স্বীকার করতে হবে যে, টানা দুই বছর কোরবানির পশুর চামড়ার দামে রীতিমতো 'ভরাডুবি' ঘটার পর, এ বছর পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হয়েছে। আমরা দেখছি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রথম থেকেই সতর্ক ছিল এবং ক্রেতাপক্ষগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে পাঁচ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারিত হয়েছে। এর 'সুফল' দেখা গেছে সমকাল অনলাইনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। অবশ্য করোনা পরিস্থিতির কারণে চামড়ার জোগান কম ছিল; একদিকে যেমন কোরবানির সংখ্যা কমেছে, অন্যদিকে চামড়ার স্বাভাবিক পরিবহন ব্যবস্থাতেও বিঘ্ন ঘটছে। খোদ রাজধানীতেও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চামড়া নিয়ে আড়তগুলোতে আসতে গিয়ে পরিবহন ভাড়া একটি বড় বিষয় ছিল। যে কারণে গরু ও মহিষের চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে দৃশ্যত কোনো সমস্যা না থাকলেও ছাগলের চামড়া অনেক এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখা গেছে। ফলে চাহিদা ও জোগানের ধ্রুপদি সম্পর্কের কারণেই দাম একেবারে পড়ে যায়নি, অস্বীকার করা যাবে না। করোনা পরিস্থিতি ছাড়াও প্রাকৃতিকভাবে এবার অত্যধিক গরম এবং দফায় দফায় বৃষ্টিপাতের কারণেও কিছু চামড়া নষ্ট হতে পারে। এসব কারণে চাহিদা ও জোগানের ব্যবধান যদি বেশি থাকে, তাহলে সামনের দিনগুলোতে সংকট দেখা দেওয়ার যে আশঙ্কা ট্যানারি শিল্প সংশ্নিষ্টরা বলছেন, তা নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে। কিন্তু আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই আরও দূরবর্তী বিষয়ে। প্রতি বছরই ঈদুল আজহার সময় চামড়া নিয়ে অব্যবস্থাপনা দেখা দেয় কেন? আমরা জানি, দেশের চামড়ার মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি ঈদুল আজহায় কোরবানি হওয়া পশু থেকেই আসে; ফলে এই সময় চামড়া ব্যবস্থাপনার ওপর দেশের ট্যানারি শিল্পের ভবিষ্যৎ বহুলাংশে নির্ভর করে। দুর্ভাগ্যবশত এই সময়ই এর বাজার নিয়ে কারসাজি হয় সবচেয়ে বেশি। বস্তুত প্রতি বছরই ঈদুল আজহার আগে-পরে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও চামড়া সংগ্রহ থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ 'বাস্তবতা' মেনেই চামড়া শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পর্ব লাভ-লোকসানে পার করে থাকে। আমরা মনে করি, সাংবাৎসরিক এই শিল্পে এমন 'অস্থিরতা' কেন দেখা দেবে। কোনো কোনো বছর 'অঘটন' দেখা দিতে পারে বৈকি; কিন্তু অঘটন ও অস্থিরতাকেই 'বাস্তবতা' হিসেবে মেনে নেওয়ার অবকাশ নেই। আমরা দেখি, কোরবানির পর চামড়ার বাজারের অস্থিতিশীলতা দূর করতে প্রতি বছরই সরকারি উদ্যোগে চামড়া ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বসে দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই দর কোনো বছরই বাজারে যথাযথ প্রতিপালিত হয় না। ঈদুল আজহার সময় মাঠে নামা কয়েক লাখ মৌসুমি ব্যবসায়ী, কয়েক হাজার আড়তদার ও কয়েকশ ট্যানারি মালিক- সব পক্ষই 'সুবিধাজনক' অবস্থান গ্রহণ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হয় ট্যানারি শিল্পের। আমরা এর অবসান দেখতে চাই। সে ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কেবল দাম নির্ধারণ করে দিয়েই দায় সারলে চলবে না; বরং কীভাবে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয় এবং চামড়ার বাজারের ব্যবস্থাপনা সুচারু হয়, সে ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। এটা ঠিক, কাঁচা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় 'স্পর্শকাতর' বিষয়। সামান্য এদিক-ওদিক হলেই পচনশীল এই পণ্য মুনাফার বদলে গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রায় প্রতি বছরই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, আড়তদাররা ইচ্ছাকৃতভাবেই ধীরগতিতে চামড়া কিনেছে যাতে করে সরবরাহ বিপুল মনে হয়। অন্যদিকে আড়তদারদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকরা আগেরবারের দাম সময়মতো পরিশোধ না করায় তাদের কাছে চামড়া কেনার পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না। ওদিকে ট্যানারি মালিকরা দায়ী করেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের 'তাড়াহুড়া' বিক্রির প্রবণতাকে। এই পারস্পরিক দোষারোপ থেকে বের হয়ে আসা উচিত চামড়া শিল্পের বৃহত্তর স্বার্থেই। আগে থেকে সতর্ক থাকলে যে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব, এবার তা প্রমাণ হয়েছে। আমরা চাইব, আগামী বছরগুলোতেও চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখতে এভাবে প্রয়োজনীয় ও আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মনে রাখতে হবে, অস্থিতিশীল চামড়ার বাজার কয়েক লাখ মৌসুমি ব্যবসায়ীকেই কেবল বিপাকে ফেলে না, বিভিন্ন মাদ্রাসা, এতিমখানা, চামড়ার অর্থ প্রাপ্য দুস্থরাও বঞ্চিত হয়।