জলবায়ু পরিবর্তন বা 'ক্লাইমেট চেঞ্জ' বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত বিষয়। এর সমার্থক বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা 'গেল্গাবাল ওয়ার্মিং'। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলতে পৃথিবীর তাপমাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়া বোঝায়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় কীভাবে? এর মূলে রয়েছে 'গ্রিনহাউস গ্যাস'। গ্রিনহাউস বা কাচের তৈরি 'সবুজ ঘর' মূলত শীতপ্রধান দেশে তৈরি করা হয় অত্যধিক ঠান্ডায় শাকসবজি চাষের জন্য। এই কাচের তৈরি ঘরে যখন সূর্যের তাপ প্রবেশ করে, তখন তা আর সহজে বের হতে পারে না। ফলে ভেতর তাপ আবদ্ধ হয়ে থাকে। আর সেখান থেকে গাছ প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা গ্রহণ করে বেঁচে থাকে।
বর্তমান সময়ে আমাদের পৃথিবীর অবস্থা এই গ্রিনহাউসের মতো। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিকারক কিছু গ্যাস যেমন কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ওজোন, জলীয়বাষ্প ইত্যাদি। এগুলো বায়ুমণ্ডলে যখন ঘুরে বেড়ায় তখন কাচের মতো একটি স্তর সৃষ্টি করে এবং সূর্য থেকে আসা তাপ বছরের পর বছর ধরে রাখতে বা আটকে রাখতে সক্ষম হয়, ঠিক যেমন গ্রিনহাউস ঘরের ভেতরে হয়। এ কারণেই এই গ্যাসগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাস বলা হয়।
বায়ুমণ্ডলে নির্গত ওই গ্রিন হাউস গ্যাসের ৮০ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড, ১০ শতাংশ মিথেন, ৭ শতাংশ নাইট্রাস অক্সাইড ও বাকি ৩ শতাংশ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস। এই গ্যাসগুলোর মধ্যে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের স্থায়িত্বকাল হলো ১০০ বছরের মতো, মিথেন ১২ বছর (প্রায়), নাইট্রাস অক্সাইড ১১৪ বছর (প্রায়)। গ্যাসগুলো বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ হওয়ার আগেই আবার নতুন করে বিভিন্ন উৎস থেকে যুক্ত হতে থাকে। ফলে বায়ুমণ্ডলে এই গ্যাসগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বকালের জন্য এগুলো বছরের পর বছর তাপ ধরে রাখে এবং এভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি হতে থাকে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গ্রিনহাউস গ্যাস না থাকলে পৃথিবীর তাপমাত্রা রাতের বেলা -১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাত। তাই গ্রিনহাউস গ্যাসকে বলা হতো মানব জাতির জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু এই আশীর্বাদ কীভাবে অভিশাপে পরিণত হলো? আসলে গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়তে বাড়তে এত বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে যে, সূর্য থেকে আগত তাপমাত্রা সহজে পৃথিবীতে প্রবেশ করছে কিন্তু আর বেরিয়ে যেতে পারছে না; ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে বড় একটি কারণ অধিক হারে কার্বন নিঃসরণ। গত ১০০ বছরে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের অবদান শীর্ষে। এর জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলো দায়ী- বিভিন্ন গবেষণায় এর সত্যতা মিলেছে।
সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশনের (ইসি) জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টার ও পিবিএল নেদারল্যান্ডস এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট এজেন্সির এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী। পাশাপাশি এশিয়া ও ইউরোপের বড় অর্থনীতির দেশগুলো সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে চীন। এর পরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারপর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো। এর পরই রয়েছে ভারত। তারপর রাশিয়া ও জাপান।
