এবারের ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ৩৭ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছিলেন অর্থমন্ত্রী, যা ৩০ জুন ২০২১-২২ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেট হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের ৬.২৪ শতাংশ। এ বছর প্রতিরক্ষা খাতে গত বছরের চেয়ে ২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দে অবশ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক খরচ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন কয়েকটি বিভাগের ব্যয়ও ধরা হয়েছে। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৭ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। সাধারণত মোট বাজেটের ৫০ শতাংশ ব্যয় হয় সেনাবাহিনীর খাতে, বাকি অর্ধেক যায় নৌ ও বিমানবাহিনীতে। গত ১২ বছরে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। তবে জিডিপির হিসাবে দেখা যাচ্ছে, যেখানে ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতের বরাদ্দ ছিল ১.৩৯ শতাংশ, সেটা কমে ২০২১-২২ অর্থবছরে এসে হয়েছে জিডিপির ১.২ শতাংশ।
এ বছর প্রতিরক্ষা বাজেটের আকার নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কিছু মন্তব্য দেখা গেছে। করোনা অতিমারির এ সময়ে আমরা আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছি। কিন্তু সম্ভ্ভাব্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সার্বিক জিডিপির প্রবৃদ্ধি, যা ৭.২ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষা খাতে ১.২ শতাংশ ব্যয় সংগত বলে মনে করা যেতে পারে। বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় অর্থও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, সেইসঙ্গে যোগ হয় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং তিন বাহিনীর প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো বাজেট প্রস্তাবগুলো। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ বা সংসদের বাইরে খুব একটা আলোচনা হয় না। প্রতিরক্ষা নীতিমালা বা এ বিষয়ে একাডেমিক জগতে বাংলাদেশ এখনও কোনো 'থিঙ্ক ট্যাঙ্ক' বা চিন্তক গোষ্ঠী গড়ে তুলতে পারেনি, যারা এ বিষয়ে গবেষণা ও পরামর্শ প্রদান করতে পারে।
প্রকাশিত বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা জানি, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নে 'ফোর্সেস গোল ২০৩০' শিরোনামে একটি পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য কেবল বাহিনীগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তায় অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ সব হুমকি মোকাবিলায় যোগ্য করাই নয়, একই সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বব্যাপী নিয়োগেও দক্ষ করে গড়ে তোলা। সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন ও সামরিক প্রযুক্তির আধুনিকায়নের সঙ্গে পরিকল্পনারও ক্রমাগত পর্যালোচনা ও পরিবর্তন করতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বেও আমরা এমনটা দেখেছি। তারা দশ বছরের পরিকল্পনা তৈরি এবং প্রতি বছর সেটা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে থাকে।
দেশের নাগরিকদের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ হুমকি থেকে সুরক্ষা প্রদান করা রাষ্ট্র ও এর প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব। শক্তিশালী ও পেশাদার প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি স্বাধীন-সার্বভৌম জাতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শান্তি ও নিরাপত্তা জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পূর্বশর্ত। একটি আধুনিক সামরিক বাহিনী জাতীয় শক্তিমত্তার পরিচায়ক, যা দেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের প্রায় সব মহাদেশে দায়িত্বরত। প্রতিরক্ষা খাতে পরিকল্পিত ব্যয় অর্থনীতিতে অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সামরিক বাহিনীগুলো দেশকে প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ উপহার দেয়, যারা সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর বেসামরিক খাতে অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখে। বর্তমানে আমরা দেখেছি, সামরিক বাহিনী দেশের বিভিন্ন বড় বড় প্রকল্পে তাদের দক্ষতা কাজে লাগাচ্ছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পরই একটি পেশাদার সামরিক বাহিনী গড়ার নির্দেশ প্রদান করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল সংকটে; তার পরও বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাজেটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেন। শুধুই তাই নয়, সেই বরাদ্দ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দেন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী কয়েক বছরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর যে শক্ত ভিত তৈরি করেন, তার ওপর ভিত্তি করেই সশস্ত্র বাহিনীর পরবর্তী বিকাশ ও উন্নয়ন সাধিত হয়। এমনকি আমরা যদি দেখি, ওই সময়েই প্রায় এখনকার মতো প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল সরকারের মোট খরচের ৫-৬ শতাংশ এবং জিডিপির হিসাবে ১-১.