অতিমারি করোনা শুরু হওয়ার পর ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে সেই যে স্কুল বন্ধ হয়ে গেল, তারপর আজ অবধি আর শিশুরা স্কুলে ফিরতে পারেনি। ঠিক কবে নাগাদ ফিরতে পারবে তা অনিশ্চিত। যেসব শিশু সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে অনেক বেশি। তারা যেমন স্কুল প্রাঙ্গণ ঠিকমতো ঘুরেও দেখতে পারেনি, ঠিক তেমনিভাবে বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করার সুযোগও পায়নি। তাদের কাছে স্কুলজীবন যেন এক স্বপ্টম্ন, একরাশ কল্পনার সমাহার। এমনও দেখছি, বাচ্চারা যখন স্কুলের সামনে দিয়ে যাচ্ছে, তখন অতি আনন্দের সঙ্গে দেখাচ্ছে- 'ওই যে দেখো দেখো আমার স্কুল।' কিন্তু বর্তমানে শিশুরা এমন এক ধরনের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে তাদের মনোসামাজিক বিকাশের ওপর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাস্তবতার ভিন্ন রূপও দেখা যাচ্ছে। যেমন- আগে ইন্টারনেট আসক্তি শহরের বাচ্চাদের মধ্যেই বেশি দেখা যেত; এখন তা গ্রামের বাচ্চাদের মধ্যেও অনেক বেশি বেড়ে গেছে। বাবা-মা যখন বাচ্চাদের এই বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকার জন্য কিছু বলতে যাচ্ছেন, তখন তাদের সঙ্গে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে এবং এর ফলে মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে। এ ছাড়া শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা যাচ্ছে। যেমন- রাগ, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, মনোযোগের অভাব, দৈনন্দিন কাজের প্রতি অনীহা, অস্থিরতা, ট্রমা, ঘুমের সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি।
এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শিশুটি হয়তো তার স্কুলের গেটটিও একদিন ভুলে যাবে, কোমল হৃদয় থেকে স্কুলের স্বপ্টম্নটুকুও মুছে যাবে। ফলে তার মনোসামাজিক বিকাশ ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হবে, যা কাটিয়ে ওঠা দুঃসাধ্য। এমনকি তা সারাজীবনও বয়ে বেড়াতে হতে পারে। তাই পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসা মাত্রই স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল-কলেজ খোলার ব্যবস্থা করা উচিত। এ ছাড়া যতদিন না স্কুলে শিক্ষার্থীরা ফিরতে পারছে, ততদিন অনলাইন ক্লাসে শিক্ষকদের পাঠ্যপুস্তক পড়ানো বাদেও বেশ খানিকটা সময় তাদের দেওয়া দরকার, যাতে স্কুলে যেতে না পারার কষ্ট একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারে। বাবা-মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত বাচ্চাদের সঙ্গে গুণগত ও গঠনমূলক সময় কাটানো। এর ফলে একটি সুন্দর সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাচ্চাদের মনোসামাজিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।
সারাদিন কী কী কাজ করবে তার একটা রুটিন তৈরি করা প্রয়োজন। এ কাজটি বাচ্চার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে করতে পারেন, এর ফলে তার সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হবে ও তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে। এই দুর্যোগ তাদের মনে যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমরা কিছু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারি। দৈনন্দিন রুটিন মেনে চলতে পারছে কিনা সেই বিষয়ে আলোচনা করা, এর ফলে বাচ্চার সময় ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারবে। তাদের শিক্ষণীয় গল্প শোনাতে পারেন, তাতে নৈতিক বিকাশ ঘটতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি গল্পের বই পড়ার মাধ্যমে তাদের মস্তিস্কের সঠিক বিকাশ ও জ্ঞান আহরণের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ পাবে। ঘরের মধ্যে যতটা সম্ভব নতুন ধরনের খেলাধুলা, ছবি আঁকা ইত্যাদি করার ফলে বাচ্চার সৃজনশীল ক্ষমতার বিকাশ হবে ও বাচ্চার সঙ্গে একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হবে। একসঙ্গে বসে বাচ্চার ছোটবেলার ছবিগুলো দেখতে পারেন এবং তার কতটুকু মনে আছে সেই বিষয়টিও বুঝতে পারবেন। টিভি, কার্টুন দেখা অথবা ভিডিও গেমস খেলার ক্ষেত্রে প্রতিদিনের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় রাখা যেতে পারে। যেহেতু বাচ্চারা আজকাল অনলাইনে ক্লাস করছে, ফলে তাদের স্ট্ক্রিন সময়টা এমনিতেই বেশি থাকছে, তাই অন্যান্য স্ট্ক্রিনের সময়টা এক ঘণ্টার বেশি মোটেই দেওয়া উচিত নয়। তাদের ঘর ও রান্নার কাজে সাহায্য করার জন্য উৎসাহিত করতে পারেন। তাতে করে সে দায়িত্ব নিতে শিখবে। কিছু মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন যেমন 'ব্রিথিং এক্সারসাইজ' খুব সহজেই তাদের সঙ্গে করতে পারেন। নিয়মিত ঘুমাতে যাওয়ার আগে করলে তাদের মস্তিস্কে অক্সিজেন প্রবাহিত হবে এবং উদ্বেগ, অস্থিরতা, খিটখিটে মেজাজ, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি কমবে।
মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শক

civgk©K ail.com