১৯৮১ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের 'ঈদ আনন্দ মেলা' অনুষ্ঠানে ফকির আলমগীর একটি গান পরিবেশন করেন; 'ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে'! এ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ওই সময়েই! গীতিকার আলতাফ আলী রচনা করেছিলেন সেই 'ঐতিহাসিক' গানটি। সেই গানে নিজেই সুর দিয়ে গেয়েছিলেন ফকির আলমগীর। অনেকের মতে, এই গানটিই ফকির আলমগীরের জীবনের শ্রেষ্ঠ গান। গীতিকার কবির বকুল অবশ্য তার বিরোধিতা করে বলেন- 'মায়ের এক ধার দুধের দাম'ই ফকির আলমগীরের শ্রেষ্ঠ গান। আমি কবির বকুলের সঙ্গে একমত। 'মায়ের এক ধার দুধের দাম' গানটি কী কারণে তার শ্রেষ্ঠ গান- সে বিষয়ে একটু পরে আসছি। তার আগে একটু পেছনে ফেরা যাক।
ফকির আলমগীরের বন্ধুদের কেউ কেউ তাকে ডাকতেন 'লাল মিয়া' বলে। জুনিয়রদের কেউ কেউ বলতেন- 'লাল ভাই'। 'লাল মিয়া' নামটি তার পরিবারের দেওয়া ডাকনাম কিনা জানা নেই। কিন্তু 'লাল' রংটি ফকির আলমগীরের জীবনে মিশে গিয়েছিল তার ছাত্র জীবনের মাঝামাঝি সময়ে। '৬৬ সালে জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময়েই ফকির আলমগীর ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
ছাত্র ইউনিয়নের মেনন-মতিয়া গ্রুপের রাজনীতি দিয়েই তার যাত্রা শুরু। বাম রাজনীতির লাল রং, লাল ঝাণ্ডা ফকির আলমগীরকে তার প্রারম্ভিক জীবনেই প্রভাবিত করেছিল। সে কারণেই ফকির আলমগীর তার সংগীত জীবনেও থেকে গিয়েছেন শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি।
এর পরে, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে ফকির আলমগীর ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র। ওই বিষয়েই মাস্টার্স করেছেন তিনি। ওই উত্তাল সময়েও তিনি তার সংগীত দিয়েই লড়েছেন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তিনি অংশ নিয়েছেন কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে। জাতীয় জীবনের কঠিন এই স্রোতধারার বাঁকে বাঁকে বেড়ে উঠেছেন ফকির আলমগীর।
বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ফকির আলমগীর বলেছিলেন- 'শ্রেণি সংগ্রামের গান, মানবমুক্তির গান, লড়াইয়ে-শপথে উদ্দীপ্ত করার যে গান, সেটাই আমি গাওয়ার চেষ্টা করি। যতদিন শ্রেণি বৈষম্য থাকবে, শোষণ-বঞ্চনা থাকবে, অন্যায়-অবিচার থাকবে, ততদিন গণসংগীতের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না' (সূত্র- ইন্টারনেট)। সেই কথারই প্রতিফলন ঘটেছে তার প্রতিটি গানে। 'সখিনা-সিরিজ' তারই ধারাবাহিকতার ফসল।
আমি সংগীতের মানুষ নই! নই গীতিকার-সুরকার কিংবা গায়ক। কিন্তু শ্রোতা হিসেবে দুটি কান আর একটি সংবেদনশীল হৃদয় তো আছে। যেখানে কোনো 'শ্রুতি' কিংবা 'দৃশ্য' কখনও-সখনও প্রভাব ফেলে গভীরভাবে, সে জায়গায় ফকির আলমগীরের গান যতটা স্থান নিয়েছে- তারই প্রভাবে আজকের নিবন্ধটির অবতারণা।
তার মৃত্যুর পরে ফকির আলমগীরের উলেল্গখযোগ্য গানের তালিকা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। এর মাঝে সখিনা সিরিজের কয়েকটি গান, মায়ের একধার দুধের দাম, নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে একটি গান, কালো কালো মানুষের দেশে, জন হেনরি, আহা রে কাল্লু মাতব্বর, শান্তাহার জংশনে দেখা, মোর সখিনার কপালের টিপ, তোমার সন্তান যেন
থাকে দুধে-ভাতে, ঘর করলাম না রে
আমি অন্যতম।
