ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় বর্তমান সরকারের রয়েছে, এর অন্যতম উদ্দেশ্য সরকারি বিভিন্ন পরিষেবা প্রাপ্তির পথ সহজ কিংবা বিড়ম্বনামুক্ত করা। সরকার সেই লক্ষ্যেই নাগরিকদের পরিষেবা প্রাপ্তির জন্য কিছু জরুরি হেল্পলাইন ইতোমধ্যে চালু করেছে। এসব হেল্পলাইনের মাধ্যমে উপকারভোগীর সংখ্যা কম না হলেও ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া কিংবা সেবাবঞ্চিত হওয়ার নজিরও রয়েছে। শনিবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এরই প্রতিফলন দেখা গেছে। করোনা দুর্যোগকালে ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে মানুষ যেন করোনাভাইরাস সম্পর্কে তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শ, খাদ্যসহ বিভিন্ন সহায়তা পায়, এজন্য সরকারের এক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের অধীন এই কল সেন্টারটির সেবার আওতা বাড়ানো হয়। কিন্তু সমকালের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৩৩ নম্বরে ফোন করেও খাদ্যসহায়তা পাননি আট জেলা ও ৯ নগরীর কেউই! দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং এটুআই কর্মসূচি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২৫ এপ্রিল থেকে ৮ জুন পর্যন্ত ত্রাণ সহায়তার জন্য ১৪ লাখ সাত হাজার ১৩৭টি ফোনকল আসে ৩৩৩ নম্বরে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে এক লাখ ১০ হাজার ৩১ জনকে প্রাথমিকভাবে সহায়তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, জরুরি পরিষেবা প্রাপ্তির জন্য ফোনকলের যে ব্যবস্থা করা হলো, এর পরও যদি মানুষ সহায়তাবঞ্চিত হয় কিংবা এর প্রক্রিয়ায় এত জটিলতা জিইয়ে থাকে, তাহলে 'জরুরি' শব্দটির তাৎপর্য কী?

আমরা জানি, করোনা দুর্যোগে মানবিক সহায়তার জন্য এ পর্যন্ত ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এই হিসাবে কয়েক কোটি পরিবার সুবিধাভোগী হওয়ার কথা। এ ব্যাপারে সরকারের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যে বক্তব্য রেখেছেন, তাতে একদিকে সমন্বয়ের অভাব যেমন স্পষ্ট, তেমনই আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রবণতাও পরিস্কার। আমরা জানি, যে কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পথ যখন সৃষ্টি হয়, তখন কিছু স্বার্থান্বেষী বক্রপথের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ওঠে। জরুরি সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশায় যারা সরকারি পরিষেবার নির্দিষ্ট ফোনকল সেন্টারে ফোনে সহায়তা চাইবেন, তা যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তা আমরা অস্বীকার করি না। কিন্তু এ জন্য প্রক্রিয়া কি এত প্রলম্বিত হবে কিংবা আবেদনকারীর আবেদন আমলেই নেওয়া হবে না? আমরা এও জানি, চলমান মহামারিতে কর্মহীন ও বিপন্ন মানুষের তালিকা অনেক দীর্ঘ হয়েছে। এমতাবস্থায় খাদ্য সহায়তার জন্য ভুক্তভোগীদের চাপ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় কোনোভাবেই ভুক্তভোগীদের সেবা কিংবা সহায়তাবঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না। ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে সহায়তা চাওয়ায় নারায়ণগঞ্জের অসহায় ফরিদ উদ্দিনের নাজেহাল হওয়ার ঘটনা দূর অতীতের নয়। দেশে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা চলমান থাকলেও এসবের অনায়াসপ্রাপ্তি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় জন-আস্থায় চিড় ধরছে। বাংলাদেশ পুলিশের পরিচালিত 'জাতীয় জরুরি সেবা হেল্প ডেস্ক ৯৯৯' অনেকাংশেই আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে। কিন্তু ৩৩৩ কল সেন্টার সেই আস্থা অর্জন করতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সফল হয়নি।

৯৯৯ যদি পারে, ৩৩৩ পারবে না কেন? সরকারের মহৎ উদ্যোগ সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের উদাসীনতা কিংবা স্বেচ্ছা মনোভাবের কারণে ভেস্তে যাবে তা হতে পারে না। অনেক অনাস্থার মধ্যেও ৯৯৯ কল সেন্টার যে আস্থার জায়গা জনমনে সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, আমরা সরকারি সব পরিষেবার ক্ষেত্রেই এমন অনায়াসপ্রাপ্তি প্রত্যাশা করি। যদিও এ ক্ষেত্রে খণ্ডিত কিছু বিড়ম্বনার অভিযোগ আছে, তার পরও আমরা মনে করি, যেসব জরুরি সেবার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। মহৎ কার্যক্রমের আস্থায় যেন চিড় না ধরে, সেদিকে সতর্ক নজর রাখা জরুরি। কেন ৩৩৩ নম্বরে জরুরি খাদ্যসহায়তা চেয়ে বিপুলসংখ্যক ভুক্তভোগী সেবাবঞ্চিত হলেন, তার অনুসন্ধানক্রমে প্রতিকার জরুরি। জরুরি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরকারের প্রচেষ্টার সুফল যাতে ভুক্তভোগীরা যথাযথভাবে পান, তা নিশ্চিত করতেই হবে।

বিষয় : জরুরি সহায়তা

মন্তব্য করুন