কভিড-১৯ থেকে কার্যকর সুরক্ষায় বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকটি সংস্থা ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। এর মধ্যে অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। এরপরে রয়েছে ফাইজার-বায়োএনটেক এবং মডার্নার ভ্যাকসিন। এ ছাড়া রয়েছে রাশিয়ান স্পুটনিক-ভি এবং চীনের সিনোফার্মের ভ্যাকসিন। ভারতীয় একাধিক সংস্থাও কভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ান ভ্যাকসিন স্পুটনিক-ভি অনেক আগে আবিস্কৃত হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর বাজারজাতকরণ হয়নি। কারণ এই ভ্যাকসিন শুধু রাশিয়ান নাগরিকদের বিতরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ফাইজার-বায়োএনটেক এবং মডার্নার ভ্যাকসিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ প্রশাসন কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকার বাজারজাতকরণ শুরু করে। অন্যদিকে ফাইজার-বায়োএনটেকের ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করা কঠিন। কারণ এটি ৭০ ডিগ্রি নিচের তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে বাংলাদেশে এই টিকা প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন।
বিভিন্ন ভ্যাকসিনের সুবিধা এবং অসুবিধা বিবেচনায় বাংলাদেশের মতো দেশে অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত। এর পক্ষে প্রথম যুক্তি হলো- এই টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা অন্যান্য ভ্যাকসিনের তুলনায় বেশি ছিল বিধায় ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান দাবি করে, এই ভ্যাকসিন কার্যকরভাবে কভিড-১৯-এর সংক্রমণের বিরুদ্ধে মানুষকে রক্ষা করতে সক্ষম। দ্বিতীয় যুক্তি হলো, এই ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কারণ এটি সাধারণ তাপমাত্রায় (২ থেকে ৪ ডিগ্রি) সংরক্ষণ করা যায়। তৃতীয় যুক্তি হলো, ফাইজার-বায়োএনটেক ভ্যাকসিনের তুলনায় এই ভ্যাকসিনের দাম কম। সর্বশেষ যুক্তি হলো, অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ রয়েছে। ফলে এই ভ্যাকসিন আমাদের কাছে সহজলভ্য। বাংলাদেশের একশ্রেণির মানুষ ভ্যাকসিন ক্রয়ের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন ক্রয়ে সরকারের সক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান ছিল। এমনকি সরকার এই ভ্যাকসিন বিনা খরচে জনগণকে প্রদান করবে কিনা, তা নিয়েও তাদের সন্দেহ ছিল। তবে তাদের সব সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে সরকার ভ্যাকসিন কূটনীতির ক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, সেরাম ইনস্টিটিউট তাদের চালান বাংলাদেশে পাঠানো শুরু করেছিল। সেরামের চালানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে ৩.৩ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন দেশে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে গণটিকা প্রদান কর্মসূচি শুরু করে। টিকাদান কর্মসূচি খুব ভালোভাবেই চলছিল। তবে কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় তরঙ্গে ভারতের পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় দেশটির সরকার ভ্যাকসিন রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাতে সেরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে ভ্যাকসিনের চালান স্থগিত করতে বাধ্য হয়। ফলে বাংলাদেশে টিকাদান প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ভ্যাকসিন না আসায় বাংলাদেশ সরকার অন্যান্য ভ্যাকসিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সন্ধান শুরু করে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার পর সরকার রাশিয়ার স্পুটশিক-ভি এবং চীনের সিনোফার্মের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। চীনের সঙ্গে বেশ কয়েক দফা আলোচনার পর বাংলাদেশ সরকার ১৫ মিলিয়ন টিকা ক্রয়ের জন্য সিনোফার্মের সঙ্গে আলাদা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্যে চীন সরকার উপহার হিসেবে বাংলাদেশকে ১.১ মিলিয়ন টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষ বিমান উপহারের টিকাগুলো দেশে নিয়ে আসে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে টিকা প্রদান পুনরায় শুরু করে। তবে চীন থেকে ক্রয় করা ভ্যাকসিন দেশে আনার ক্ষেত্রে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হয় টিকা ক্রয়ের মূল্য প্রকাশ হওয়ার ফলে। বাংলাদেশের তরফ থেকে চীন সরকারের কাছে এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হলেও টিকা পাঠানোর ব্যাপারে চীনের সিদ্ধান্ত এখনও জানা যায়নি। একটি বিষয় পরিস্কার যে, ডব্লিউএইচও ভ্যাকসিন বিতরণে সমতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং চীনসহ বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলো এ পর্যন্ত উৎপাদিত টিকার সিংহভাগ ব্যবহার করেছে। এখন টিকা বিতরণের ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করার বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইতোমধ্যে ভারতের বিদেশমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, আঞ্চলিক দেশগুলোয় ভ্যাকসিন রপ্তানির বিষয়ে ভারত সরকার তাদের সিদ্ধান্ত জুলাই-আগস্টে পুনর্বিবেচনা করতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত ভারত থেকে ইতোমধ্যে ক্রয়কৃত টিকা দেশে আনতে এ সুযোগ কাজে লাগানো। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হওয়ায় এই টিকার প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থা তৈরি হয়েছে। ভ্যাকসিন কূটনীতিতে আমরা ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্য প্রত্যক্ষ করেছি। বিশ্বজুড়ে অনেক সরকার যখন টিকার সংগ্রহের জন্য লড়াই করছে, তখন বাংলাদেশে ১০ মিলিয়নের বেশি মানুষ ইতোমধ্যে ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখতে চাই। আমরা প্রত্যাশা করি, বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ দুটি খুব শিগগিরই ভ্যাকসিন-সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাবে। অতিমারি চলাকালীন একটি দেশের জাতীয় নীতির সম্প্রসারণ হিসেবে বিপর্যয়কর পরিণতি মোকাবিলায় সরকারের পররাষ্ট্রনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভ্যাকসিন কূটনীতির কৌশল পুনর্বিবেচনা করে ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দেশে টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করে গণটিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু করার মধ্যমে দেশের জনগণকে করোনার ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করার এটাই মোক্ষম সময়।
অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়