অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এ অর্থনীতিবিদ সম্প্রতি টোকিও অলিম্পিকে আরও একটি গৌরবময় শীর্ষ আন্তর্জাতিক পুরস্কার 'দ্য অলিম্পিক লরিয়েল' অর্জন করেন। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা পুরস্কার ও সম্মাননা পান তিনি। দারিদ্র্য নিরসনে তার সামাজিক ব্যবসা মডেল বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণের আগে মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতেও শিক্ষকতা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এ স্নাতক যুক্তরাষ্ট্রের ভেন্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৪০ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
সমকাল: প্রথমেই 'দ্য অলিম্পিক লরিয়েল' অর্জনের জন্য আপনাকে অভিনন্দন। আপনার পরিকল্পনায় 'সোশ্যাল অলিম্পিক' উদ্যোগ এবং 'ইউনূস স্পোর্টস হাব' সম্পর্কে বলেছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। এই উদ্যোগগুলো আসলে কী?
মুহাম্মদ ইউনূস: ধন্যাবদ। আমার একটা বক্তব্য আমি এর আগে অনেক ফোরামে, অনেক আলোচনায় বলেছি। সেই কথাটা আগের অলিম্পিক থেকেই আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিসহ সংশ্নিষ্টদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। সেটা হচ্ছে, বিশ্ব ক্রীড়াজগতের বিশাল অপরিমেয় শক্তি আছে। ক্রীড়াকে ঘিরে মানুষের যে আবেগ, প্রাণের টান; এর একটা বিপুল শক্তি আছে। কিন্তু এই শক্তি শুধু বাণিজ্যের কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। এই যে অলিম্পিক, সেটাকে কেন্দ্র করেই নানা পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখি। বিশাল বাণিজ্য হয় একেকটা আয়োজন ঘিরে। আমি তাদের বললাম, ক্রীড়াজগতের এই বিশাল শক্তিকে সমাজ পরিবর্তনের কাজে লাগানো সম্ভব। এর আগে রিও অলিম্পিকে আমাকে দাওয়াত করেছিল। সেখানে এ বিষয় নিয়ে লম্বা বক্তৃতা দিয়েছিলাম। এর পর ফ্রান্সের অলিম্পিক দলের প্রধান ও প্যারিসের মেয়র অ্যানি হিডালগো আমার সঙ্গে বসলেন। তিনি জানালেন, ২০২৪ সালের অলিম্পিক আয়োজনের জন্য প্যারিসও প্রার্থী। এখন যদি অলিম্পিককে সামাজিক উদ্যোগের অংশ করার কথা চিন্তা করা হয়, সেটা কি সম্ভব? আমি বললাম, অবশ্যই সম্ভব। এর পর তারা পরবর্তী সময়ে আমাকে প্যারিসে আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে বৈঠক হলো। তাদের যে টিম আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিতে ২০২৪ সালে প্যারিসে অলিম্পিক আয়োজনের জন্য প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে, তারও সদস্য করা হলো আমাকে। সে দলের প্রধান ছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোন। তিনি, অ্যানি হিডালগো ও আমি- এই তিনজনের দল। এর পর আইওসির বৈঠকে প্যারিসের প্রস্তাবের পক্ষে আমরা তিনজনই বক্তব্য দিলাম। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের অলিম্পিক প্যারিসে আয়োজনের জন্য তারা সম্মত হলো।
সমকাল: সোশ্যাল অলিম্পিক বিষয়টি কী?
মুহাম্মদ ইউনূস: একটা অলিম্পিক আয়োজনের জন্য সাত থেকে সাড়ে সাত বিলিয়ন ইউরো ব্যয় হয়। কারণ একটা অলিম্পিক ঘিরে নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করতে হয়। যেমন- প্রায় ১৫ হাজার খেলোয়াড়ের থাকার জন্য অলিম্পিক ভিলেজ তৈরি করতে হয়, সুইমিংপুল করতে হয়। এ ধরনের অনেক স্থাপনা, অনেক ধরনের খরচ এবং যার পরিমাণ প্রায় সাত বিলিয়ন ইউরো। এই যে বিপুল ব্যয়ের স্থাপনা, সেটা অলিম্পিকের ক্ষেত্রে কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে যায়। রিওতে দেখেছি, কতগুলো বহুতল ভবন করা হয়েছে, যেগুলো অলিম্পিক শেষ হওয়ার পর পরিত্যক্ত হয়ে নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। অলিম্পিকে যে ব্যয় হবে, তার সুফল যেন পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ পায়, দরিদ্র মানুষ পায়, তার ব্যবস্থা করাটাই হবে 'সোশ্যাল অলিম্পিক'। যেমন খেলোয়াড়দের জন্য অলিম্পিক ভিলেজ এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যেন সেটি পরবর্তী সময়ে গৃহহীন কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের বাসা ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের আবাসন হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্যারিসের সেন্ট ডেনিসে যেখানে অলিম্পিক হবে, সেখানেও অসংখ্য গৃহহীন মানুষ রয়েছে। তারা এই পরিকল্পনায় খুবই উৎসাহ বোধ করল এবং সেভাবেই প্রস্তুতি চলছে। প্যারিস অলিম্পিক-পরবর্তী সময়ে এই অলিম্পিকের যা কিছু থাকবে তা বিভিন্নভাবে সামাজিক উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। এভাবেই 'সোশ্যাল অলিম্পিক'-এর যাত্রা শুরু হচ্ছে।
সমকাল: আর 'ইউনূস স্পোর্টস হাব?'
মুহাম্মদ ইউনূস: আমি আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কাছে আরও একটি প্রশ্ন রেখেছিলাম। আমরা দেখি, একেকটা ইভেন্টে একজন অ্যাথলেট চ্যাম্পিয়ন হয়। কিংবা একেকটা ক্লাব থেকে একজন হয়তো তারকা খ্যাতি পায়। একজন রোনালদো হয়, মেসি হয়। কিন্তু এক চ্যাম্পিয়নের পেছনে ৯৯ জন ব্যর্থ খেলোয়াড় থাকে, যারা চ্যাম্পিয়ন হয় না, তারকা হয় না। তারা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, সে খবর রাখা হচ্ছে কিনা- এর জবাব কিন্তু নেই। একজন খেলোয়াড় ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত খেলে। এর পর তার আর করার কিছু থাকে না। কারণ সে তো এই সময়টা খেলা ছাড়া আর কোনোকিছুর পেছনে দেয়নি, কিছু শেখেওনি। এই খেলোয়াড়দের অনেকেই কর্মহীন, মানবেতর জীবন যাপন করে। সেই খোঁজ আমরা রাখছি কিনা? এই প্রশ্ন থেকেই একটা উদ্যোগ সামনে এলো আমার পরিকল্পনায়। সেটা হচ্ছে, এই খেলোয়াড়দের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তারা সামাজিক ব্যবসাও করতে পারে। নিজের জীবিকার জন্য নিজেদের মতো উদ্যোগ নিতে পারে। এ জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। 'ইউনূস স্পোর্টস হাব'-এর মাধ্যমে এই চ্যাম্পিয়ন না হওয়া, তারকাখ্যাতি না পাওয়া খেলোয়াড়দের জন্য উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যেমন আইভরি কোস্ট সরকার আমার পরিকল্পনায় বড় পরিসরে অ্যাথলেটদের জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় চার হাজারের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ইউনূস স্পোর্টস হাবের সঙ্গে আরও প্রায় ১০ হাজার যুক্ত আছে। এই প্রশিক্ষণ চলমান।
সমকাল: বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব?
মুহাম্মদ ইউনূস: অবশ্যই সম্ভব। তবে আমাদের যারা ডাকে, যারা খেলোয়াড়দের উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের জন্য সহায়তা চায়, ইউনূস স্পোর্টস হাব তাদের পরামর্শ দেয়, প্রশিক্ষণ দেয় সামাজিক ব্যবসা হিসেবে। যেমন আইভরি কোস্ট চেয়েছে। সেখানে ইউনূস স্পোর্টস হাব উদ্যোগ নিয়েছে। সেটা সফল হয়েছে। এভাবে যদি কেউ ইউনূস স্পোর্টস হাবকে ডাকে, অবশ্যই তারা সাড়া দেবে।
সমকাল: এবার অলিম্পিক অনুষ্ঠানের সময় বিশ্বজুড়ে চলছে করোনা মহামারি। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে অলিম্পিকের মতো মেগা আয়োজনের পরিস্থিতি থাকবে?
মুহাম্মদ ইউনূস: মহামারি আসার পর আমরা বুঝতে পারছি, পৃথিবীকে কতটা বিপদের মধ্যে রেখেছি। আসলে এখনকার বিশ্বে চলছে মুনাফার অর্থনীতি। ১ শতাংশ মানুষের কাছে বিশ্বের সব সম্পদ। তারা ৯৯ শতাংশ মানুষকে ব্যবহার করে মুনাফা করছে। কারণ যেসব মানুষ এই ১ শতাংশ ধনীর জন্য চাকরি করে, তারা প্রকৃতপক্ষে তাদের সক্ষমতাকে উজাড় করে দিচ্ছে ওইসব মানুষের জন্য। এ কারণে সম্পদ কিছু মানুষের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে। মহামারির সময়ে এ ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে আরও বড়সংখ্যক মানুষ দরিদ্র হয়েছে। এটা বিশ্বের সামনে বড় ধরনের অশনিসংকতে। এভাবে চললে পৃথিবীকে রক্ষা করা যাবে না।
সমকাল: এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কী করতে হবে?
