গত ২২ জুলাই, ২০২১ আমার বাবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ভূঁইয়া ইকবাল আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবন শেষে দৈনিক বাংলায় সাংবাদিকতা করছিলেন। ১৯৭৩ সালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের আহ্বানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রথমে গবেষক ও পরে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ৪৫ বছরের বেশি সময় চট্টগ্রামে কাটিয়ে আমার মায়ের অবসর গ্রহণের পর ঢাকায় চলে আসেন ২০২০-এর জুনে। করোনা-আক্রান্ত কঠিন সময়ে সতর্ক জীবনযাপন করছিলেন। দুই ডোজ টিকা নেয়ার পর কিছুটা নিরাপদ বোধ করায় এবং আসন্ন কিডনি ডায়ালাইসিসের কথা ভেবে গত জুন থেকে সতর্কতায় কিছুটা শৈথিল্য আসে। হঠাৎ আক্রান্ত হন করোনায়। ২ জুলাই সামান্য উপসর্গে টেস্ট করানো হয়। পজিটিভ রিপোর্ট আসায় ৩ জুলাইয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ৮ জুলাই থেকে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। দুর্বল কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের কারণে বিভিন্ন ইনফেকশনের সঙ্গে লড়াইয়ে অবশেষে পরাজিত হন। আমাদের আত্মীয় ডা. সাখাওয়াত হোসেন খানের নিবিড় যত্ন ও সুচিন্তিত চিকিৎসা সত্ত্বেও তাঁকে ফিরে পেলাম না।
তিনি চেয়েছিলেন কর্মক্ষম থাকতে থাকতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে। তাঁর সে ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে, তবে আমাদের জন্য তা আকস্মিক, প্রস্তুতিহীন। গত দু'বছরে পাঁচটি গ্রন্থ সংকলন ও বিশটির বেশি নিবন্ধ থেকে বোঝা যায় তিনি কাজ উপভোগ করছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের ঢাকায় ফিরে তরুণ লেখক-সম্পাদকদের প্রীতি ও শ্রদ্ধা লাভ করেছিলেন, যা সম্ভবত তাঁকে আরো প্রেরণা জুগিয়েছিল। ২০১২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর 'সুপ্রভাত বাংলাদেশ' নামের চট্টগ্রামের দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা সম্পাদনা তিনি উপভোগ যেমন করেছিলেন, তেমনি ২০১৭-১৯ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের পরিচালনা তাঁকে তৃপ্তি দিয়েছিল।
অবসর-পরবর্তী জীবনের এ কর্মব্যস্ততা স্বাভাবিক মনে হয় তাঁর ছাত্রজীবনের বহুমাত্রিক সক্রিয়তার কথা বিবেচনা করলে। তাঁর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে সুহৃদরা 'নিভৃতচারী', 'প্রচারবিমুখ'- এ শব্দগুলো ব্যবহার করছেন। এ স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের কারণে আমরা সরাসরি খুব বেশি জানতে পারিনি তাঁর শৈশব-কৈশোরের কর্মমুখর সময়ের কথা। তবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহীম ও শামসুর রাহমানের স্মৃতিকথায় কিছুটা ইঙ্গিত পাই। টরেটক্কা নামে একটি বিজ্ঞান পত্রিকা সম্পাদনার সূত্রে (বন্ধু কাদের চাচার সঙ্গে) ইব্রাহীম চাচার সঙ্গে পরিচয় হয় নবম শ্রেণিতে পাঠরত অবস্থায়। জীবনস্মৃতিতে মানুষ দেশ বিজ্ঞান (২য় খণ্ড, পৃ-৫৪)-এ তিনি লিখছেন :"ইকবাল ছেলেটির প্রতিভা কিন্তু বহুমাত্রিক। বয়স নির্বিশেষে সে যে কারো খুব কাছাকাছি যেতে পারে, সে এক অদ্ভুত ক্ষমতা। দেখলাম এ শুধু দু-একজন মানুষ নয়- অনেক গুণী মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় রয়েছে, বিশেষ করে সাহিত্য জগতের মানুষদের সঙ্গে। নানা দুষ্প্রাপ্য বই, পুস্তিকা, পোস্টকার্ড ইত্যাদি খুঁজে পাওয়ার, এগুলোর মূল্য বোঝার এবং সংগ্রহেরও এক অদ্ভুত ক্ষমতা তার আছে। নানা ধরনের সাহিত্যের নমুনা- কবিতা, গল্প, প্রবন্ধের পটভূমি বের করতেও সে সিদ্ধহস্ত।" তাঁর এ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ইব্রাহীম চাচার বৃহত্তর পরিবারের সঙ্গে আমাদের গভীর প্রীতির বন্ধন তৈরি হয়েছে চিরদিনের জন্য।
কলেজজীবনে তিনি প্রকাশ করেন কবিতা-বিষয়ক ছোটকাগজ 'পূর্বলেখ'। সেসময়কার একটি বিবরণ পাই শামসুর রাহমানের আত্মজীবনীতে: "সম্ভবত ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে ভোরবেলা অফিসে আমার নির্ধারিত চেয়ারে বসে সেদিনের পত্রিকার পাতায় চোখ বুলোচ্ছিলাম, এমন সময় একজন সদ্যতরুণ ঘরে ঢোকার অনুমতি চাইলেন ঈষৎ কম্পিত কণ্ঠস্বরে। আমি তাকে ভেতরে আসতে বললাম। খানিক থেমে বলল, 'আমাকে তুমিই বলুন। আমার নাম ভূঁইয়া ইকবাল। আমি একটি কবিতাপত্র প্রকাশ করতে চাইছি। আপনার একটি কবিতা আমার দরকার।' অনেকদিন আগেকার কথা। ভূঁইয়া ইকবালের পত্রিকাটির নাম ছিল, যতদূর মনে পড়ছে, 'পূর্বলেখ'। আমি তাকে ক'দিন পরে একটি কবিতা দিয়েছিলাম। সম্ভাব্য পত্রিকাটি আদৌ প্রকাশিত হবে কিনা তা না জেনেই। ভূঁইয়া ইকবালের কণ্ঠস্বরে নয়, ওর চশমার আড়ালে দীপ্ত দৃষ্টি লক্ষ্য করেই বুঝতে পারলাম সে দৃঢ়চেতা এবং নিজের কাছে সংকল্পবদ্ধ। তাকে শনাক্ত করতে আমার ভুল হয়নি। আঠারো বছরের এই তরুণ বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর। 'বাংলাদেশের উপন্যাসে সমাজচিত্র' অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি হাসিল করেছেন। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই উপহার দিয়েছেন পাঠকদের। ভূঁইয়া ইকবালের খ্যাতি আমাকে আনন্দিত করে খুবই। কারণ আমি তাকে চোখের সামনে গড়ে উঠতে দেখেছি। আরও ভালো লাগে এ কারণে যে, কোনো রকমের অহমিকাকে ঠাঁই দেননি তার মনের গভীরে অথবা বাইরের আচরণে।" (কালের ধুলোয় লেখা, পৃ. ১৬৭)
শামসুর রাহমানের স্নেহ আমার বাবার পরম প্রাপ্তি। তিনি ১৯৮৫ সালে বাবাকে একটি কবিতার খাতা উপহার দেন যা সুদৃশ্য পাণ্ডুলিপি চিত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে ২০২০-এ জার্নিম্যান প্রকাশনী থেকে। দৈনিক পাকিস্তান ও পরে দৈনিক বাংলায় সাংবাদিকতার সময় শামসুর রাহমান ছাড়াও হাসান হাফিজুর রহমান, আহমেদ হুমায়ুন প্রমুখের স্নেহধন্য হন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কবিতা বিষয়ক পত্রিকার প্রকাশক আমার বাবা তখন পড়ছেন বাংলা বিভাগে- বিষয় নির্বাচন ছিল আগ্রহ-নির্ভর, বৈষয়িক বিবেচনা ছিল গৌণ। ফলে সুযোগ হয় পছন্দের পরিবেশে নিজেকে বিকশিত করার। চিরস্থায়ী বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল আড্ডা, দৈনিক পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা (রোমান হলিডে দেখে সাংবাদিকতায় অনুপ্রাণিত) হিসেবে কর্মচাঞ্চল্য, ষাটের দশকের গণমুখী রাজনীতির কিছুটা সংস্রব, প্রিয় সাহিত্যিকদের সাহচর্য- সব মিলিয়ে তাঁর বর্ণময় সময়। আমার কণ্ঠস্বর-এ নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন- সে সময় তাঁর ও আবুল হাসানের যৌথ কাব্য (কবিতা, অমীমাংসিত রমণী ও যে তুমি হরণ কর) প্রকাশের উদ্যোগ নেন তিনি, প্রকাশ করেন বিজ্ঞাপন। অর্থাভাবে গ্রন্থটি আর প্রকাশ করতে পারেননি। প্রিয় তরুণ কবির কবিতা প্রকাশের জন্য বিপুল উৎসাহে অর্থ জোগাড়ের চেষ্টায়রত আরেক যুবকের ছবি ভেসে ওঠে কল্পনায়। এ ছবিটা আমার খুব প্রিয়। সৎ সরকারি কর্মকর্তার সীমিত আয়ের পরিবারে থেকে এই উৎসাহ কীভাবে পেতেন- এমন প্রশ্নের জবাবে শুনিয়েছিলেন হাসান হাফিজুর রহমানের কথা। একুশের অমূল্য সংকলনের ছাপার দায় মেটাতে কলেজ পড়ুয়া তরুণ বাড়ি গিয়ে সুপারি