৫ শতাংশ। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আরও বেশি বরাদ্দ দেওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে জাতীয় আয়ের এক থেকে দেড় শতাংশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য বরাদ্দ একেবারেই নূ্যনতম বলা যেতে পারে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য দেশের সংযোগস্থলে বাংলাদেশ। চীনের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে বিরোধপূর্ণ এলাকার সন্নিকটে বাংলাদেশের অবস্থান। সাম্প্রতিককালে ভারত ও চীন উভয় দেশই দ্রুত তাদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন করছে। বিরোধপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় তারা নতুন সামরিক ঘাঁটি, সরঞ্জাম ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক স্থাপন করছে। ভবিষ্যতে এ এলাকায় ভারত ও চীনের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটলে বাংলাদেশের বৈদেশিক ও সামরিক সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব হবে ব্যাপক।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত একত্র হয়ে পশ্চিমা ন্যাটোর মতো 'কোয়াড' নামে একটি সামরিক জোট গঠন করছে। এসবের প্রভাব আমাদের নিরাপত্তা বলয়ে পড়বে। সৌভাগ্যবশত আমাদের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে স্থল ও সমুদ্রসীমা ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। তারপরও কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে। যেমন আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি আনয়ন, মিয়ানমার থেকে আসা দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন, মিয়ানমারে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রভাব বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ওপর পড়ার শঙ্কা ইত্যাদি। নিরাপত্তার দিক থেকে এ বিষয়গুলো সামরিক পরিকল্পনা প্রণেতাদের উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। যদিও তারা বাংলাদেশে পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ ও আফ্রিকার মতো ভালো অবস্থানে নেই; তারপরও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ইতোমধ্যে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। তালেবানরা যদি ক্ষমতা দখল করে, তাহলে সেখানে আইএস ও আল কায়েদা ঘাঁটি গাড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশের তরুণদের একটা অংশও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে আকৃষ্ট হতে পারে। তাই বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকতে হবে; যাতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীকে তারা জঙ্গি দমনে সাহায্য করতে পারে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণকারী দেশ। বিশ্বের যেখানেই আমাদের সামরিক বাহিনীকে পাঠানো হয়েছে, সেখানেই তারা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করেছে। তারা আমাদের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে সারাবিশ্বে কাজ করছে। তাই সরকারের উচিত আমাদের সামরিক বাহিনী যে ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছে, তা কাজে লাগিয়ে ওই দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা; যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের সামরিক বাহিনী অধিক শক্তিশালী হচ্ছে। এ বাহিনী সরকারের দেওয়া দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে বদ্ধপরিকর। এখন আমাদের প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রয়োজন বৃহত্তর সংসদীয় পর্যবেক্ষণ। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, একাডেমিক শিক্ষক ও মিডিয়াও যোগ দিতে পারে। ইতোমধ্যে 'ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ' বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিছু সংক্ষিপ্ত কোর্সের আয়োজন করা হয়েছে, যেগুলোতে জ্যেষ্ঠ আমলা, বিচারক, শিক্ষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বেসামরিক জগতে একটি বস্তুনিষ্ঠ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
বাজেট একটি ব্যবস্থাপনাগত বিষয় মাত্র। কেবল অর্থ ব্যয় করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না; বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত, এমনই একটি বাহিনী গড়ে তোলা যারা নিবেদিত, প্রশিক্ষিত এবং তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সদা সচেষ্ট। প্রতিরক্ষা বাজেটের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেই এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর; নিরাপত্তা বিশ্নেষক ও ট্রেজারার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক