সেন্টার ফর দ্য প্রোটেকশন অব আফগান উইমেন জার্নালিস্টের পরিচালক ফরিদা নেকজাদ কাবুল থেকে বিশ্ববাসীর উদ্দেশে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন- আমাদের সুরক্ষা এখন কে নিশ্চিত করবে? ইতোমধ্যেই ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো যেন ২৫ বছর আগে ফিরে গেছে। আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষও কি ফিরে গেছে ২৫ বছর পেছনে? আফগানিস্তান এখন বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে খবরের শিরোনাম। সেই শিরোনামে বিতর্কিত নাম তালেবান। আমেরিকা প্রত্যাবর্তন করছে তা যেমন সত্য, সেই সঙ্গে তালেবান আফগানিস্তানের একের পর এক জেলায় আধিপত্য কায়েম করছে তা-ও সত্য। দখল করেই তালেবান ফতোয়া দিচ্ছে- হিজাব আর বোরকা ছাড়া মেয়েরা রাস্তায় বের হতে পারবে না, একা একা চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যাবে না এবং নারী সাংবাদিক আর মানবাধিকারকর্মীদের বাড়ি থেকে বের হওয়া নিষেধ। ১৯৯৬ সালে ঠিক এমনটাই ছিল পুরো আফগানিস্তানে। সে বছরই আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করেছিল তালেবান। ২০০১ সাল পর্যন্ত রাজত্ব চালিয়েছিল তারা। ইতোমধ্যে ২০টি বছর কেটে গেছে। আমেরিকার সাহায্যে আফগান সরকার তালেবানকে ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে। সংবাদমাধ্যমের বাক্‌-স্বাধীনতা থেকে শুরু করে নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার সবটাই তিল তিল করে অর্জিত হচ্ছে দেশটিতে।
আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো এবং আমেরিকান বাহিনী বিদায় নিতে শুরু করেছে কয়েক মাস হলো। এরই মধ্যে মোট ৪০০ জেলার মধ্যে ১৮০টি তালেবানের দখলে চলে গেছে। আফগানিস্তান থেকে আমেরিকা সেনা সরালে শান্তি ফিরুক বা না-ই ফিরুক, তালেবান শাসন যে আরও জেঁকে বসবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আফগানিস্তানে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা হবেই- স্বমূর্তি ধারণ করে তালেবান ইতোমধ্যে দু-একবার হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে। অনেক বিশ্নেষকেরই ধারণা, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী চলে গেলে কাবুলে আশরাফ ঘানি সরকারের পতন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হামিদ গুল আজ বেঁচে নেই। হামিদ গর্বের সঙ্গে বলতেন, যখন আফগানিস্তানের ইতিহাস লেখা হবে, তখন এ কথাও নথিভুক্ত থাকবে যে, আইএসআই আমেরিকার সাহায্য নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করেছিল। এরপর নাকি ব্যঙ্গ করে বলতেন, পরবর্তী সময়ে ইতিহাসবিদরা এটাও লিখে রাখবেন যে, একদিন আইএসআই আমেরিকার মদদ নিয়ে আমেরিকাকেই হারিয়েছিল। আফগানিস্তানের মাটিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল বাহিনীকে গুটিয়ে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় আইএসআইর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল বলে হামিদ গুল দাবি করতেন। সে সময় পাকিস্তান একই জঙ্গিদের কাজে লাগিয়ে আফগানিস্তানে একটি মুজাহিদীন গোষ্ঠী তৈরি করে। সেই মুজাহিদীন গোষ্ঠীই হচ্ছে তালেবান। তালেবান খুব দ্রুত আফগানিস্তান দখল করে। তালেবানের নতুন ইসলামী সাম্রাজ্যে গেড়ে বসে ওসামা বিন লাদেন এবং আমেরিকায় নাইন-ইলেভেনের হামলার নির্দেশ দেয়। পরে আমেরিকার তীব্র সামরিক অভিযানে তালেবানের পতন ঘটে এবং ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানে