দেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ও যমুনা অববাহিকায় বন্যার 'পদধ্বনি' যথার্থই শুনতে পাচ্ছে সংবাদমাধ্যম। কিন্তু এর 'মুষ্ট্যাঘাত' কি ততটা দেখতে পাচ্ছে? অথচ বন্যা নয়; বর্ষাকালের মূল দুর্যোগ নদীভাঙন। বন্যা বহুলাংশে বরং উপকারী, বড়জোর এক-দুই সপ্তাহের দুর্ভোগ। কিন্তু নদীভাঙন সর্বাংশে বিধ্বংসী, সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। ঘূর্ণিঝড়ে ঘর উড়ে গেলেও ভিটেটুকু থাকে; বন্যায় ফসল ভেসে গেলেও জমিটুকু থাকে; আগুনে সব ভস্মীভূত হলেও ছাইটুকু থাকে। কিন্তু নদীভাঙনে সব সম্বল শেষ হয়ে যায়। নদীভাঙনে সকাল বেলার আমির যে সন্ধ্যাবেলাতেই ফকির হতে পারে- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গানে গানে বলে গেছেন বহু আগে। আর রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহির উদ্দিন এই সত্য বুঝেছেন নিজের জীবন ও জীবিকা দিয়ে। তাই সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেছেন- 'কষ্ট হলেও পানিবন্দি হয়ে থাকা যায়; কিন্তু বাড়ি ভেঙে গেলে তার মতো কষ্ট আর হয় না।' (বিডিনিউজ, ৫ জুলাই, ২০২১)।
সন্দেহ নেই, প্রকৃতিতে এখন ভরা বর্ষাকাল। আষাঢ়ের প্রথম দিন ও রাত থেকেই থেমে থেমে ঘনঘোর বর্ষণ; কিন্তু আগাম বা মৌসুমি বন্যা এবার খানিকটা বিলম্বিত। টানা কয়েক বছর পর এবার হাওরের ধান আগাম বন্যায় খেয়ে যায়নি। সারাদেশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের যে ১১২টি পানি পরিমাপক স্টেশন রয়েছে, তার মধ্যে ৬ জুলাই 'মাত্র' তিনটির রং হলুদ- তিস্তায় ডালিয়া ও কাউনিয়া পয়েন্ট এবং সুরমায় সুনামগঞ্জ পয়েন্ট। বাকিগুলো এখনও সবুজ। 'হলুদ' মানে নদীর প্রবাহ বাড়ছে, কিন্তু বিপৎসীমার নিচেই রয়েছে। বিপৎসীমায় পৌঁছলে বা বন্যা দেখা দিলে পয়েন্টগুলো কমলা এবং প্রবল বন্যা দেখা দিলে লাল হয়ে যাবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র শনিবার যে ১০ দিনের সম্ভাব্য পূর্বাভাস জানিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, গঙ্গা-পদ্মা এবং ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায় পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে থাকবে। সেদিক থেকে দেখলে, টানা বৃষ্টিপাত সত্ত্বেও দেশের প্রধান চারটি নদী অববাহিকা- গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও কর্ণফুলীতে বন্যা এখনও দেখা দেয়নি। তবে নদীভাঙন ঠিকই দেখা দিয়েছে। বলা চলে, এবার 'আগাম' বন্যা নেই, কিন্তু 'আগাম' ভাঙন দেখা দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমে মূলত চরাঞ্চলে ডুবে যাওয়া মাঠ-ঘাট ও আধা-ডোবা ঘরবাড়ির স্থির ও চলচ্চিত্রের ফাঁকে ফাঁকে নদীভাঙনের যে সামান্য চিত্র উঠে আসছে, সেখানেই সর্বনাশের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
এ নিবন্ধ যখন লিখছি, শুধু কুড়িগ্রাম জেলায় নদীভাঙনের সর্বশেষ চিত্র দেখা যাচ্ছে মঙ্গলবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে- তিস্তার বাম তীরের রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলার সাতটি গ্রামের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে। গত তিন দিনে তিন গ্রামের ৭১টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। সেই সঙ্গে ভাঙনের কবলে পড়েছে গোড়াই পিয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবন, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ব্রহ্মপুত্রের বাম তীরে (রৌমারী উপজেলা) চরশৌলমারী, ঘুঘুমারী এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক মাসে চার শতাধিক বসতভিটা, শত শত হেক্টর ফসলি জমি, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ঘুঘুমারী বাজার বিলীন হয়েছে। (সমকাল, ৬ জুলাই, ২০২১)।
এবার শুধু নয়, গত কয়েক বছর ধরে দেখছি- যত দিন যাচ্ছে, নদীভাঙন ততই তীব্র হয়ে উঠছে। আর আগেই বলেছি, নদীভাঙন মানে নিছক 'নদীর খেলা' নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজার হাজার মানুষের হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাস। নিমেষেই সর্বস্ব হারানোর বোবা বেদনা কিংবা অভিযোগহীন রোদনধ্বনি।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস (সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস) নদীভাঙন নিয়ে যে পূর্বাভাস দিয়ে থাকে, সেখানে নদীভাঙনের ক্রমবর্ধমান চিত্র স্পষ্ট। গত বছর সংস্থাটি আশঙ্কা করেছিল, দেশের ১৩ জেলায় ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভাঙতে পারে। এ বছর ভাঙনের কবলে পড়তে পারে ২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা। বলা বাহুল্য, নদীভাঙনের মতো জটিল ও বহুমাত্রিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস হুবহু মিলবে না। গত বছর প্রকৃতপক্ষে ৩৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে গিয়েছিল। এবারও প্রকৃত চিত্র পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি ভয়াবহ হবে; আশঙ্কা করা যায়। প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর থেকে কমবেশি ১৭শ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, বাংলাদেশ কীভাবে আল মাহমুদের কবিতার 'উদ্দাম নদীর আক্রোশের কাছে ক্রমাগত ভাঙনের রেখা' হয়ে উঠছে। এসব 'সিকস্তি' কালের বিবর্তনে কতখানি 'পয়স্তি' হয় এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে প্রভাবশালীদের লাঠির জোর মোকাবিলা করে ফের ভূমিহীন মানুষের কাছে ফিরে যেতে পারে কিনা, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
