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে। জাতীয় সংসদ কার্যতই হয়ে উঠুক এরই ইতিবাচক ক্ষেত্র। জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে যে আলোচনা হলো- অর্থ পাচার, ব্যাংক খাতসহ স্বাস্থ্য খাত নিয়ে, তা ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবে। এমন দৃষ্টান্ত আরও সৃষ্টি হোক।

সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

বিষয় : অর্থ পাচার মোস্তফা হোসেইন

মন্তব্য করুন