জন্ম থেকে হোঁচট খেতে খেতে এখন কৈশোরে পা রাখতে যাচ্ছে উত্তরের মানুষের স্বপ্ন-ফসল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। চারজন উপাচার্য বদল হয়ে এখন পঞ্চম উপাচার্যের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়। বিগত চারজন উপাচার্যের একজনও সুস্থ-স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিদায় নিতে পারেননি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতা হলো, সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে সবসময় ভিসিবিরোধী পক্ষই এগিয়ে থাকে। ফলে দেশবাসীর সামনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মানেই একজন নেতিবাচক মানুষ হিসেবে পরিচিত। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবনমনের জন্য এককভাবে উপাচার্যরা দায়ী ছিলেন না। দ্বিতীয় উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের একটা অংশ তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। অভিযোগ- দুর্নীতি ও আত্মীয়করণ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেকটা সত্য হলেও, তার হাত ধরেই গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো দাঁড়িয়েছে। তার হাতেই অনেক মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। তার প্রচেষ্টায় ১০ তলা শেখ হাসিনা হল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াজেদ মিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট অনুমোদন হয়েছে। ইতিবাচক অর্থে গোটা বিশ্ববিদ্যালয় এখন যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটা তার হাতেই। তার পরও এক শ্রেণির শিক্ষক-কর্মকতার দ্বন্দ্ব লেগেছিল ক্ষমতা, আক্রোশ, ব্যক্তিস্বার্থ ও ইগোর কারণে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বার্থ কোনো বিবেচনাই ছিল না। এ আন্দোলনের বলি হয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থী, আর মিডিয়া তাদের একচেটিয়া সমর্থন দিয়ে সংবাদ প্রচার করে যাচ্ছিল। তার পরও প্রফেসর নূর-উন নবী এসে ঘোষণা দিয়েছিলেন- আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্যামব্রিজ, হার্ভার্ডের মতো উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয় বানাব। তিনি চলে যাওয়ার পর দেখা গেল, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় তো অনেক দূরের ব্যাপার; এটা আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেও ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না। তারপর অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ এসে ঘোষণা দিলেন- আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবট আনব, হার্ভার্ড-ক্যামব্রিজ না হলেও সিঙ্গাপুরের আদলে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দাঁড় করাব। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি অংশ তার অনুগত পোষ্য হলো, আর বঞ্চিত অংশ ততক্ষণে রাস্তায়। তিনি আন্দোলনে অবরুদ্ধ হওয়ার ভয়ে ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিস খুলে সেখানে বসে প্রায় গোটা উপাচার্য-কাল পার করে দিলেন। তার সঙ্গে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি অংশ সবসময় ছিল। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া চালু করে গেছেন; পরিবহন পুলে বেশকিছু নতুন গাড়ির সংযোজন ঘটিয়েছেন; উঁচু-নিচু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অনেকটা লেভেলিং করার চেষ্টা করেছেন; শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আইডি কার্ড নিশ্চিত করেছেন; অফিস ফাইল সিস্টেমকে অনলাইন বেজ করেছেন। দেশবাসী এসব জানে না। দেশবাসী জানে, তিনি 'ড্যান্সার'। তিনি রাত ৩টায় ক্লাস নেন; ঢাকায় বসে বিশ্ববিদ্যালয় চালান আর ক্যাম্পাসে তার নামে হাজিরা খাতা খোলা হয়। তবে দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, কোনো উপাচার্যই একাডেমিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সেশনজটমুক্ত করা কিংবা বলা যায়, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ বিবেচনায় আলাদা কোনো ভূমিকা রাখেননি। আর শিক্ষার্থীরাও নিজেদের প্রয়োজনে কোনো আন্দোলন করেনি। তারা শুধু ব্যবহূত হয়েছে।
যেহেতু একটা বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে হলে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রয়োজন; সেহেতু এখানে উপাচার্যরা এসেই এক দল শিক্ষক-কর্মকর্তার খপ্পরে পড়েন। সেই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কাজই হলো তাদের বিরোধীপক্ষের প্রতি বিষোদ্গারে নিয়োজিত থাকা। একই রেকর্ড কানের কাছে সারাক্ষণ বাজতে থাকায় উপাচার্যরাও এক সময় খেই হারিয়ে ফেলেন। যেখানে সিস্টেমেটিক ওয়েতে প্রফেসর, ডিন, বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগের প্রধানদের নিয়ে তার চলার কথা; সেটা না করে তিনি চলেন তার অন্ধ সমর্থকগোষ্ঠী নিয়ে। যেহেতু উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতার মূল কেন্দ্র, সেহেতু তার সমর্থকগোষ্ঠীর শত অপকর্মও তিনি এড়িয়ে চলেন। অন্যদিকে বিরোধীপক্ষের সামান্য অপরাধে খÿহস্ত হন। করেন হামলা-মামলা ও বহিস্কার।
পঞ্চম উপাচার্যের হাতে এখন বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার পদে বসে বছরের অধিক সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়কে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি উপাচার্য পদে বসার সঙ্গে সঙ্গে আগের ভিসির সঙ্গের দল, ভিসিবিরোধী দল ফুলেল শুভেচ্ছার বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছে। সবাই আবার আশাবাদী- আঁধার কেটে এই দুঃখিনী বিশ্ববিদ্যালয়ে আলো ফিরে আসবে। সত্যিই সেটা আসবে কিনা, বোঝার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
shafiqibs@yahoo.com

বিষয় : উচ্চশিক্ষা ড. শফিক আশরাফ

মন্তব্য করুন