এখনকার প্রসঙ্গ, নদীভাঙনের শিকার মানুষ কী করবে? বিভিন্ন নদী অববাহিকায় ঘুরে ঘুরে দেখেছি, চরাঞ্চল বা নদীতীরবর্তী মানুষ ভাঙনের জন্য আর্থ-সামাজিক ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। এমন মানুষের দেখা প্রায়ই পেয়েছি, যার বসতি ৫-৭ বার নদীভাঙনের শিকার হলেও নদী ছেড়ে চলে যাননি। কিন্তু এখন যেসব ভাঙন দেখা যাচ্ছে, সেগুলোকে নদী ও ভূমির নিছক প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া বা 'নদীর খেলা' হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন। যেমন আমার জন্মভূমি কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্রের সাধারণ প্রবণতা ডানতীরে ভাঙন। এই ভাঙনের কবলে পড়ে একদা সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী চিলমারী এলাকা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে বামতীরে রৌমারী ও রাজীবপুর এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা যাচ্ছে।
দুই তীরেই ভাঙন প্রতিরোধে কিছু অবকাঠামোগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেমন প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ, জিও ব্যাগ বা কংক্রিটের ব্লক ফেলা। এবারও পানি উন্নয়ন বোর্ড-কুড়িগ্রাম দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, এ অবস্থায় জরুরি প্রতিরক্ষা কাজের আওতায় জিও ব্যাগ ও জিও টিউব দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। (সমকাল, ৬ জুলাই, ২০২১)। আর ভাঙন-দুর্গতদের তাৎক্ষণিক কখনও কখনও ত্রাণ দেওয়া হয়। কিন্তু যার সর্বস্ব নদীতে যায়, তার কাছে তাৎক্ষণিক ত্রাণ কোনো পরিত্রাণ হতে পারে কি? রৌমারীর ঘুঘুমারীতে ভাঙনকবলিত এলাকার মর্জিনা বেগম কিছুদিন আগে যেন হাজারো নিঃস্ব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে বলেছেন- 'আমরা ত্রাণ চাই না, ভাঙন বন্ধ চাই'। (ভোরের কাগজ, ১২ জুন, ২০২১)।
ব্যক্তিগতভাবে আমি যেহেতু নদী সুরক্ষা আন্দোলনে যুক্ত; নদীভাঙন-পীড়িত মানুষের অসহায়ত্ব নিজেরও অসহায়ত্ব মনে হয়। নদীর দখল, দূষণ, প্রবাহস্বল্পতা হেতু সৃষ্ট সংকটের সমাধান যত সহজে বলে দেওয়া যায়, ভাঙনের সমাধান ততটাই কঠিন। প্রায়ই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফোন বা ফেসবুক মেসেজ পাই নদীর নানা সংকটের সমাধান চেয়ে। এমনও ঘটেছে, নদীভাঙনের মুখে পড়া এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অকুস্থল থেকে ফোন দিয়েছেন। ফোনের ওপাশে পাড় ভাঙার হৃদয়বিদারক শব্দ শোনা যাচ্ছে। দৃশ্যত দিশেহারা শিক্ষক চাইছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এসে যেন এখনই ভাঙন বন্ধ করে। আমি জানি- প্রকল্প, বরাদ্দ, নকশা, ঠিকাদারি প্রভৃতি দীর্ঘ প্রক্রিয়া পেরিয়ে ভাঙন রোধের কাজ শুরু হতে হতে তার বিদ্যালয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। আর প্রকল্প এলেই নদীভাঙন রোধের নিশ্চয়তা কোথায়? প্রশ্নটা কেবল বরাদ্দ ও প্রকৌশলের নয়। গোড়া কেটে আগায় পানি ঢাললে কি নদীভাঙন বন্ধ হয়?
প্রবাহস্বল্পতায় নদী ভরাট হওয়া এবং তার ফলে বর্ষাকালে তীরবর্তী অঞ্চলে ভাঙন দেখা দেওয়ার মতো 'ধ্রুপদি' কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু আমার ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সারাদেশে নদীভাঙন ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ নির্বিচার বালু উত্তোলন। যেমন এই দফায় যেসব নদী এলাকায় ভাঙন দেখা যাচ্ছে, সেখানে 'ভাঙনপ্রবণ' ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা, তিস্তা ছাড়াও ভোগাই বা সোমেশ্বরীর মতো নদীগুলো রয়েছে। দেশের প্রায় সব নদীতে গত এক দশকে যে নির্বিচার বালু উত্তোলন করা হয়েছে; নদীগুলো এখন যেন তীব্র ভাঙনের মাধ্যমে তার 'প্রতিশোধ' নিচ্ছে।
নদী-বিজ্ঞানের নিয়ম বলে, ব-দ্বীপে নদী ভাঙবে; কিন্তু ভূমি যত সম্প্রসারিত হবে, পুরোনো এলাকা ততই স্থিতিশীল হতে থাকবে। বাংলাদেশের নদীগুলো নিয়মের বিপরীত দিকে হাঁটছে বালু উত্তোলনের কারণে। কেবল আমার ব্যবহারিক পর্যবেক্ষণ নয়; দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষ এর সাক্ষ্য দেবে। তাদের কথা কিংবা কান্না কি কেউ শুনছে?
লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
skrokon@gmail.com