এসব গানের প্রতিটিতেই সম্পৃক্ত আছে গণমানুষের নিত্যদিনের জীবন। প্রধানত খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের কাহিনি আর উপাখ্যানই প্রাধান্য পেয়েছে তার গানে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার জন্য নিত্যদিনের লড়াই, পাওয়া-না পাওয়া, প্রেম-বিরহ আর স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি তার গানের অন্যতম উপজীব্য বিষয়। এর মাঝে কোনো গান তিনি লিখেছেন কিনা আমার
জানা নেই। তবে বেশকিছু গানে তিনি
সুর দিয়েছিলেন। যার মাঝে 'ও
সখিনা...' অন্যতম।
'মায়ের একধার দুধের দাম' গানটি মূলত প্রাচীন লোকগীতির অংশ। জানা যায়, ১৯৭৭ সালের দিকে ফকির আলমগীর কোনো এক নৌকার ঘাটে কিংবা ফেরিতে কোনো এক অন্ধ বাউলের কাছ থেকে গানটি সংগ্রহ করেছিলেন। তবে, একেবারে নির্জলা সুরের গানটিতে তিনি নিজেই একবার সুর দিয়ে বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেন। এর পরে নব্বই দশকে অজিত রায়ের কম্পোজিশনে গানটি নতুন করে রেকর্ড করেছিলেন ফকির আলমগীর। তারও পরে আলাউদ্দিন আলীর কম্পোজিশনে এই গানটি 'অবরোধ' নামে একটি চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল। সবশেষে সুরকার ফরিদ আহমেদের কম্পোজিশনে এই গানটি আরও একবার ধারণ করা হয়েছে। তথ্যগুলো কবির বকুলের কাছে পাওয়া।
শুরুতে বলেছিলাম, এই গানটিই ফকির আলমগীরের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গান। এর অনেকগুলো কারণ আছে। এক. গানের বিষয় এবং বাণী। এই গানের বিষয়টি মানবিকতার চূড়ায় অবস্থান করছে। এর তাৎপর্য মানব জন্মের মূলে অবস্থান করার কারণে পৃথিবীর এমন কোনো মনুষ্য নামের প্রাণী নেই- যার হৃদয় এই গান শুনে বিদীর্ণ হয় না, চোখ দুটো জলে ভরে না! দুই. গানটির মাটিমাখা সুর। মাটির সোঁদা গন্ধের পাশাপাশি এই গানের সুরে প্রচণ্ড বিলাপ আছে। যা শ্রোতাকে টেনে নিয়ে যায় তার মায়ের নাভিমূলে- জন্মক্ষণে! সবশেষে ফকির আলমগীরের কিছুটা হাস্কি ভয়েস এবং তার অসাধারণ গায়কী।
মানুষ হিসেবে ফকির আলমগীরের পুরো জীবনটা খুব সার্থক মনে হয় আমার কাছে। তিনি তার আদর্শের স্থানটিতে খুব একটা ছাড় দিয়েছেন বলে জানা নেই আমার। হিংসার বশে অনেকে অনেক কিছুই বলেছেন ফকির আলমগীরকে। কখনও শারীরিকভাবে অপদস্থ করার চেষ্টাও করেছেন কেউ কেউ। তাতে ফকির আলমগীর কিন্তু তার আদর্শ আর গানের অবস্থান থেকে চ্যুত হননি, বিচলিত হননি এতটুকু! একজন বামপন্থি কর্মীর আদর্শিক দৃঢ়তা দিয়ে তিনি লড়াই করেছেন আজীবন; যা আজকাল অনেক বামপন্থির মাঝে খুঁজে পাওয়া দুস্কর!
প্রতিটি ইংরেজি বছরে মে মাস আসবে যথানিয়মেই। প্রেস ক্লাব চত্বর কিংবা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির মাঠে কোনো না কোনো সাংস্কৃতিক দল হয়তো শ্রমজীবী মানুষের হয়ে গান গাইবে, আবৃত্তি করবেন কোনো আবৃত্তিকার; বক্তব্য রাখবেন কোন রাজনীতিক। কিন্তু ফকির আলমগীরের ভরাট খসখসে কণ্ঠে আর শোনা যাবে না- 'নাম তার ছিল জন হেনরি, ছিল যেন জীবন্ত ইঞ্জিন......'!
ফকির আলমগীর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, সত্যিই। কিন্তু রয়ে গেছে তার গান। তিনি আর স্বকণ্ঠে গাইবেন না কোনোদিন আমাদের জন্য। কিন্তু যতদিন এই দেশে তার 'সকিনা'রা আছে, কালল্গু মাতব্বররা আছে, প্রতিজন মা যতদিন জন্ম দেবে
নব শিশু- ততদিন ঘুরেফিরে ফকির আলমগীর আসবে তার শ্রোতাদের কাছে, অনুরাগীদের কাছে নানাভাবে, নানান রূপে। রেলের চাকার শব্দ, ইঞ্জিনের হুইসেল আর শ্রমজীবী মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন ফকির আলমগীর। প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু নেই; মৃত্যু নেই গণমানুষের শিল্পী ফকির আলমগীরের। শ্রমজীবী মানুষের জয় হোক।
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা