নদীর সংস্কার ও পরিচর্যার গুরুত্ব বিবেচনা করে গত নভেম্বর ২০২০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় বছরব্যাপী নদী খননের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি শেখ হাসিনা। নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক রাখা এবং ভাঙন প্রতিরোধে বড় নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পুরো বছরের পরিকল্পনা থাকতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। নদীপ্রবাহ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। নদীর পানি যখন কমে যায় তখন চর পড়ে বা অন্যান্য কারণে পানি বেড়ে গেলে ভাঙন শুরু হয়। তাই নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে বড় নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পুরো বছরের পরিকল্পনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে প্রকল্পভিত্তিক নদী ড্রেজিং কার্যক্রম চলছে। সেটি থেকে বের হয়ে এসে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে যেতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
ডেল্টা প্ল্যান অনুসারে সমন্বিত ও টেকসই উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। দুটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি হলো নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক বিষয়গুলো ফলপ্রসূ করা আর দ্বিতীয়টি হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে জনজীবন ও সম্পদ রক্ষা করা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জলীয় বাষ্পপূর্ণ আবহাওয়া এবং অসময়ে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে প্রতি বছর আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো দিয়ে ২০০ টন বালি এবং পলি বাংলাদেশের নদীগুলোতে প্রবেশ করে। তবে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে কাজ করেন এমন কেউ কেউ মনে করেন, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো দিয়ে বর্তমানে ৩৫০-৪৫০ টন বালি ও পলি বাংলাদেশের নদনদীতে প্রবেশ করে। একই সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পলি এবং বন্যার পানি মেঘনা বেসিনে পতিত হতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশের নদীগুলোর তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার এটি একটি কারণ। ফলে অতি বন্যার সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি নদীর পাড় ভাঙনের মুখে পড়ে। হঠাৎ তীব্র স্রোত দেখা দেয় এবং নদী ভাঙন শুরু হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ হুমকির মুখে পড়ে। দেশে নদী ভাঙনে নদীতে বিলীন হওয়া জমির শিকস্তি পরিমাণ পাঁচ লাখ ১৪ হাজার ৬৭১ দশমিক ৯৫ একর।
নদ-নদীর নাব্য রক্ষাকল্পে ব্রিটিশ আমল থেকেই এ উপমহাদেশে (বাংলাদেশ) ড্রেজার ব্যবহূত হয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর জেলায় চন্দনা বারাশিয়া নদী পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশের নদনদীগুলোর নাব্য রক্ষাকল্পে ড্রেজিংয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করে ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১১টি ড্রেজার ক্রয়ের নির্দেশনা দেন। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কুষ্টিয়া জেলায় গড়াই নদী পাইলট সেকশনে ড্রেজিং করা হয়। ২০০০-২০০১ অর্থবছরের নেদারল্যান্ডসের আর্থিক সহায়তা প্রকিউরমেন্ট অব ড্রেজারস অ্যান্ড এন্সিলারি ইকুইপমেন্ট ফর রিভার ড্রেজিং ফর ফ্লাড প্রটেকশন অব বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় এসডি শীতলক্ষ্যা-১৮, এসডি ব্রহ্মপুত্র-১৮, এসডি মহানন্দা-১৮, এসডি নবগঙ্গা-১৮ ও এসডি চিত্রা-১৮ ড্রেজার ক্রয় করা হয়। দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসীন হয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ভরাট হওয়া নদনদী পুনরুদ্ধার ও নাব্য রক্ষাকল্পে ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক গৃহীতব্য/গৃহীত নদীভাঙন রোধে তীর প্রতিরক্ষা কাজ সংবলিত প্রকল্পগুলোতে একটি নির্দিষ্ট আনুপাতিক হারে নদী ড্রেজিং কার্যক্রম অন্তর্ভুক্তকরণের জন্য অনুশাসন দিয়েছেন, যেন নদীতে জাগ্রত ডুবোচর ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অপসারিত হওয়ার ফলে নদীর প্রবাহ তীরে আঘাত করে নদীভাঙন পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। যে রকম অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, তাতে কয়েক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বড় অংশই তলিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বর্ষায় বন্যা এবং শীতকালে নদীগুলোতে পানি না থাকায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া ক্রমেই বাড়ছে। তাই অস্তিত্বের প্রয়োজনেই নদীগুলোকে ড্রেজিং করতে হবে।
ড্রেজিং বা খনন শিল্প বাংলাদেশ বিকাশমান নতুন শিল্প। ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশের ড্রেজিং শুরু হলেও বর্তমান সরকার এবং আগের মেয়াদে দুটি সরকারের সময়ে ড্রেজিং শিল্পের বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ড্রেজার ক্রয় ও পরিচালনার কার্যক্রম আশার সঞ্চার করেছে। সম্ভাবনাময় এ শিল্পের প্রসারে ড্রেজার শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং প্রণোদনা প্রদান জরুরি। ড্রেজিং শিল্পের উৎকর্ষ নদী শাসনে যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিআইডব্লিউটিএ নদী শাসন এবং নৌপথের নাব্য রক্ষায় কাজ করে। এ দুটি সংস্থাই ড্রেজিং কার্যক্রম প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুই হাজার কিলোমিটার এবং বিআইডব্লিউটিএর ১৮০০ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির চেহারা আমূল বদলে যাবে। নদীগুলোতে মাছের বিচরণ ক্ষেত্র বৃদ্ধি পাবে। নদীবন্দরগুলো অনেক বেশি কার্যক্ষম হবে, নৌপথে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে নৌপথে মালামাল ও যাত্রী পরিবহন অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে। নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। নদীগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে; ফলে অতিবন্যার আশঙ্কা ও ঝুঁকি কম হবে। নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চার হবে। শুধু অতি বন্যা প্রতিরোধ করতে পারলেই জিডিপির ৩-৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।
গত ২৬ বছরে নদীভাঙনের অবস্থা অবলোকন করলে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে দেশের প্রধান তিনটি নদীতে নদীভাঙনের মোট পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫০০ হেক্টর। বর্তমানে কমে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর অর্থাৎ নদীভাঙন উল্লেখযোগ্য হারে তিনগুণ কমে গেছে। ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং অব্যাহত থাকলে নদীভাঙন হ্রাস পাবে। ভাঙনকবলিত এলাকায় মানুষের দারিদ্র্য ৩৭ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে নৌপথ হবে জনগণের নিরাপদ যাত্রার প্রথম পছন্দ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়াও বিনোদনসহ বিনিয়োগের নতুন হটস্পট হতে পারে নদী। সে ক্ষেত্রে ড্রেজিং শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা খুবই জরুরি। উন্মুক্ত নদীপথই হবে আগামীর বাংলাদেশের অর্থনীতি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
উপসচিব, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়