সৎকর্মশীলদের জন্য সৎ কাজ ও সত্য অনুসরণের সুবর্ণ সুযোগ; আল্লাহকে স্মরণকারী ও ধার্মিকদের চূড়ান্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা হলো পবিত্র হজ। ইবাদতের পরিবেশ, ইসলামের প্রাথমিক যুগের স্মৃতি, আত্মত্যাগী মনোভাব, মুক্তি ও সম্মানের বিষয়গুলো প্রত্যেক হজযাত্রীর হৃদয়কে আলোকিত করে তোলে। আর এ সবকিছুই সচেতন হজযাত্রীর মনের খোরাক। হজ পালন উপলক্ষে মক্কায় সমাগত মানুষ সব সংকীর্ণতা, পঙ্কিলতা ও ভুল-ভ্রান্তি থেকে মুক্ত থাকে। তারা অল্প সময়ের জন্য বাহ্যিক আবরণ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও তাদের ইহরামের সাদা পোশাক, মনের পবিত্রতা, আন্তরিকতা ও একতা শরীর এবং অন্তরের ওপর জয়ী হয়। প্রস্টম্ফুটিত হয় সত্য জ্ঞান ও ইসলামী ভ্রাতৃত্ব এবং একই সঙ্গে স্পষ্ট হয় খোদায়ি পথনির্দেশনা।

হজের আভিধানিক অর্থ সংকল্প করা, কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা করা। শরিয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট তারিখে মক্কার কাবাঘর প্রদক্ষিণ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ (দৌড়ানো), মিনায় অবস্থান প্রভৃতি কাজ যেভাবে হজরত মুহাম্মদ (সা.) নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেইভাবে সম্পাদন করার নাম হজ। এটি হলো ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের পঞ্চম।

ইসলামী বিশেষজ্ঞ, ফকিহ ও মুহাদ্দেসিন হজকে ইসলামের পঞ্চম রোকন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত ইহরাম বাঁধা অবস্থায় আরাফাত, মুজদালিফা, মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ, কাবাঘর তাওয়াফকরণ, সাফা-মারওয়া পাহাড় সাঈকরণ, কোরবানি এবং সবশেষে মাথার চুল মুণ্ডন বা কর্তন করার ইচ্ছা বা সংকল্পকেই মূলত হজ বলে। এহেন সংকল্প থেকে মানুষ যাতে নিজেকে বঞ্চিত না করে, তার জন্য আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, 'মানুষের ওপর আল্লাহ পাকের হক এই যে, এ কাবাঘর পর্যন্ত আসার সামর্থ্য যাদের আছে, তারা হজ করার জন্য এখানে আসবে। যারা কুফরি করবে (অর্থাৎ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ করতে আসবে না) তারা জেনে রাখুক যে, আল্লাহ সৃষ্টি জগতের মুখাপেক্ষী নয়।'

হজের কতিপয় মৌলিক বিষয়- ১. হজের নিয়ত, ২. ইহরাম বাঁধা, ৩. আরাফাতের মাঠে অবস্থান, ৪. মুজদালিফায় রাত যাপন, ৫. মিনায় অবস্থান এবং শয়তানের প্রতি কঙ্কর নিক্ষেপ, ৬. কাবাঘর তাওয়াফ, ৭. হাজরে আসওয়াদে (কালো পাথর) চুমা দেওয়া, ৮. সাফা-মারওয়ায় সাঈকরণ, ৯. কোরবানি করা, ১০. মাথার চুল মুণ্ডন বা কর্তন।

মহানবী (সা.) প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য হজ পালনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ইরশাদ করেন, বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার পাথেয় ও সফরের উপকরণ থাকা সত্ত্বেও যে হজ পালন করেনা, সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করুক কিংবা নাসারা হয়ে মরুক। (মিশকাত)

হজ নিঃসন্দেহে আল্লাহ নির্দেশিত এমন এক পবিত্র অনুষ্ঠান, যেখানে দুনিয়ার সব মুসলমান একত্রিত হয়ে হজের বিভিন্ন কল্যাণ ও উপকারিতা আহরণের সুযোগ লাভ করে। উপকারিতা লাভ করে বিভিন্ন জাতি-গোত্রের আচার-আচরণ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার। এভাবেই হজের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মাঝে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধ তৈরি হয়। তবে আমাদের অবশ্যই এ কথা মনে রাখতে হবে, এটাই হজের একমাত্র উপকারিতা নয়।

হজ মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তম সমাবেশ। এটা খোদায়ি অনুশীলন এবং মানুষ হওয়ার অনুশীলনের স্থান; মিথ্যা আমিত্ব ও শিরকের পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি খোঁজার স্থান। শয়তান ও অশুভ শক্তির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ, পৌত্তলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ তথা বারাআত ঘোষণা এবং খোদার সঙ্গে মিলনের স্থল। একই সঙ্গে তা 'শয়তানের ইবাদত করো না'- এ প্রতিজ্ঞারও নবায়নস্থল এবং 'আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) মুশরেকদের ওপর অসন্তুষ্ট'- এ বাণীর প্রতি সাড়া দেওয়ার স্থান। এ স্থান ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহর ঔজ্জ্বল্য এবং তাদের আধ্যাত্মিক ও মানবিক সম্মান তুলে ধরার স্থান। হজ হলো জীবনের যে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যহীনতা ঠিক তার বিপরীত। শয়তানি শক্তি মানুষকে যে দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্যের দিকে পরিচালিত করে, হজ হলো তার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। যে শয়তানি গোলক ধাঁধার আবর্তে মানুষ ঘুরপাক খাচ্ছে, এই হজ পালনের মাধ্যমে তা থেকে আপনি বেরিয়ে আসতে পারবেন। হজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনার কাছে মুক্ত ও পরিস্কাররূপে ফুটে উঠবে সেই পথ, যে পথের সাহায্যে আপনি চিরন্তন জগতে উত্তীর্ণ হয়ে মহান আল্লাহর সমীপে পৌঁছাতে পারবেন।

হজের ইহরামের মাধ্যমে মানব জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি যে এক খণ্ড সাদা কাপড় পরে আল্লাহপাকের দিকেই প্রত্যাবর্তন- এ সত্যকে জীবন্ত করে তুলে ধরা হয়েছে। কালো পাথরের স্পর্শ ও এর প্রতি ইঙ্গিতের মাধ্যমে তাওয়াফ শুরু দ্বারা অন্য সবকিছুর আনুগত্য ও গোলামি প্রত্যাখ্যান করে এক আল্লাহর উদ্দেশে বা জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে এক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন হতে হবে মুসলিম উম্মাহর সারাজীবনের একমাত্র কর্মপ্রচেষ্টা। সাঈ বা দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে সাতবার দৌড়ানোর মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলমানকে নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা ও কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে তার জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ৯ জিলহজ তারিখে আরাফাতে গমন, সেখানে সব হাজির দিনের বেলায় অবস্থানের মাধ্যমে মানব সৃষ্টির সূচনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদকে মানব জাতির কল্যাণে নিয়োগ করার প্রতি গুরুত্বারোপ, মুজদালিফায় রাতে অবস্থানের দ্বারা (ইবাদত-বন্দেগি) চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে আত্মিক উন্নয়ন ঘটানো, যাতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুফলকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে তথা জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত করা হয়। মানুষের মধ্যকার আমিত্ব ও আত্মকেন্দ্রিকতারূপী শয়তানকে পরাজিত করা ও আল্লাহপ্রেম তথা মানবপ্রেমকে জাগিয়ে তোলার জন্য ১০ জিলহজ তারিখে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মুজদালিফায় সংগৃহীত ৭০টি পাথররূপী বুলেট মিনায় অবস্থিত তিনটি শয়তানের প্রতীকে নিক্ষেপের মাধ্যমে শয়তানের ধোঁকা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সদা সক্রিয় জিহাদে নিয়োজিত থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ পাথর মারাই শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে ইবরাহিমি পন্থায় বিজয় বা কোরবানি ঈদোৎসবের মাধ্যমে সেদিনই উদযাপিত হয়ে থাকে।

হজের মাধ্যমে আসা পরহেজগারির পূর্ণতাই অন্যকে সৎ কাজের আদেশদান এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখার সক্রিয় কর্মী করে তোলে। হজের মহাসম্মেলন স্পষ্টত প্রমাণ করে- দীন-দুনিয়ার জন্য এবং মুসলমানদের মধ্যকার বিভেদ-বিভ্রান্তি ও অনৈক্যের কারণগুলো হজের দর্শনের পরিপন্থি। তাই হজই হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার একমাত্র সঠিক ও সামগ্রিক শিক্ষা।

চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়