বিক্রি করে টাকা এনেছিলেন। পত্রিকা প্রকাশের পরবর্তী পর্বে তাঁকে পাই প্রবন্ধ পত্রিকা বক্তব্যের প্রধান সম্পাদক হিসেবে (প্রকাশকাল সম্ভবত ১৯৭৭-৮৪), সম্পাদক জাহাঙ্গীর চাচা (মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর)। কয়েকটি সংখ্যার সূচিপত্রে দেখতে পাচ্ছি লিখেছেন আবদুর রাজ্জাক, বদরুদ্দীন উমর, সরদার ফজলুল করিম, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুহাম্মদ ইউনুস, শওকত আলী, বোরহান উদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, আবুল কাসেম ফজলুল হক, আহমদ কবির, হাসান আজিজুল হক, হুমায়ুন আজাদ, রিজওয়ানুল ইসলাম, মুনতাসীর মামুন, আবুল মোমেন, আতিউর রহমান, সারওয়ার উদদীন, সাইদ উর রহমান, মোরশেদ শফিউল হাসান, আসহাবুর রহমান, মাহবুবুল্লাহ, সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রমুখ।
সীমিত সামর্থ্য ও অসীম স্বপ্নের অধিকারী যে তরুণ ষাট ও সত্তর দশকে সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি-গণমুখী স্বাধীনতাকামী রাজনীতি- প্রতিটি অঙ্গনে সক্রিয় থেকেছেন সুসংস্কৃত, মানবতাবাদী সমাজ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে, আমৃত্যু সে আদর্শে আস্থাশীল ছিলেন। বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও সেই প্রজন্মের স্বপ্নবান মানুষের প্রতি মুগ্ধতা কোনো এক বিন্দুতে যেন মিলে গেছে। আমাদের কালে আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতার ও বস্তুগত আকর্ষণের বিস্তারে সেই সমষ্টিগত কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা বিরল হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর ঢাকার তুমুল কর্মচাঞ্চল্যে বিরতি এলেও নতুন উপভোগের সুযোগ আসে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ তখন অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামালের পরিবারের সঙ্গে তাঁর যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে, তার সুবাদে এখনো আমরা তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে সহোদরসুলভ ভালোবাসা পাচ্ছি। এছাড়া পদার্থবিজ্ঞানের এখ্‌লাসউদ্দীন চাচা, চারুকলার মুর্তজা বশীর চাচা ও আরও কিছু পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা ও সান্নিধ্যলাভ ছিল বিরল সুযোগ। অন্যদিকে, এ সময়ে প্রকাশিত হয় সম্ভবত তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ 'মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়' নামের সংকলনটি, যার জন্য তিনি লাভ করেন বাংলাদেশ লেখক শিবির প্রদত্ত হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার।
আশির দশকের শুরুতে কলকাতায় যান পিএইচডি করতে আমার মাসহ। তখনকার কলকাতার বর্ণাঢ্য সাহিত্য-সংস্কৃতির আস্বাদ নেন প্রাণভরে। স্নেহ লাভ করেন গৌরকিশোর ঘোষ, সুবীর রায় চৌধুরী, সাগরময় ঘোষ, নবনীতা দেবসেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুভাস মুখোপাধ্যায়, নিরঞ্জন হালদার প্রমুখের। পড়ছেন তাঁদের সদ্যপ্রকাশিত লেখা, যাচ্ছেন নন্দনে শম্ভু মিত্রের নাটক দেখতে, সত্যজিৎ-মৃণাল সেনের ছবি মুক্তি পাওয়া মাত্র দেখার সুযোগ মিলছে।
দেশে ফেরার পর অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত সময়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি পরিবারকে সময় দিয়েছেন প্রচুর। এর মধ্যে তিনবার তিন-মাস করে শান্তিনিকেতন ও কলকাতায় ফলপ্রসূ গবেষণা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ পত্রসহ বিভিন্ন লেখকের অপ্রকাশিত চিঠির সংকলন সমাদৃত হয়।