পরিমাণে কম হলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন খাত থেকেও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়। কিন্তু বিশ্বখ্যাত ব্লুমবার্গ নিউজ গত ৮ এপ্রিল জিএইচজিস্যাটের বরাত দিয়ে বলেছে- ঢাকার কোনো এক অংশ থেকে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে ক্ষতিকর ভূমিকা রাখা গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর একটি, মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
মিথেনের প্রধান উৎসগুলো হলো :১. গৃহপালিত পশুর বর্জ্য, ২. প্রাণিজ ও জলজ উদ্ভিদের পচন, ৩. শস্য চাষাধীন জলাভূমি, ৪. উইপোকা, ৫. জৈব জ্বালানির দহন, ৬. ভূমিধস, ৭. প্রাকৃতিক গ্যাসের অপচয়, ৮. কয়লা উত্তোলন, ৯. প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র।
মিথেন একটি ঘ্রাণহীন, বর্ণহীন গ্যাস। কার্বন ডাই-অক্সাইড এর চেয়ে ৮৪ গুণ বেশি তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে। ফলে খুব অল্প পরিমাণে মিথেন গ্যাস অনেক দীর্ঘ সময় ধরে তাপ ধরে রাখতে পারে। এ জন্য মিথেনকে গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং মিথেনের পরে নাইট্রাস অক্সাইড জলবায়ুগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তৃতীয় গ্রিনহাউস গ্যাস। কৃষিজমির ব্যবহার, শিল্পকর্ম, জীবাশ্ম জ্বালানির জ্বলন এবং কঠিন বর্জ্যের পাশাপাশি নষ্ট পানির ট্রিটমেন্টের সময় নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হয়। আইপিসিসির মতে, নাইট্রাস অক্সাইড একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস যা গত ১০০ বছর ধরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি তাপ ধরে রাখছে। বেশিরভাগ নাইট্রাস অক্সাইড আসে কৃষিজমি থেকে, বিশেষ করে উর্বর জমি ও পশুপাখির বর্জ্য থেকে।
১৯৬০-এর দশক থেকে সারের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধি পেয়েছে এবং 'সবুজ বিপ্লব' প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছে, যা বিশ্বজুড়ে কয়েক মিলিয়ন মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করেছিল। গত ৬০ বছরে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ২০০ শতাংশ বেড়েছে যদিও আবাদি ভূমির পরিমাণ একই রকম রয়ে গেছে, আবার কিছু কিছু জায়গায় আরও কমে গেছে। দিন দিন পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে; আবাদি জমির পরিমাণ একই থাকার কারণে এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দিতে অল্প জমিতে সার প্রয়োগ করে বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের ২০১৩ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রাক-শিল্প যুগ থেকেই মানুষের ক্রিয়াকলাপ থেকে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন ২০ শতাংশ বেড়েছে। যখন কৃষকরা জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য জমিতে নাইট্রাস সার প্রয়োগ করেন, তখন তার অর্ধেক কার্যকরভাবে ব্যবহূত হয় আর বাকি অর্ধেক বায়ুমণ্ডলে মিশে যায় এবং তা অক্সিজেনের উপস্থিতিতে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস তৈরি করে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, কৃষিক্ষেত ২৫ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী। মাইক্রোবিয়াল কার্বন সিকোয়েস্টেশন একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করতে এবং বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই-অক্সাইড হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করে উভয় ক্ষেত্রেই বিশাল সম্ভাবনাময় ভূমিকা রাখে।
