সময়টি আসলেই খারাপ। বড়ই অস্থির। হতাশাজনক। এক অদৃশ্য শত্রুর আক্রমণে সারা বিশ্বই যেন টালমাটাল। ধনী দেশগুলো অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিমত্তায় তাদের বেশিরভাগ মানুষকে টিকা দিতে সক্ষম হয়েছে। সে কারণে তাদের অর্থনীতি ফের খোলা সম্ভব হচ্ছে। তবে সেসব দেশেও অর্থনৈতিক বৈষম্য বেশ বেড়েছে। সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির সুফলের বেশিরভাগ বড় উদ্যোক্তাই হাতিয়ে নিয়েছেন। আমাদের দেশেও প্রায় একই চিত্র লক্ষ্য করছি। সে কারণে সামাজিক পিরামিডের নিচের তলায় কর্মহীনতা ও দারিদ্র্য দুই-ই বেড়েছে। এমন কঠিন বাস্তবতায় আমাদের সমাজের মঙ্গলময় বৈশিষ্ট্যের পুনরুদ্ধার যেমন জরুরি, তেমনি বর্তমানে সমাজের অকল্যাণকর দিকগুলো ঝেঁটিয়ে বিদায়েরও এখন উপযুক্ত সময়। তাই আমাদের সমাজকে সচল করে নিজেদের দিকে তাকানোর প্রয়োজন খুব বেশি। 
রবীন্দ্রনাথও বিশ্বসংকটকালে নিজেদের দিকে বেশি করে তাকাতে বলেছেন। 'কালান্তর' পর্বের 'বাতায়নিকের পত্র'-এ তিনি এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট করে আত্মশক্তির উদ্বোধনের কথা বলেছেন। তিনি মনে করতেন, "জাহাজের খোলের ভিতরটায় যখন জল বোঝাই হয়েছে তখনই জাহাজের বাইরেকার জলের মার সাংঘাতিক হয়ে ওঠে। ভিতরকার জলটা তেমন দৃশ্যমান নয়, তার চালচলন তেমন প্রচণ্ড নয়, সে মারে ভাবের দ্বারা, আঘাতের দ্বারা নয়, এই জন্যে বাইরের ঢেউয়ের চড়-চাপড়ের উপরেই দোষারোপ করে তৃপ্তি লাভ করা যেতে পারে; কিন্তু হয় মরতে হবে নয় একদিন এই সুবুদ্ধি মাথায় আসবে যে আসল মরণ ঐ ভেতরকার জলের মধ্যে, ওটাকে যত শীঘ্রই পারা যায় সেচে ফেলতে হবে। কাজটা যদি দুঃসাধ্যও হয় তবু এ কথা মনে রাখতে চাই যে, সমুদ্র সেচে ফেলা সহজ নয়, তার চেয়ে সহজ, খোলের জল সেচে ফেলা। এ কথা মনে রাখতে হবে, বাইরের বাধাবিঘ্ন বিরুদ্ধতা চিরদিনই থাকবে, থাকলে ভালো বৈ মন্দ নয়; কিন্তু অন্তরে বাধা থাকলেই বাইরের বাধা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এই জন্যে ভিক্ষার দিকে না তাকিয়ে সাধনার দিকে তাকাতে হবে, তাতে অপমানও যাবে, ফলও পাবে।" ('লোকহিত', রবীন্দ্ররচনাবলি, দ্বাদশ খণ্ড, জয় বুকস লি., ১৪০৬, পৃ. ৫৮৩) কী করে সম্ভব সেই সাধনার ক্ষেত্রকে বিকশিত করা? রবীন্দ্রনাথের মতে বিচ্ছিন্ন মানুষকে দিয়ে এ সাধনা সম্ভব নয়। এ সাধনার মূলকথা হচ্ছে- মানুষে মানুষে যোগ চাই। সেই যোগের রাস্তা তৈরি করতে পারে শিক্ষা। সে শিক্ষা কিন্তু উচ্চশিক্ষা নয়। প্রথমেই চাই, "কেবল লিখিতে পড়িতে শেখা। তাহা কিছু লাভ নহে তাহা কেবলমাত্র রাস্তা- সেও পাড়াগাঁয়ের মেঠো রাস্তা। আপাতত এই যথেষ্ট, কেননা এই রাস্তাটা না হইলেই মানুষ আপনার কোণে আপনি বন্ধ হইয়া থাকে।" ('লোকহিত', রবীন্দ্ররচনাবলি, দ্বাদশ খণ্ড, জয় বুকস লি., ১৪০৬, পৃ. ৫৫২) 
এই গোড়াকার কথাটা আমাদের জাতির পিতা ঠিকই মনে রেখেছিলেন। তাই সদ্য স্বাধীন দেশে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে সারাদেশের গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তা জাতীয়করণ করেছিলেন। শিক্ষা কমিশন করেছিলেন। কেননা তিনি জানতেন আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের গোড়াপত্তন ওই শিক্ষায়তনগুলোতেই হতে যাচ্ছিল। তাই প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মোট সরকারি বিনিয়োগের ৭.