আবার বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। আমরাও ফের পড়লাম বিস্ম্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে। লক্ষণীয়, ব্রিটেনে ৩০ জুন নতুন করে ২৬ হাজার মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। সমগ্র ইউরোপেই নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা আরও বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৫ দিনের লকডাউন চলছে, জাপানে চলছে করোনার তৃতীয় ঢেউ। বাংলাদেশে প্রতিদিন করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার বেড়ে চলেছে। করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে অনেকটা ভেঙে পড়েছে গোটা বিশ্বের চিকিৎসাব্যবস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১ জুলাই সতর্ক করে বলেছে, 'বিশ্বে করোনার ডেলটা ধরন ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে।' ইতোমধ্যে ডেলটা ধরন বিশ্বের ৯৬টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

এমতাবস্থায় নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে ব্রিটেন। করোনার নতুন ধরন থেকে দেশবাসীকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সেপ্টেম্বর থেকে বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বরে শীতের আগে ব্রিটেনের তিন কোটিরও বেশি মানুষকে বুস্টার ডোজ দেওয়া প্রয়োজন। করোনা রুখতে টিকাদান কর্মসূচি অত্যন্ত সফল বলে দাবি করেছে ব্রিটেন। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রীর দাবি, 'দেশটির ৮৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ককে প্রথম টিকা ও ৬২ শতাংশের দুটি টিকাই নেওয়া হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে যাতে নতুন প্রজাতিসহ ফ্লুর হাত থেকে তাদের রক্ষা করা যায়, শীতের আগে সে পরিকল্পনাই চলছে।' তবে টিকাদান কর্মসূচি সফল হলেও শীতের আগেই ফ্লুসহ করোনার নিত্যনতুন ধরনের আক্রমণের হাত থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে বুস্টার ডোজের প্রয়োজন বলে পরামর্শ ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন নিয়ে গঠিত যৌথ কমিটির (জেসিভিআই)। আমরা দেখছি দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও এর ধরন পরিবর্তনের গতি। এক দিন হয়তো শনাক্তে রেকর্ড হচ্ছে, আবার পরদিনই মৃত্যুর রেকর্ড গড়ছে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস। এই পরিস্থিতির দায় কমবেশি সবারই। এখনও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে বিস্ময়কর অনীহা। আমরা ভুল অনেক করেছি; আর যেন এর পরিধি বিস্তৃত না করি। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে কিংবা গণ্ডিবদ্ধ করতে করণীয় কী, তা এখন একজন সাধারণ মানুষও জানেন। আমাদের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট, কিন্তু অর্জনই চ্যালেঞ্জ। অতীতে লকডাউনের সুফল আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু গত ঈদে মানুষের বেপরোয়া যাতায়াত এবং সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় ধরনের প্রবেশ আবার বাংলাদেশে নতুন করে সংক্রমণের হার দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। করোনা পরীক্ষার সুযোগ বেড়েছে, দরিদ্র মানুষদের আর্থিক প্রণোদনা এবং খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে- এই সত্য অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সংকটের বিষয়গুলোও যথাযথভাবে আমলে নিয়ে করণীয় যা কিছু সবই করতে হবে সময়ক্ষেপণ না করে। যখন বিশ্বের ১৩০টি দেশ এক ডোজ টিকা সংগ্রহ করতে পারেনি, সেখানে বাংলাদেশ টিকা সংগ্রহ করে টিকাদানের ব্যবস্থা করেছে। টিকা এখন বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা নয়। পর্যাপ্ত টিকা আসছে, আসবে এবং বাংলাদেশেই টিকা উৎপাদন হবে। কিন্তু এখন নিজেদের সংক্রমণ থেকে রক্ষার স্বার্থেই সবাই মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই আমাদের প্রধান কাজ। আমাদের মনে রাখতে হবে, করোনা প্রাণঘাতী কিন্তু সবাই সচেতন ও দায়িত্বশীল হলে নিয়ন্ত্রণ কঠিন কাজ নয়। বাস্তবতা অনুধাবন করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে আমাদের সেই নিরিখেই ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণ যখন সামগ্রিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে, তখন করোনা নিয়ন্ত্রণের কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।

রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকলে হাসপাতালগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে বেসামাল হয়ে যেতে পারে। কোনো দেশেরই হাসপাতালের সক্ষমতা সীমাহীন নয়। আমাদের সীমাবদ্ধতা আরও বেশি। আমাদের মনে রাখতে হবে, লকডাউন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, সাময়িক। এর মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং আমাদের দেশেও আমরা তা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাহলো- ১. টিকা বা চিকিৎসা যাই বলি, সবই জরুরি ব্যবহারের (ইইউএ) জন্য অনুমোদিত; ২. এখন পর্যন্ত সব গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য প্রতিরোধ দিতে পারে, ৩. দেশের ৭০ ভাগ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে পারলে সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে নেমে আসে, ৪. নতুন নতুন ধরন করোনা সংক্রমণের নতুন নতুন ঢেউ নিয়ে আসছে, ৫. যেসব দেশ কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে তারা ভালো আছে, ৬. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডেলটা ধরন আগামীতে নতুন ঢেউ নিয়ে আসবে, যা ইতোমধ্যে প্রায় ১০০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধির অনুসরণই হচ্ছে করোনা প্রতিরোধে নির্ভরযোগ্য প্রধান রক্ষাকবচ। স্বাস্থ্যবিধি মানতে যারা অভ্যস্ত হবে তারা ভালো থাকবে। এমন অনেক দেশ আছে যারা লকডাউন না দিয়েও কেবল স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভালো আছে। টিকা গ্রহণের এক বছর পেরিয়ে গেলে মানুষ আবার নতুন করে ঝুঁকিতে পড়বে, যে কারণে তৃতীয় ডোজের পরিকল্পনা চলছে। টিকাদানের পাশাপাশি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্যবিধির আওতায় আনা যায়- এটিই এখন আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ। অক্সিজেন সংকট দ্রুত কাটাতেই হবে। আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। যদিও আইসিইউ সংকট রাতারাতি দূর করা যাবে না, কিন্তু প্রচেষ্টা চলমান রাখতেই হবে। একই সঙ্গে ভাবতে হবে ফিল্ড হাসপাতালের ব্যাপারেও। জনগণ কেন স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায় না, এই বাস্তবতা ও সমস্যাগুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। যেসব মানুষের ঘরে খাবার নেই, পরিবারের সদস্যরা না খেয়ে আছে, তাদের ঘরে আটকে রাখা যাবে না। কোনো দেশেরই সরকার অনাদিকাল মানুষকে ঘরে খাদ্য বা অর্থ পৌঁছে দিতে পারবে না। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে- এটা নিশ্চিত করাই আমাদের সবার কাজ। সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মানুষ যে কোনো সংকটে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের আহ্বান জানাতে হয়। এখন প্রয়োজন সরকারের পাশাপাশি ব্যাপক মানবিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

২ জুলাই এ নিয়ে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিরোধী দলের সদস্যদের সমালোচনার মুখে পড়েন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির অভিযোগগুলো উড়িয়ে না দিয়ে আমলে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ গঠনমূলক সমালোচনা ভুল সংশোধনের পথ তৈরি করে দেয়। দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ দায়িত্বশীল সবারই গঠনমূলক সমালোচনা-পরামর্শের গুরুত্ব রয়েছে। এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় তা অবশ্যই জরুরি। এমন মহামারি বিশ্বে আর আসেনি, যেখানে ২২৫ দেশ-অঞ্চল প্রায় আক্রান্ত হয়েছে। এখন শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে আক্রান্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা-সহযোগিতা খুব জরুরি। চলমান লকডাউনের মধ্য দিয়ে আমরা কয়েকটি লক্ষ্য অর্জন করতে চাই। তাহলো- ১. করোনা সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ, ২. মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় অভ্যস্ত করা, ৩. সবার মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে এও মনে রাখতে হবে- জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ ধ্বংসের কারণে পৃথিবীতে নতুন নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি আসতেই থাকবে- যার সঙ্গে মানিয়ে চলা হবে আমাদের আরেকটি চ্যালেঞ্জ। নিতে হবে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা-ব্যবস্থা। বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস কখনও ব্যর্থ হয়নি, আশা করি এবারও হবে না। তবে আতঙ্ক নয়, সচেতনতা-সতর্কতাই এ থেকে রক্ষার পথ।

অধ্যাপক; সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়