চাচা-ফুপুদের মতো আমার মামা-খালারাও তাঁর স্নেহের স্বাদ পেয়েছেন একইভাবে। সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন বিভিন্নজনকে সাহায্য করার। আমার নানুর সঙ্গে অসাধারণ পারস্পরিক প্রীতির সম্পর্ক দেখেছি কাছ থেকে। বাবা হাসপাতালে যাবার আগের দিন পর্যন্ত টেবিলে খাবার পরিবেশন করেছেন, নিজ হাতে প্রায়ই বাড়ির সবাইকে চা বানিয়ে খাওয়াতেন। অবসর গ্রহণের পর যে অবসাদের আশঙ্কা করে মানুষ, তার সম্পূর্ণ বিপরীতে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন তিনি। সুপ্রভাত বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে তরুণ লেখকদের সঙ্গ উপভোগ করেন অকুণ্ঠচিত্তে। বাতিঘর থেকে নতুন বই, দেশ এবং কালি ও কলমের প্রতিটি সংখ্যা সংগ্রহ করতেন অমলিন উৎসাহে। স্মৃতিকথা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বইগুলোতে আমারও আগ্রহ থাকায় সুযোগ হতো পাঠ-অভিজ্ঞতা বিনিময়ের।
২৫ জুন ২০২১ কালের খেয়া সাময়িকীতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে জীবনকে উপভোগের কথা জানিয়েছেন স-সন্তোষে। বলেছেন, নাতনিকে (আমার কন্যা ১১ বছরের অবন্তী বহ্নিশিখা ইকবাল) নিয়ে আনন্দময় অবসরের কথা। একই সাক্ষাৎকারে তিনি গুণী পূর্বসূরি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, জসীম উদ্‌দীন, আবু সাঈদ চৌধুরীর সংস্পর্শ ও প্রভাব কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন।
বাবা-মার অত্যন্ত প্রিয় শহর ছিলো কোলকাতা, যেখানে তাঁরা পিএইচডি করেছেন ও ভ্রমণ করেছেন বহুবার। আশির দশকে তিনবার আমি তাঁদের সঙ্গে কোলকাতা যাই। তখনকার উল্লেখযোগ্য স্মৃতি ছিলো বাবার সঙ্গে প্রিয় লেখকদের বাসায় গিয়ে দেখা করা ও অটোগ্রাফ সংগ্রহ।
বাবার সঙ্গে ছোটবেলার একটি স্মৃতি হচ্ছে তিনি আমাকে গল্পের বই পড়ে শোনাতেন। উপেন্দ্রকিশোরের ছোট্ট রামায়ণ পুরোটা পড়ে শুনিয়েছিলেন। সেই আকর্ষণের ধারাবাহিকতায় উপেন্দ্রকিশোরের রচনাসমগ্র পড়া হয়। ফলে পরবর্তীকালে পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক সাহিত্য বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের নাট্যকাব্যগুলোর (গান্ধারীর আবেদন, বিদায় অভিশাপ, কর্ণকুন্তীসংবাদ) রস উপভোগ করা সম্ভব হয়। আমরা দুই ভাই যাতে ছোটবেলা থেকে উন্নত সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হই, সবসময় সেদিকে খেয়াল রাখতেন।
বাবা-মা কোলকাতায় পিএইচডি করার সময় আমি ছিলাম বরিশালে নানুবাড়িতে। কয়েক মাস পর-পর আসার সময় বই নিয়ে আসতেন, যার অনেকগুলোতেই লেখকের আশীর্বাদসহ স্বাক্ষর থাকত। দেশেও তাঁর লেখকবন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেয়েছি বহু শিশুপাঠ্য বই। ছোটবেলায় তাই একরকম ধারণা হয়েছিল লেখকরা সবাই আমার চাচা। একদিন পিকাসোর ছবি রং করার একটি বই পেয়ে তাই মা-কে জিজ্ঞেস করি, পিকাসো কি আমার চাচা? এই গল্পটি তাঁরা তখন প্রায়ই বন্ধুদের কাছে করতেন।
২০১৩ সালে পিএইচডি শেষে সপরিবারে দেশে ফেরার পর দাদা-নাতনির (আমার বাবা ও কন্যার) গভীর সখ্য দেখার অভিজ্ঞতা আমার এক পরম প্রাপ্তি। করোনার নিষ্ঠুর অতর্কিত আক্রমণ থেকে রক্ষা পেলে আরো কিছুদিন উপভোগ করতে পারতেন অভিযোগহীন, তৃপ্ত জীবন। এ অপ্রাপ্তির বেদনা আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। গত এক বছরের ঢাকার করোনা-নিয়ন্ত্রিত জীবনে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে গিয়ে অনেক বার নিজেকে নিবৃত্ত করতে হয়েছে বাবার সাথে দেখা করতে যাবার ইচ্ছে থেকে- সেই অতৃপ্তি কীভাবে ভুলি?