১ শতাংশ শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করেছিলেন। আর ২৪ শতাংশ বিনিয়োগ বরাদ্দ রেখেছিলেন কৃষি খাতে। কৃষির উন্নয়নের জন্যও তিনি আধুনিক কৃষি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এমন করে রবীন্দ্রনাথও ভাবতেন। তিনি কৃষক ও প্রজাদের দুঃখ মোচনে তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্য অসংখ্য বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। পাশাপাশি কৃষির আধুনিকায়ন ও সংস্কারেও মনোযোগী হয়েছিলেন। খাদ্য ও শিক্ষা- দুই শ্রেষ্ঠ বাঙালির দৃষ্টিতেই মৌলিক অধিকারের অন্যতম বলে বিবেচিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "... যে-জাতি উন্নতির পথে বেড়ে চলেছে তার একটা লক্ষণ এই যে, ক্রমশই সে জাতির প্রত্যেক বিভাগের এবং প্রত্যেক ব্যক্তির অকিঞ্চিতকরতা চলে যাচ্ছে। ... সেখানে মানুষ ভাবছে কি করলে সেখানকার প্রত্যেকেই ভদ্র বাসায় বাস করতে, ভদ্রোচিত শিক্ষা পাবে, ভালো খাবে, ভালো পরবে, রোগের হাত থেকে বাঁচতে এবং যথেষ্ট অবকাশ ও স্বাতন্ত্র্য লাভ করবে।" ('বাতায়নিকের পত্র', প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮১) সেই বিচারে উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মনের পরিবর্তনের বিষয়। 

রবীন্দ্রনাথ মানুষের মৌলিক অধিকারকে উন্নয়নের ছাঁচে ফেলতে যেমন চেষ্টা করেছেন, বঙ্গবন্ধুও ঠিক তেমনটিই করেছেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানের মৌলনীতিগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায় মানবাধিকারের মূলনীতিগুলো কেমন করে সংবিধানের মৌল ভিত্তিতে স্থান করে দিয়েছে। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, বস্ত্র ছাড়াও আমাদের সংবিধানে সাম্যের কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রের বিরাট বৈষম্য দানা বেঁধেছে। চলমান করোনা সংকট এই বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে চলেছে। বিশেষ করে 'দিন আনি দিন খাই' বাস্তবতায় যাদের বাস তাদের সন্তানদের ডিজিটাল মাধ্যমে শিক্ষালাভের সুযোগ কতটাইবা দিতে পারে। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের ডিজিটাল বিভাজন গড়ে উঠছে। করোনাকালে আমাদের শিক্ষার যে ক্ষতি হয়ে গেল তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তা সত্ত্বেও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে আমাদের গ্রহণ করতেই হবে। শিক্ষাতে বৈষম্য সৃষ্টি করলেও এই দুঃসময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সার্বিক অর্থে অর্থনীতিকে যথেষ্ট শক্তি জুগিয়েছে। এই প্রযুক্তির কল্যাণে মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের প্রসার ঘটতে পেরেছে। আর এই বিপর্যস্ত সময়ে আর্থিক লেনদেন সহজ ও চনমনে হওয়ার কারণে বিদেশ ও শহর থেকে গ্রামে দ্রুত অর্থ প্রবাহ ঘটেছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ চাঙ্গা হতে পেরেছে।
রবীন্দ্রনাথ কখনও প্রযুক্তির বিপক্ষে ছিলেন না। এমনকি কৃষিতে আধুনিক চাষের জন্য কলের লাঙল, উন্নত বীজ, কৃষিঋণ, বিদেশি জ্ঞানের সম্প্রসারণে তিনি তৎপর ছিলেন। কতিপয়ের জন্য নয়, সবার জন্য বিজলি বাতি সরবরাহের পক্ষে ছিলেন। তার সেই আকাঙ্ক্ষার অনেকটাই আজকের বাংলাদেশে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। গ্রামে আধুনিক ফসল, গাভি, মুরগি, সবজি, ফল-ফুলের চাষ হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের চাওয়া মতো কৃষির উন্নতি আজ আর শুধু কৃষকের কাজ নয়। বিজ্ঞানী ও বিদ্বানও তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কৃষি গবেষণা, ব্যক্তিগত বিনিয়োগ, উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের আধুনিক কৃষি-খামার গড়ার উৎসাহ এখন বেশ প্রবল। ঠিক যেমনটি রবীন্দ্রনাথ তার পুত্র রথীন্দ্রনাথের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুকন্যাও আধুনিক কৃষির জন্য বাড়তি সরকারি বিনিয়োগে উদারহস্ত। আজ বিশ্বকে যে সংকট জাপটে ধরেছে, তার পেছনে আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং অবারিত লোভ কম দায়ী নয়। একইভাবে বিশ্বের এবং বাংলাদেশের ধনী মানুষগুলোর অতি-লাভের প্রবণতাকেও বাগে আনা সম্ভব হয়নি। তাই কোনো দেশ প্রায় শতভাগ টিকা দিয়ে ফেলেছে, আবার কোনো দেশ ৩-৪ শতাংশ মানুষকেও টিকা দিতে পারেনি। 