মুহাম্মদ ইউনূস: আমি আরও আগে থেকে বলে আসছি, 'তিন শূন্য' দিয়ে পৃথিবীকে গড়ে তুলতে হবে- কার্বন নিঃসরণশূন্য হতে হবে, দারিদ্র্য শূন্য শতাংশ হতে হবে; বেকারত্ব শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এই তিন শূন্যের পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করা না গেলে ২০৫০ সালের আগেই পৃথিবী আক্ষরিক অর্থে অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
এ সংকট থেকে বাঁচতে হলে বর্তমান মুনাফাভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতি বদলাতে হবে। মুনাফার ভয়াবহ প্রতিযোগিতায় বিশ্ব আজ মৃত্যুপথযাত্রী। আমরা বিপজ্জনক অর্থনীতির মধ্যে থেকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। এ জন্য এখনই এ অর্থনীতি বাদ দিতে হবে। মানুষকে ছা-পোষা চাকরিজীবীর অর্থনীতি বদলে উদ্যোক্তা তৈরির অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব সক্ষমতা আছে। সেটা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে প্রত্যেক মানুষই একেকজন উদ্যোক্তা হতে পারে। মানুষ অন্যের জন্য নয়, প্রত্যেকে নিজের জন্য কাজ করবে। তার কাজের মধ্য দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। কারও মুখাপেক্ষী হবে না, করুণার ভাগীদার হবে না।
সমকাল: এ ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কি বর্তমান বিশ্ব-বাস্তবতায় সম্ভব?
মুহাম্মদ ইউনূস: আমি প্রশ্ন করতে চাই- কেন সম্ভব নয়? এই বিশ্ব ব্যবস্থা, এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আমরাই পরিচালনা করছি। আমরাই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বকে বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। তাহলে আমরা কেন ঘুরে দাঁড়াব না? এই পৃথিবীর অস্তিত্ব না থাকলে, মানুষ না বাঁচলে সম্পদের পাহাড় কোন কাজে আসবে? আমাদের এখন আসন্ন বিপদের বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে এবং বর্তমান মুনাফার অর্থনীতিকে বদলে উদ্যোক্তার অর্থনীতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
সমকাল: মহামারিতে ভ্যাকসিনও যেন মুনাফা বাণিজ্যের শিকার।
মুহাম্মদ ইউনূস: অবশ্যই। এই মহামারি কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; গোটা বিশ্বের সমস্যা। বিশ্বজুড়ে মহামারি; মানুষ মরছে। মানুষকে বাঁচাতে হলে ভ্যাকসিন লাগবে। অথচ সেই ভ্যাকসিন নিয়েও মুনাফার বাণিজ্য চলছে। যেসব দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত সম্পদ আছে, তারা মহামারির সময়ে শুধু নিজেদের কথাই ভেবেছে। এক ডোজের জায়গায় পাঁচ ডোজ ভ্যাকসিন কিনেছে। আগে থেকে চুক্তি করে প্রয়োজনের তুলনায় কয়েক গুণ অর্ডার দিয়েছে। তারপর সেগুলো নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে। প্রতিবেশীদের কথা, বিপন্ন দেশগুলোর কথা, মানুষের কথা চিন্তা করেনি। অথচ মহামারিটি বৈশ্বিক। এটি মোকাবিলার জন্য একক দেশভিত্তিক নয়, বৈশ্বিক পরিকল্পনা নিতে হবে- সেটি আমলেই নেওয়া হচ্ছে না।
সমকাল: ভ্যাকসিনের এই মনোপলি ভাঙা যায় কীভাবে?
মুহাম্মদ ইউনূস: ভ্যাকসিন ছাড়া মানুষকে এই মহামারির সংক্রমণ থেকে বাঁচানোর বিকল্প নেই। ভ্যাকসিন মানুষের অধিকার। ভ্যাকসিন কোনো দান-খয়রাতের বিষয় নয়। অথচ সেই ভ্যাকসিন ঘিরে চলছে 'পেটেন্ট'-এর নামে মুনাফা বাণিজ্য। এই পেটেন্টের দেয়াল ভেঙে দিতে হবে। বিশ্বের যে দেশেরই সক্ষমতা আছে, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে দিতে হবে। যদি পেটেন্টের দেয়াল না ভাঙা হয় এবং এই দান-খয়রাত ও বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, তাহলে বিশ্বের সব মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে ৫৭ বছর লাগবে। আর যদি পেটেন্টের দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়, বৈশ্বিক প্লান্টের পরিকল্পনায় ভ্যাকসিন উৎপাদন করা হয়, তাহলে আগামী ২০২২ সালের মধ্যেই বিশ্বের সব মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। পৃথিবী বাঁচবে।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মুহাম্মদ ইউনূস: সমকালকেও ধন্যবাদ।