করোনা অতিমারির এক নিদানকাল চলছে। শ্রাবণের বারিধারা আর স্বজনহারাদের অশ্রু আজ একাকার। এমনই এক শ্রাবণ দিনে দেশবিরোধীরা জাতির কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী লাশের বোঝা। ১৫ আগস্ট কালরাত্রিতে জাতির পিতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে খুনিরা ছুটে গিয়েছিল ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে। কাপুরুষোচিত আদিম উন্মত্ততায় হত্যা করে স্বাধীন দেশের স্থপতিকে। এ ট্র্যাজেডির প্রায় তিন দশক পর শ্রাবণের আর এক ঘনঘোর দিনে অমানিশা নেমে আসে সুধা সদনে। এবার লক্ষ্য জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই বর্ষণমুখর সকালে সুধা সদনে প্রবেশ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রেরিত যৌথ বাহিনী। যুদ্ধংদেহী মনোভাবে সাজসাজ রবে বিভিন্ন বাহিনীর দুই সহস্রাধিক সদস্য আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে সুধা সদন থেকে বের করে নিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধুকন্যা যৌথ বাহিনীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন- কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে? দেশে কি সামরিক শাসন জারি হয়েছে? তেমন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যারা বোঝেন বা দৃষ্টি রাখেন তাদের কাছে উত্তরটি পরিস্কার। কায়েমি স্বার্থবাদীদের চক্ষুশূল শেখ হাসিনা। তাকে সরাতে পারলেই নষ্টের পুনরাগমন সম্ভব। তালগোলে যেমন চলছিল ২১ বছর। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নতুন কোনো ঘটনা নয়।
গত চার দশক ধরে বাঙালি জাতির গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে নিরবচ্ছিন্নভাবে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশ হয়েছিল নেতৃত্বহীন। কাঁটা কম্পাস নেভিগেশনবিহীন এ জাতির বাতিঘর হিসেবে রাজনীতির মঞ্চে আসেন শেখ হাসিনা। আলো হাতে আঁধারের যাত্রী তিনি। সেনা শাসকদের রেখে যাওয়া জঞ্জাল সাফ করে দেশবাসীকে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্টেম্নর সোনার বাংলায়। সুতরাং, জাতির পিতার হত্যার ষড়যন্ত্রকারী বা বেনিফিশিয়ারিরা হাত-পা গুটিয়ে থাকবে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াসহ অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করে। বঙ্গবন্ধুকন্যা যে বাংলাদেশকে অমিত সম্ভাবনার দেশ হিসেবে বিশ্বসভায় উপস্থাপিত করেছেন, বিএনপি-জামায়াত সেই বাংলাদেশকেই দুর্নীতি, দুঃশাসন ও দুর্বৃত্তায়নের দুষ্টচক্রে নিপতিত করেছিল। এ-সময় বাংলাদেশ হত্যা-খুন সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলায় নারীনেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ লাখ লাখ আওয়ামী লীগ কর্মী প্রতিহিংসার শিকার হন। নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হন অনেক নারী। শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, নারী-শিশু, ব্যবসায়ী কেউই ওই ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাননি। প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের তত্ত্বাবধানে হাওয়া ভবনকে রাষ্ট্র ক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। দেশের টাকা পাচার করা হয় বিদেশে।

জনপ্রশাসন, পুলিশ বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক সার্ভিসসহ সরকারের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানকে দলীয় চরিত্র দেওয়া হয়। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মানসে দলীয় অনুগত ব্যক্তিকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি করার জন্য সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের চাকরির বয়স দুই বছর বাড়ানো হয়। ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার যুক্ত করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট পুনরায় ক্ষমতায় আসার জন্য সংবিধান লঙ্ঘন করে দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করে। ড. ইয়াজউদ্দিনের পুতুল সরকার বিএনপি-জামায়াত জোটের নির্দেশনা মানতে গিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের সকল সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়। এসব অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে প্রবল গণরোষ সৃষ্টি হয়। বিএনপি-জামায়াতের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বঘোষিত প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজউদ্দিনের কর্মকাণ্ডের ফলেই ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পটপরিবর্তন হয়। ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে এ দেশের মানুষ সমর্থন জানিয়েছিল। একপর্যায়ে রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে গণহারে গ্রেপ্তার করতে থাকে। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ওয়াদা করে ক্ষমতা নিয়ে নির্বাচনকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রের অন্যান্য বিষয়ে তারা হস্তক্ষেপ করতে থাকে।
ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। সেদিন শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, 'অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন বন্ধ রাখা ঠিক হবে না।' জরুরি আইনের জাঁতাকলে মানুষের মৌলিক অধিকার, বাক ও বিবেকের স্বাধীনতা যখন খর্ব হতে থাকে তখন বাঙালির আশ্রয়স্থল শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণ করেন। এরই এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা অসুস্থ মেয়েকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যান। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে শেখ হাসিনার ওপর হুলিয়া জারি করা হয়। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তখন ওই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। একটি বিদেশি টেলিভিশনে আবেগঘন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, 'বাংলাদেশের মাটিতে আমার জন্ম, ওই মাটিতেই আমার মৃত্যু হবে। কোনো ভয়ভীতি আমাকে দেশে ফেরা থেকে বিরত রাখতে পারবে না।' শেষ পর্যন্ত প্রবল জনমত ও আন্তর্জাতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ফলে সরকার তার দেশে ফেরার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২০০৭ সালের ৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা যুক্তরাজ্য থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছত্রছায়ায় মহলবিশেষের বাড়াবাড়ি ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার বক্তব্য রাখেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, 'আমাকে আসতে বাধা দিয়ে যে ভুল করা হয়েছে, আশা করি এমন ভুল আর হবে না।' কিন্তু অশুভ শক্তির অপতৎপরতা থেমে থাকেনি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। প্রিয় নেত্রী গ্রেপ্তার হতে পারেন- এটা দেশবাসী আগেই অনুমান করেছিল। বিশেষ করে সুধা সদনে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রবেশে বাধা, শেখ হাসিনার চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ ইত্যাদি কারণেই দেশবাসী এই আশঙ্কা করেছিল। দেশি-বিদেশি শক্তির অপতৎপরতায় নিজ দলের মধ্যেও শুরু হয় বিভ্রান্তি।
এ-রকম কঠিন দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা জনগণের প্রতি আস্থা হারাননি। তার প্রমাণ পাই ১৬ জুলাই ২০০৭ সালে গ্রেপ্তারের পূর্বমুহূর্তে দেশবাসীর উদ্দেশে তার লেখা চিঠি থেকে। সেই চিঠিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশবাসী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেছেন, 'কখনও মনোবল হারাবেন না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। যে যেভাবে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। মাথা নত করবেন না। সত্যের জয় হবেই।' এই সত্য ও সুন্দরের সাধনাই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দর্শন। সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে মানুষের ভালোবাসায় শেখ হাসিনা ধারাবাহিকভাবে এক যুগ ধরে দেশসেবা করে যাচ্ছেন।
শ্রাবণ দিনের কথা দিয়ে এ লেখা শুরু করেছিলাম। ফিরে আসি এ প্রসঙ্গে। মনে পড়ে নচিকেতার বিখ্যাত গানের কলি- ''শ্রাবণ ঘনায় দু'নয়নে।'' এক শ্রাবণে খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। সঙ্গিনের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সকল অর্জনকে। আরেক শ্রাবণে আঘাত আসে বঙ্গবন্ধুকন্যার ওপর। যেন শেখ হাসিনাকে থমকে দিতে পারলেই নির্বাসনে পাঠানো যাবে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে। আয়োজনটা ছিল সুদূরপ্রসারী। ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যর্থ হয়েছে। তাই বলে তাদের চেষ্টা কি থেমে আছে? নিশ্চয়ই নয়। আগস্ট ট্র্যাজেডির পরবর্তী বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু দেখেননি। ১/১১-পরবর্তী বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নখদর্পণে। সংকটে সম্ভাবনায় তিনিই অকৃত্রিম সারথি। ষড়যন্ত্র-বিভ্রান্তির বেড়াজাল ভেদ করে সূর্যের দিকে ধাবমান তিনি। গ্রেপ্তার বরণের এ দিনে তাকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।

আইনজীবী; সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