গা-ঢাকা দেয়। অ্যাবোটাবাদে সেই লাদেনকে শনাক্ত করে আমেরিকা এবং ২০১১ সালে মার্কিন বিশেষ বাহিনী লাদেনকে হত্যা করে। একই সঙ্গে আফগানিস্তানে চলতে থাকে সংঘর্ষ। কিন্তু যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমেরিকা এ যুদ্ধ শুরু করেছিল, গত ২০ বছরেও তা করে দেখাতে পারেনি। এত প্রাণহানি, এত সম্পদ ক্ষয় ও এত সামাজিক বিপর্যয়ের মূল্য হিসেবে শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানের পূর্ণ ক্ষমতায় তালেবানেরই আসার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।
দু'দশক ধরে আফগানিস্তানের মাটিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে ক্লান্ত আমেরিকা এবার নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজতেই যেন ব্যস্ত। ঘোষণা দিয়েছে, চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেখান থেকে তারা সব সেনা গুটিয়ে নেবে। ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের দক্ষিণের বেশিরভাগ অঞ্চলই এখন তালেবানের হাতের মুঠোয়। উত্তরেও একের পর এক এলাকা দখলে তৎপর তারা। আফগানিস্তানে বর্তমানে প্রতি মুহূর্তে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে তালেবানের ছোঁড়া রকেট এবং স্বয়ংক্রিয় বন্দুকের আওয়াজ। এরই মধ্যে নিজেদের বিদেশনীতি বদলে আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে গোপনে আলোচনার দরজা খুলেছে ভারতও। অন্যদিকে, হঠাৎ একদিন সকাল হতেই স্থানীয় আফগানরা বিস্মিত হয়ে দেখছে, আফগানের মাটিতে আমেরিকার বৃহত্তম সেনাঘাঁটি বাগরাম এয়াররেস দ্বারমুক্ত, রক্ষীহীন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমেরিকার দীর্ঘতম যুদ্ধ শেষ হতে চলেছে এক নিদারুণ পরাজয় দিয়ে। তারপরও আমেরিকা লোক-দেখানো এবং শেষ মুখ রক্ষা করার জন্য বিদায়ের আগে আফগানিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় তালেবানের প্রতি বিমান হামলা চালাচ্ছে। এ কথা একেবারেই স্পষ্ট করে বলা যায়, আমেরিকা সেনা তুলে নেওয়ার পর কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে আফগান বাহিনী। পুরো দেশটাই এক সময় আবার তালেবানের হাতেই চলে যেতে পারে।
আফগানিস্তানের কান্দাহারের স্পিন বোলদাকে আফগান সেনা ও তালেবানের গুলিযুদ্ধের মধ্যে পড়ে ইতোমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন সংবাদ সংস্থা রয়টার্সে কর্মরত পুলিৎজারজয়ী ভারতীয় সাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের দুর্দশার চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য পুলিৎজার পান দানিশ। সংকটের মুহূর্তে মানুষের অসহায়ত্বই শুধু তার ছবিতে ধারণ করেননি দানিশ। আক্রান্ত মানুষের প্রত্যয়ী দৃঢ়তাকেও সসম্মানে ছবিতে স্থান দিয়েছেন। কিন্তু সেই ছবির মতো এবার দানিশ নিজেও স্মৃতি হয়ে গেলেন। তালেবান আর আফগান সেনার যুদ্ধবাজ অঞ্চলে ঝাঁঝরা হয়ে গেল দানিশের বুক।
প্রশ্নটি তাই অনেক বড় হয়েই যাচ্ছে। তালেবান কি আবার আফগানিস্তানের শাসনে? আফগানিস্তানে আমেরিকার ভয়াবহ পরাজয়ের পর তালেবান বন্ধু পুনরুজ্জীবিত পাকিস্তান-ভারতের কাছে নতুন করে বিপদের ঠিকানা হয়ে হাজির হতে পারে। দেয়ালের লিখন বুঝি মুছে যায় না। সেই হামিদ গুলের কথাই বুঝি সত্যি হয়ে গেল! আফগানিস্তানের পুরোনো ঘটনাক্রম স্মৃতিপথে উঁকি মারছে। এবার আরও এক শক্তির প্রস্থান ঘটছে, আরও একপ্রস্থ ভয়াবহ সংঘাতের অপেক্ষা। আরও একবার ধ্বংসের পথে কি কাবুল?
অবসরপ্রাপ্ত মেজর ও কলাম লেখক
ceo@ilcb.net