অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের ওপর করোনা দুর্যোগের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই যে আরও বেশি পড়েছে- বৃহস্পতিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট। দেশে ফের করোনার উচ্চ সংক্রমণের কারণে অন্যান্য রোগের চিকিৎসার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব সংকট আরও প্রকট করে তুলেছে। দেশের অনেক হাসপাতাল করোনা ও ডেঙ্গুর চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড করায় অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের চিকিৎসার সুযোগ যেভাবে কমে গেছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আমরা জানি, অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের থাকতে হয় নিয়মিত চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতায়। তেমনি সন্তান জন্মদানের পরও মা-শিশুর নিয়মিত চিকিৎসা-পরিচর্যা জরুরি।

করোনা সংক্রমণের ভয়ে যেমন সঠিক সময়ে অনেকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে থাকছেন, তেমনি আবার অনেকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য হাসপাতালে গিয়েও হচ্ছেন করোনা আক্রান্ত। তাতে কারও কারও গর্ভের সন্তান নষ্ট হচ্ছে, আবার নির্ধারিত সময়ের আগেই কেউ কেউ সন্তানও জন্ম দিচ্ছেন। সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুও হচ্ছে অনেকেরই। এর ফলে দেখা দিয়েছে পারিবারিক বিপর্যয় এবং মাতৃস্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে ভয়াবহ সংকট। মঙ্গলবার সমকালের ভিন্ন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই গর্ভে সন্তান নিয়ে করোনা আক্রান্ত ১২ মা প্রাণ হারিয়েছেন। এটা খণ্ডিত চিত্র।

সারাদেশের পরিস্থিতি কতটা নাজুক এ থেকেই তা সহজে প্রতীয়মান হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে হাসপাতালে অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের চিকিৎসার সুযোগ কমে আসায় বাসাবাড়িতে অনেকেই প্রচলিত পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দিয়ে কিংবা অনুন্নত চিকিৎসা নিয়ে পড়ছেন নানামুখী শারীরিক-মানসিক জটিলতায়। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসে বাংলাদেশ যে সাফল্য অর্জন করেছিল, করোনা-দুর্যোগে তা ম্লান হয়ে যেতে পারে। আমরা মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ তাদের চিকিৎসায় বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে ব্যবস্থা সুচারু করা জরুরি।

এ জন্য প্রতিটি হাসপাতালে গাইনি ওয়ার্ডে শুধু তাদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ ইউনিট স্থাপন দরকার। যেসব অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতি করোনা আক্রান্ত, তাদের চিকিৎসার জন্য পৃথক ব্যবস্থাও নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের দ্রুত বিশেষ ব্যবস্থায় টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের টিকা গ্রহণের ফলে কোনো সমস্যা হয় না, উপরন্তু ঝুঁকি কমে। এমনকি যে মা শিশুকে দুধ খাওয়ান তিনি টিকা নিলে শিশুর সুরক্ষা অনেকটা নিশ্চিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশে অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের টিকা প্রয়োগ করে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। দেশের জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরাও এর পক্ষেই অভিমত ব্যক্ত করছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এরপরও কেন তাদের টিকার আওতায় আনতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে? জাতীয় টিকা পরামর্শক কমিটির প্রসূতিবিদ্যার বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের করোনা সংক্রমণ এবং এর ফলে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি অনেক বেশি। রয়েছে মৃত্যুঝুঁকিও। তাই তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকার আওতায় আনা জরুরি। আমরা মনে করি, অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিদের জন্য পরিবার, হাসপাতাল সব জায়গায়ই বিশেষ সুরক্ষাবলয় তৈরি করাও সমভাবেই জরুরি।

আমরা জানি, অন্তঃসত্ত্বা কিংবা প্রসূতি ও নবজাতকের সেবা অত্যন্ত সংবেদনশীল। সময়মতো এই সেবা নিশ্চিত করা না গেলে সবারই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকট হয়। করোনা মহামারি মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যে সংকট সৃষ্টি করেছে এ থেকে উত্তরণে আশু করণীয় সবকিছু নিশ্চিত করতেই হবে। আমাদের লক্ষ্য, ২০৩০-এর মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু রোগাক্রান্ত ও ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতের করোনাকালে আরও যে বিবর্ণতা ফুটে উঠেছে, তাও আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। মাতৃস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এই দুর্যোগকালে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। প্রত্যেককে জীবন সুরক্ষাকারী কর্মসূচির আওতায় আনতেই হবে। কোথায় কী সীমাবদ্ধতা আছে, তা চিহ্নিত করে সেসব সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে কালক্ষেপণ না করে।