মাটিতে কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন হলো রিজেনারেটিভ জমি ব্যবহার এবং কৃষি কাজের মাধ্যমে মাটিতে বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন সংরক্ষণের প্রক্রিয়া। এটি বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা হ্রাস করার দ্বৈত লক্ষ্য অর্জন করেছে, যা বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং মাটির স্বাস্থ্যের উন্নতির ফলে উচ্চফলন, পুষ্টির ঘনত্ব এবং অন্যান্য কৃষিজাতিক সুবিধার দিকে পরিচালিত করে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল কৃষি অনুশীলনগুলো সাধারণত উচ্চ ফলন দেয়, তবে জীববৈচিত্র্য হ্রাস, মিঠাপানির দূষণ এবং মাটির ক্ষয়সহ নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাবগুলোতে ভূমিকা রাখে। সুতরাং বায়ুমণ্ডলে জমাকৃত অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস অপসারণের লক্ষ্যে মাটির কার্বন সিকোয়েস্টেশন প্রক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অন্যান্য কার্বন সিকোয়েস্টেশন পদ্ধতির তুলনায় মাইক্রোবিয়াল প্রক্রিয়াগুলো কার্বন ক্যাপচারের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সিকোয়েস্ট্রেশন প্রক্রিয়াটির জন্য অতিরিক্ত সরঞ্জাম, জমি বা শক্তির কোনো প্রয়োজন নেই। এর জন্য প্রয়োজন কিছু মাইক্রোব।
যে মাইক্রোবগুলো তাদের জীবনচক্রের একটা অংশে উদ্ভিদ টিস্যুর অভ্যন্তরে বাস করে, সেগুলোকে এন্ডোফাইট বলে। মাইক্রোবগ্রুপ যেমন নাইট্রোজেন-ফিক্সিং ব্যাকটেরিয়া এবং মাইক্রোরাইজাল ছত্রাক, উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে অনেক উপকারী হিসেবে পরিচিত। উদ্ভিদের টিস্যুর অভ্যন্তরে বসবাসকারী অন্যান্য এন্ডোফাইটগুলো উর্বরতা বৃদ্ধি, গাছের বৃদ্ধির উন্নতি এবং রোগ, খরা এবং উচ্চ তাপমাত্রার মতো চাপগুলোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং মাটিতে সরল সুগার তৈরি করে, যা লেবাইল কার্বন যৌগ হিসেবে পরিচিত। মেলানাইজড ছত্রাকসহ কিছু এন্ডোফাইটিক ছত্রাক এই শর্করাগুলোকে খেয়ে বেঁচে থাকে এবং মেলানিনের মতো স্থিতিশীল কার্বনে রূপান্তরিত করে। এই জটিল কার্বন যৌগগুলো দীর্ঘস্থায়ী এবং মাটিতে ভেঙে যাওয়ার জন্য প্রতিরোধী। গবেষণায় দেখা যায় যে, এই কার্বনগুলো ছোট ছোট সংকুচিত কণা আকারে মাটিতে জমা হয়, যাকে মাইক্রো-এগ্রিগেট বলে। এই মাইক্রো-সমষ্টিগুলো একটি স্থিতিশীল বাসস্থান সরবরাহ করে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে কার্বন সংরক্ষণ করা যায়।
কৃষি জমি, বিশেষ করে ধানের জমি থেকে মিথেন নির্গমন কমানোর জন্য অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রাইস-টুইস ধান বা জীবন বর্ধিত ধান চাষ করে বায়ুমণ্ডলে মিথেন নির্গমনের হার কমানো সম্ভব। এই ধানের প্রধান গুরুত্ব হলো, এটা একবার চাষ করে দুইবার ফলন পাওয়া যায়।
বিষয়টি আর একটু বুঝিয়ে বললে বলা যায় যে, বোরো ধান চাষ করে ফসল ঘরে তোলার পর জমিতে ধানগাছের যে অবশিষ্ট অংশ থেকে যায়, যাকে আমরা নাড়া বলি, সেখান থেকে ঠিক ৪৫-৫০ দিনের মাথায় দ্বিতীয়বার ধান হবে। অর্থাৎ একবার চাষ করে দু'বার ফলন পাওয়া যাবে। এতে করে জমিতে আবার নতুন করে ধান লাগানোর জন্য জমি চাষ, সার প্রয়োগ, পানি সেচ ইত্যাদির প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ আমরা যে আউশ ধান চাষ করি তার আর প্রয়োজন হবে না।
ধানচাষের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে যে গ্রিনহাউস গ্যাস বিশেষ করে মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, 'রাইস-টোয়াইস' বা কুশি ধান চাষের মাধ্যমে সেটা কমানো যাবে। আবার দ্বিতীয়বার জমি চাষে যে খরচ হয়, সেটিরও আর দরকার পড়বে না।
বর্জ্য পদার্থ থেকে জৈব বর্জ্য পচে গিয়ে যে মিথেন নির্গমন হয়, তা হ্রাস করার একমাত্র উপায় হলো- জৈব বর্জ্যগুলোকে তার উৎস থেকে আলাদা করে সংগ্রহ করা। এই বর্জ্যগুলোকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জৈব সারে পরিণত করে সেগুলোকে কৃষি জমিতে প্রয়োগ করতে পারলে একদিকে যেমন বর্জ্য উৎপাদন হ্রাস পাবে, অন্যদিকে কৃষি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে।
ইতোমধ্যে ভাগাড় বা ল্যান্ডফিলে যে ময়লা জমে গেছে, তা থেকে প্লান্টের মাধ্যমে উৎপাদিত মিথেন গ্যাসকে ব্যবহারযোগ্য মিথেন জ্বালানিতে পরিণত করতে হবে। অন্যান্য কঠিন বর্জ্যগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। অর্থাৎ এগুলো চুল্লিতে পোড়ানোর মাধ্যমে যে তাপ উৎপন্ন হবে, তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যাবে, যেটা আমাদের দেশে ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব অর্থাৎ অন্তিম সময় শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে সম্প্রতি দাবানল এরই একটি রূপ। ভয়াবহ দাবানলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য। এর মধ্যে আবার শুস্ক বজ্রপাতেরও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কানাডায় ১২৫ বছরের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে ২৯ জুন মঙ্গলবার তা ৩৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার লিটন গ্রামে সর্বোচ্চ ৪৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এই অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বিভিন্ন জায়গায় দাবানলের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্রাজিলে আমাজনের উষ্ণমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে ২০১৯ সালে ব্রাজিলিয়ান স্পেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী রেকর্ডসংখ্যক দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। অস্ট্রেলিয়ার ২০১৯-২০২০ সালের দাবানল আর একটি ঘটনা। এভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দাবানলের কারণে পরিবেশ বিশাল এক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ফলে তাপমাত্রা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে গত ২৬ বছরের মধ্যে রাজধানী ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাজশাহীতে ৪১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে। দাবানল ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি প্রতিক্রিয়া। এই প্রতিক্রিয়া রোধের জন্য শিগগিরই আমাদের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঘরে আগুন লাগলে যেমন দ্রুত নেভানোর ব্যবস্থা করতে হয়, ঠিক তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের খারাপ প্রভাব থেকে বাঁচতে আমাদেরও ঠিক একইভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশের মানুষের ব্যক্তিগত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের হার কম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের খারাপ প্রভাব আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোই বেশি ভোগ করছে। ফলে প্রতিবছর বন্যা, খরা, সাইক্লোন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো দুর্যোগের শিকার হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন রোধ অর্থাৎ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস বা ইতোমধ্যে যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণ হয়েছে, তা অপসারণের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এর একটি উপায় হিসেবে আমরা কার্বন অফসেট বিষয়টি নির্বাচন করতে পারি। কার্বন অফসেট হলো জমিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড বা অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন হ্রাস; যা অন্য কোথাও তৈরি হওয়া নির্গমনের জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়। অর্থাৎ কোনো ইন্ডাস্ট্রি বা কলকারখানা থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ করবে অন্য একটি গ্রুপ। তারা গাছ লাগানো বা কৃষি কাজের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের কার্বন মাটিতে স্টোর করে রাখবে বা আটকে রাখবে। কে কী পরিমাণ কার্বন মাটিতে ফিরিয়ে এনেছে তা দেখিয়ে তারা কার্বন নির্গমনকারী গ্রুপ থেকে একটা নির্দিষ্ট টাকা নেবে। অর্থাৎ কার্বন নির্গমনকারী গ্রুপ তাদের নিঃসৃত কার্বন বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ করার জন্য ক্ষতিপূরণ দেবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে যেমন একটা উপার্জনের দিক খুঁজে পাবে, অন্যদিকে গ্রিনহাউস গ্যাস অপসারণেও সহায়তা করবে।
 

লেখকদ্বয় যথাক্রমে বিজ্ঞানী এবং পরিবেশ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী