পদ্মা সেতুর পিলারের সঙ্গে ফেরির ধাক্কা লাগার অঘটন এমন সময় ঘটল যখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি মূল কাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে শেষ পর্যায়ের কাজও সম্পন্ন হওয়ার পথে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে সেতুর ওপর সড়কপথের পিচ ঢালাই শুরু হয়েছে। গত মাসে সম্পন্ন হয়েছে সেতুর রেলপথ অংশের স্লাব বসানো। গত ডিসেম্বরেই সম্পন্ন হয়েছিল সেতুর মূল কাঠামোর শেষ স্প্যান স্থাপন। জাতি যখন দেশের বৃহত্তম যোগাযোগ স্থাপনা এবং কূটনৈতিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক এই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রহর গুনছে, ঠিক তখনই এ ধরনের 'দুর্ঘটনা' কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, উদ্বেগজনকও। অস্বীকার করা যাবে না যে, বর্ষাকালের প্রমত্ত পদ্মায় ফেরির মতো নৌযান পরিচালনা সহজ নয়। কিন্তু পদ্মা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছ দিয়ে চলাচলের সময় বাড়তি সতর্কতা থাকবে না? যে সেতু প্রমত্ত পদ্মার বুকে সগৌরবে মাথা তুলে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও সাহসের জয়গান গাইছে, তার প্রতি নৌচালকদের সমীহও নিশ্চয়ই প্রত্যাশিত। দুর্ভাগ্যবশত, পদ্মা সেতুর পিলারে ধাক্কা মারা ফেরির চালকসহ সংশ্নিষ্টরা সেই সতর্কতা ও সমীহ প্রদর্শনে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। আরও উদ্বেগের বিষয়, এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত দুইবার এমন অঘটন ঘটল। এ ছাড়া আগেও কয়েকবার নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে এমন 'অসাবধানতা' দৃশ্যমান হয়েছে। মন্দের ভালো যে, ধাক্কায় পদ্মা সেতুর পিলারের ধর্তব্য ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে এটাই স্পষ্ট হয় যে, নেহাত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের অবহেলা ও অসাবধানতায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটির অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। আমরা দেখতে চাই, পদ্মা সেতুর নিরাপত্তায় বিন্দুমাত্রও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে ফেরি পরিচালনার সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ উপযুক্ত পদক্ষেপ। আপাত এই ঔদাসীন্যের নেপথ্যে বড় কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখা জরুরি। ভুলে যাওয়া চলবে না, পদ্মা সেতু আমাদের বহু সংগ্রামের ফসল। দুই দশক আগে ২০০১ সালের জুলাই মাসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীই যদিও তার প্রথম মেয়াদে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন; পরবর্তীকালে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে এর নির্মাণকাজ বারংবার পিছিয়ে গেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়েও দেশীয় ও বিদেশি অনেক প্রতিবন্ধকতা পাড়ি দিতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। আমরা গভীর বেদনার সঙ্গে দেখেছিলাম, বৃহৎ আন্তর্জাতিক অর্থকরী সংস্থাগুলো নানা খোঁড়া অজুহাতে ও অলীক অভিযোগে কীভাবে প্রকল্প থেকে সরে গিয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃঢ়তায় আমরা নিজস্ব অর্থায়নে এবং দেশীয় ও বিদেশি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে পেরেছি। শুধু তাই নয়, এক পর্যায়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পে 'দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের' দুঃস্বপ্নেরও অবসান হয়েছে। ওই অভিযোগ ২০১৭ সালেই কানাডার একটি আদালতে খারিজ হয়ে যায়। পদ্মা সেতু অতীতের সাহসের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সমৃদ্ধিরও প্রতীক, ভুলে যাওয়া চলবে না। আমরা জানি, সড়ক ও রেলপথ সংযুক্ত দেশের দীর্ঘতম এ সেতু চালু হলে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বাড়বে এক দশমিক দুই শতাংশ। আর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের প্রাপ্তিযোগ কেবল অর্থনীতিতে সীমিত থাকবে না। এই সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে বাংলাদেশ। ফলে এই স্থাপনা কেবল আবেগের উৎস নয়, প্রত্যয়েরও দীপ্তশিখা। আমরা 'সন্দেহের সুবিধা' প্রদান করে যদি ধরেও নিই যে, পদ্মা সেতুর পিলারে সপ্তাহের মধ্যে দুইবার ফেরির ধাক্কা 'দুর্ঘটনা' মাত্র; এত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে ঔদাসীন্য ক্ষমা করা যায় না। বিশেষত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের মতো সরকারি সংস্থার ফেরিই যদি এমন অসতর্ক থাকে, তাহলে বাকিদের ওপর ভরসা রাখব কীভাবে? আমরা প্রত্যাশা করি, এই অঘটন থেকে শিক্ষা নিয়ে সেতুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা নেওয়া হবে।