মহিরুহ সাংবাদিক ও অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম ১৯১০ সালের ২ আগস্ট ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার দক্ষিণ ধর্মপুর গ্রামে ঐতিহ্যবাহী মুন্সিবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন এবং প্রথম স্থান অধিকার করেন। ফেনী কলেজে ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে আবদুস সালামের কর্মজীবন শুরু। পরে শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। বাঙালি কর্মকর্তাদের নিপীড়নের প্রতিবাদে ১৯৪৯ সালে সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি পাকিস্তান অবজারভারে যোগ দেন। ১৯৫০ সালের ৩ জুন পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় পত্রিকাটি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ১৯৫২ সালে মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মুসলিম লীগ সরকারের গণবিরোধী ভূমিকার সমালোচনা করায় তাকে কারাবরণ করতে হয় এবং পাকিস্তান অবজারভারের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশিত হয়, আবদুস সালামই এর সম্পাদক থেকে যান। একই বছর যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

সম্পাদক হিসেবে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয়। ফলে তিনি পাকিস্তান সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করতে তৎকালীন সরকার প্রেস অ্যাক্ট চালু করলে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এ ধরনের ক্রান্তিকালে সম্পাদকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা তিনি তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন। তিনি তখন সাংবাদিকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে প্রতিবাদ মিছিলে শরিক হন। আবদুস সালামের সাহসী লেখনী স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে তার শক্তিধর কলাম।

আবদুস সালাম ছিলেন অত্যন্ত নির্ভীক। তিনিই প্রথম পাকিস্তানের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান রচিত গ্রন্থ 'ফ্রেন্ডস নট মাস্টারস'-এ বাঙালিদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্যের সমালোচনা ও নিন্দা করেন। সম্পাদক হিসেবে ব্যস্ত জীবনযাপনের মধ্যেও তার জ্ঞানচর্চায় কখনও ছেদ পড়েনি। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে তার অগাধ জ্ঞান ছিল। তিনি ছিলেন সত্যিকার গ্রন্থকীট। উল্লেখযোগ্য ও স্মরণীয় বহু সম্পাদকীয় ছাড়াও অবজারভারের পাতায় প্রকাশিত হতো তার কলাম 'আইডল থটস'। এই কলামটি থেকে তার জ্ঞানচর্চার বহুমুখী পরিচয় মেলে।

তার পরামর্শে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনিই প্রেস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক নিযুক্ত হন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ওই বছরই সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একুশে পদক পান। ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আবদুস সালামের ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে জীবনের শেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ১৯৫২ সালে যে সম্পাদকীয়র জন্য পাকিস্তান অবজারভার বন্ধ হয়ে যায় এবং আবদুস সালামের জেল হয়, সেখানে ভয়ংকর কিছু ছিল না। কিন্তু তিনি কখনও বিচলিত হননি। স্বাধীন বাংলাদেশেও সম্পাদকীয় লেখার জন্য আবদুস সালামকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এটি আমাদের ইতিহাসের কলংকিত অধ্যায়।

অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম ছিলেন সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। তিনি শুধু সাংবাদিক নন, সাংবাদিকতার শিক্ষক ছিলেন। সত্যিকার অর্থে আবদুস সালাম ছিলেন একজন 'ইন্টেলেকচুয়াল লিডার'। সম্পাদক যে একজন কলম-পেষা চাকরিজীবী নন, এ কথা তিনি বিভিন্ন ঘটনায় প্রমাণ করে গেছেন। যেখানে অন্যায় অবিচার দেখেছেন, সেখানে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। তিনি ছিলেন অকুতোভয়। সমসাময়িক ঘটনা সম্পর্কে তার ছিল প্রগাঢ় সচেতনতা। দেশ ও সমাজের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন সংগ্রামী। ১৯৮৪ সালে আবদুস সালামের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধে এ মূল্যায়ন করেছিলেন দৈনিক আজাদের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক মুজিবুর রহমান খাঁ।

কিংবদন্তিতুল্য সাংবাদিক আবদুস সালাম ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের পরোয়া না করে সত্যের পথে অবিচল ছিলেন আমৃত্যু। বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিকরা তাকে অনুসরণ করলে ধুঁকতে থাকা গণমাধ্যমে আবার সুদিন ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়। আজ জন্মদিনে তাকে আমরা বিশেষভাবে স্মরণ করছি।

সাধারণ সম্পাদক, সাংবাদিক আবদুস সালাম স্মৃতি সংসদ