পুরুষের পকেটে পকেটে এখন 'মারণাস্ত্র'। তবে এর কার্যকারিতা যেন একমুখী। কেবল নারীকেই তাক করে এটি এবং প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে। মারণাস্ত্রটির নাম 'মোবাইল ফোন'। কিছু পুরুষের মনে পুষে রাখা নারীর প্রতি বিদ্বেষ, বিকৃত রুচি সত্যিকার অর্থেই প্রযুক্তির এই আশীর্বাদকে নারীর জন্য অভিশাপ করে ছেড়েছে। প্রেমের ফাঁদ পেতে কাছে টেনে বিশেষ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করতে পারলেই কেল্লাফতে। এরপর ইচ্ছামতো নারীকে 'ব্যবহার'সহ টাকা-পয়সা আদায়ের পথ খুলে যায়। ফাঁদে পা না দিলেও চিন্তা নেই; গোপনে অন্য কোনো সময়ের ভিডিও ধারণের জন্য তক্কে তক্কে থাকা। একদিন না একদিন উদ্দেশ্য হাসিলও হয়ে যায়। ব্যস, সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে যা খুশি তাই করার 'লাইসেন্স' পেয়ে যায় কিছু পুরুষ। তেমন লাইসেন্স পেলে তাদের মোবাইল ফোনটি মারণাস্ত্রের চেয়েও অধিক ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে বৈকি। এটি কেবল ভুক্তভোগী নারীর প্রাণই কেড়ে নেয় না, সম্মানও ধুলোয় মেশায়। ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের বেঁচে থাকাও কঠিন করে তোলে।

৪ জুলাই রাজধানীর বাসাবোতে এক স্কুলছাত্রীর (১৪) ঝুলন্ত নিথর দেহ উদ্ধার করা হলো। এলাকারই এক তরুণ প্রেমের ফাঁদে ফেলে তার সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে। সেই ভিডিও প্রচারের ভয় দেখিয়ে সে দীর্ঘদিন ধরে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল। সে দফায় দফায় টাকা আদায় করে। আরও টাকা চাই তার। দিতে না পারায় ভিডিও ফাঁস করে। প্রচণ্ড মানসিক চাপে ওই ছাত্রী ঝুলে পড়ে গলায় রশি লাগিয়ে। পরদিন ৫ জুলাই বরগুনার এক স্কুলছাত্রী (১৩) গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ল। এর আগে চিরকুটে সে লিখে গেছে কেন সে জীবন থেকে 'মুক্তি' চাইছে। সে লিখেছে- 'মা, আমার নামে তারা যে বদনাম উঠিয়েছে, তাতে আমি এ পৃথিবীতে থাকতে পারছি না। আমি একটা খারাপ মেয়ে, আমি নাকি খুব খারাপ। আমাকে কেউ বিশ্বাস করে না। কেউ না, তুমি ছাড়া।' কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় কুৎসা রটিয়ে বেড়ায় বাড়ির মালিকের ছেলে। সমাজও তার কথা লুফে নেয়। চলতি বছরেরই ২১ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ভাইরাল হওয়ায় মাদারীপুরের শিবচরের এক ছাত্রী (১৭) কীটনাশক পানে নিজের জীবনে দাঁড়ি টানে। কে ছবি ছড়িয়ে দিয়েছিল? স্বয়ং প্রেমিক।

প্রেমিকাকে 'মেরে ফেলা'র দুই মাস পর বিশেষ সময়ের ভিডিও ফাঁস করার নজির গড়েছে রংপুরের বদরগঞ্জে এক প্রেমিক। প্রেমের 'নাটক' সাজিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে সে মেয়েটিকে। বন্ধুকে দিয়ে গোপনে সেসব মুহূর্তের ভিডিও করায়। মেয়েটি তাকে বিয়ের কথা বলতেই সে ফোঁস করে ওঠে। নিরুপায় মেয়েটি নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়াকেই 'সহজ' সমাধান ভাবে। মৃত্যুর পরও মেয়েটিকে অপমান করার সাধ ওই প্রেমিকের যায় না। ছড়িয়ে দেয় ভিডিও। এখানেই শেষ নয়, প্রভাবশালী ওই প্রেমিকের হুমকি-ধমকিতে মেয়েটির অসহায় মা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ইউপি সদস্যের ছেলে বলে কথা।

উদাহরণ ভূরি ভূরি। প্রতিকারের হিসাব কড়ে গোনা। প্রভাবশালীদের হুমকি-ধমকি, সালিশ বৈঠকের প্রহসন, নেতা-পাণ্ডা-মাতবরের নিদান এবং সর্বোপরি নিপীড়ক, ধর্ষকের আস্ম্ফালন। এর বিপরীতে লোকলজ্জা, অপমান, সামাজিক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, এমনকি একঘরে বা সমাজচ্যুত হতে হয় ভুক্তভোগী নারীসহ পরিবারটিকে। কিছু ক্ষেত্রে মামলা হলেও নিষ্পত্তির সংখ্যা আণুবীক্ষণিক। অতএব নানাভাবে প্রশ্রয়-পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে দাপিয়ে বেড়ায় 'প্রেমিক' নামের বখাটে, লম্পট। নারীর নিগৃহীত হওয়া তাই যেন 'নিয়তি' হয়েই দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ আত্মহত্যা করে বাঁচছেন! বাকিরা বয়ে বেড়াচ্ছেন মানসিক ক্ষত, মানসিক বৈকল্য।

দণ্ডবিধির ২৯৪ ধারা বলছে, কোনো ব্যক্তি কোনো নারীকে উত্ত্যক্ত করলে সেই ব্যক্তি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড পাবেন। যদি কেউ কোনো নারীর শ্নীলতাহানির উদ্দেশ্যে কোনো কথা, অঙ্গভঙ্গি বা কাজ করে, তাহলে দায়ী ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত সাজা বা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন (দণ্ড বিধির ৫০৯ ধারা)। আর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধানও কার্যকর হয়েছে। কিন্তু তার পরও মানুষ নামধারী কিছু কীটের দংশন চলছেই!

জীবনকে ভালো লাগার, ভালোবাসার, ভবিষ্যতের সুখস্বপ্টেম্ন মগ্ন হওয়ার সময়ে যখন নাকি এক এক করে পরত খুলছে বিস্ময়ের, মোহের এমনকি বোধের, সেই সময়ে দিন-দুনিয়ার কদর্যতা মুছে দিচ্ছে রুপালি-শেফালি-আলতা-গোলাপিদের জীবনের সব রঙ, রূপ। এমন অন্ধকারে ওরা বাঁচবে কীভাবে?

সাংবাদিক
hello.hasanimam@gmail.com