এর ফলে আমাদের সমাজের সন্ধিগুলো শিথিল হয়ে যাচ্ছে। মানুষ যে মানুষের জন্য- তা যেন আমরা ভুলেই বসে আছি। তাই একজনের বিপদে আরেকজন, এক দেশের বিপদে আরেক দেশ, সে কথা জোর গলায় বলতে পারছি না। রবীন্দ্রনাথ এমন মানুষ বা বিশ্ব চাননি। তার জীবনের একেবারে শেষ দিকে এসে লেখা 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধেও তিনি লিখেছেন মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। আমরাও তার চোখ দিয়েই এ বিশ্বকে দেখতে চাই। গতিময় অথচ মানবিক এক বিশ্বকে দেখতে চাই। একইভাবে আমাদের জাতির পিতার চোখ দিয়ে দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচনের দৃশ্যটি দেখতে চাই। ভেতর-বাইরের এই দৃষ্টিভঙ্গির সংশ্নেষেই গড়ে উঠবে নয়া পৃথিবী, নয়া স্বদেশ- সেই কামনাই করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে হলে আমাদের প্রথমেই একটি সত্য উপলব্ধি করতে হবে, সংকটময় এই পৃথিবীর একটি সমস্যা আরেকটি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই তো জলবায়ু সংকট পুরো পৃথিবীকে একসঙ্গে ভাবায়। একসঙ্গে তাকে মোকাবিলার প্রয়োজন হয়। বিশ্বজুড়ে অন্যায্যতা ও বিচ্ছিন্নতা যখন দানা বেঁধে উঠছে, তখন জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়েও তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। জলবায়ুর সংকট মোকাবিলায় তাই ধনী দেশগুলোর প্যারিস চুক্তি পরিপালনে অর্থ ঢালতে হবে। নভেম্বর মাসে ব্রিটেনের গ্লাসগোতে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন বসবে। সেখানে যে উন্নত দেশগুলো দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর টিকে থাকার সংগ্রামের সাথী হয়, সে দাবি সারা বিশ্বের নাগরিক সমাজেরই করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে নিশ্চয় তা করতেন। কেননা তিনিই তো বলেছিলেন, 'প্রকৃতির দান ও মানুষের জ্ঞান মিলে সভ্যতা।' 
ভালো লাগছে, বেশ কয়েকটি নাগরিক গোষ্ঠী এরই মধ্যে ধনী দেশগুলো যাতে তাদের দেয় অর্থ ছাড় করতে সক্রিয় হয়, সে দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। সুইডেনের কিশোরী গ্রেটার সঙ্গে সারা বিশ্বের স্কুল ছাত্রছাত্রীরা জলবায়ু সৈনিক হিসেবে নিয়মিতভাবে শুক্রবার করে আন্দোলন করছে। এমন ইতিবাচক সাংগঠনিক শক্তিই আমাদের সমাজের ভেতরের আবর্জনাগুলো দূর করে বিশ্বের মঙ্গলকামী শক্তির উত্থান ঘটবে বলে বিশ্বাস করি। বিশ্বসংকটের এই ক্রান্তিকালে আমাদের রবীন্দ্রভাবনায় আরও গভীরভাবে অবগাহন করতে হবে। অস্থির এই সময়ে তাই রবীন্দ্রনাথ যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। তিনি ছিলেন সাধারণের প্রতিনিধি। তাই সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে বলতে পেরেছিলেন, 'মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক / আমি তোমাদেরই লোক / এই হোক শেষ পরিচয়।'
এই রবীন্দ্রনাথকে সংকটসংকুল এই বিশ্বে খুব বেশি করে মনে পড়ছে। আমাদের অজেয় প্রাণশক্তির উৎস বিশ্বকবির প্রতি জানাই অশেষ শ্রদ্ধা।
অর্থনীতিবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবংবাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।
ফৎধঃরঁৎ@এসধরষ.পড়স