পৃথিবীতে বহু রাষ্ট্রনেতা ও বিশ্বনেতা নিহত হয়েছেন; তাতে সন্দেহ নেই। আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং থেকে ইন্দিরা গান্ধী- রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শেষ নেই। কিন্তু নির্মমতা, নৃশংসতা, ব্যাপকতা, নীচতা, ঘৃণ্যতা, বীভৎসতা, পৈশাচিকতার দিক থেকে পৃথিবীর সর্বকালের সব হত্যাকাণ্ড বহুগুণ ছাপিয়ে গেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বিপথগামী সেনা সদস্যরা বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ নির্মূল করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করতে গিয়ে যে চরম ক্রূরতা, কুটিলতা, নীচতা, বিশ্বাসঘাতকতা, দেশদ্রোহের পরিচয় দিয়েছে, তার প্রতিতুলনা বাংলাদেশে বা বিশ্বে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে নিহতের তালিকায় অন্তঃসত্ত্বা বা নববিবাহিত তরুণী অথবা দুগ্ধপোষ্য শিশুরা ছিল না, যেমন ছিল পঁচাত্তরের আগস্ট হত্যাকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে প্রায় একই সময় ঘাতকরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ঢাকার অন্যত্র তার ভগ্নিপতি ও মন্ত্রিসভার সদস্য সেরনিয়াবাত, তার ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির বাসভবনে হামলা চালায়। এতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও নিহত হন 'বঙ্গমাতা' বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব রেণু, তাদের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল, তৃতীয় পুত্র তথা সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেল (১০), জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল খুকি, দ্বিতীয় পুত্রবধূ পারভীন জামাল রোজী, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তার মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুর রব সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর অতি স্নেহের পুত্রতুল্য ভাগ্নে ও আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনি, শেখ মনির সন্তানসম্ভবা স্ত্রী বেগম আরজু মনি, সেরনিয়াবাতের কিশোরী কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত (১১), শিশুপৌত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু (৪), ভ্রাতুষ্পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত, আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর খালাতো ভাই আবদুল নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান এবং সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক।
জাতির পিতার পরিবারকে সমূলে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই হামলা চালিয়ে পামর ঘাতকরা এত নিরীহ মানুষকে নিধনের মাধ্যমে বিশ্বে তুলনারহিত নৃশংসতার নজির সৃষ্টি করে। সেই নৃশংসতার উদাহরণ হিসেবে কয়েকটা ঘটনার পুনরুল্লেখ করছি, যাতে জাতি এ ঘটনা 'ভুলে না যায়, বেদনা পায় শয়নে স্বপনে'।
বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল (জন্ম :১৮ অক্টোবর ১৯৬৪, ঢাকা) তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল। বাড়ির ছোট ছেলে হিসেবে ছিল সবার আদরের। মুক্তিযুদ্ধকালীন দীর্ঘ ৯ মাস পিতার অদর্শন তাকে এমনই ভাবপ্রবণ করে রাখে যে, পরে সবসময় পিতার কাছাকাছি থাকতে জেদ করত। ১৫ আগস্ট রাতে তাকে কাজের লোকজন পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নিয়ে যায়। কিন্তু ঘাতকরা তাকে দেখে ফেলে। বুলেটবিদ্ধ করার আগে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে অনুমতি নেওয়া হয়। রাসেল প্রথমে মায়ের কাছে যেতে চায়। মায়ের লাশ দেখার পর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মিনতি করেছিল- 'আমাকে হাসু আপার (শেখ হাসিনা) কাছে পাঠিয়ে দিন।' এর জবাবে ঘাতকদের একঝাঁক গুলি শিশুটির বুক ঝাঁজরা করে দেয় এবং সে ঢলে পড়ে তার মায়ের লাশের ওপর- 'জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি বিরাম।'

বঙ্গবন্ধু তার প্রথম ও দ্বিতীয় পুত্রকে বিয়ে করিয়েছিলেন পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির কিছুদিন আগে। জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল খুকু (জন্ম :১৯৫১, ঢাকা) ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী দবির উদ্দিন আহমেদের ছোট মেয়ে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স পাস করেন। ১৯৭৫ সালে এমএ পরীক্ষা দেন। স্কুল থেকেই আন্তঃক্রীড়ায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন বিভাগে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। লং জাম্পে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক ক্রীড়ায় চ্যাম্পিয়ন হন। মোহামেডান ক্লাবের পক্ষে ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান অলিম্পিকে লং জাম্পে দ্বিতীয়, ১৯৬৮ সালে ঢাকার মাঠে পাকিস্তান অলিম্পিকে লং জাম্পে ১৬ ফুট দূরত্ব অতিক্রমের রেকর্ডসহ স্বর্ণপদক পান। ১৯৭০ সালে নিখিল পাকিস্তান মহিলা অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় তিনি রেকর্ডসহ স্বর্ণপদক পান। ১৯৭৩ সালে লং জাম্পে স্বর্ণ পান। ১৯৭৪ সালে লং জাম্প ছাড়াও সুলতানা ১০০ মিটার হার্ডল্‌সে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দ্বিতীয় পুত্রবধূ পারভীন জামাল রোজী (জন্ম :১৯৫৬, সিলেট) ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন খাদেজা হোসেনের মেয়ে। তার বাবা সৈয়দ হোসেন বঙ্গবন্ধু সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। ধানমন্ডি গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে বদরুন্নেসা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। বেগম মুজিবকে হত্যা করে ঘাতকরা জামালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোজী ও সুলতানাকে একসঙ্গে গুলি ছুড়ে হত্যা করে। ওই বাড়িতে দুই বধূর শুভাগমন যেমন একসঙ্গে, তেমনি শোকাহত বিদায়ও ছিল একসঙ্গে- 'মেহেদির রংটুকু মুছে গেল সহসা।'
ঘাতকরা শেখ ফজলুল হক মনিকে হত্যার সময় তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মনিকেও রেহাই দেয়নি। সে রাতে যেন অলৌকিকভাবেই রক্ষা পেয়ে যান শেখ মনির বড় ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ এবং ছোট ছেলে শেখ ফজলে নূর তাপস। তখন পরশের বয়স ছিল ৫ বছর এবং তাপসের মাত্র ৩। আরজু মনি ছিলেন আবদুর রব সেরনিয়াবাতের জ্যেষ্ঠ কন্যা। বরিশাল সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও বিএ পাস করেন। ১৯৭০ সালে খালাতো ভাই শেখ ফজলুল হক মনির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পরীক্ষা দিয়েছিলেন; কিন্তু সাফল্যজনক ফল জানার আগেই তাকে জীবন থেকে করুণ বিদায় নিতে হয়।
এ রাতে ঘাতকদের গুলির শিকারদের মধ্যে ছিলেন আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ছোট মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত (জন্ম :২০ মে ১৯৬০, বরিশাল), ছোট ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত (জন্ম :২৭ মার্চ ১৯৬৪, বরিশাল)। ভাই-বোন বেবী ও আরিফ দু'জনেই ছিল যথাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে নবম ও চতুর্থ শ্রেণিপড়ূয়া। ঘাতকরা যখন সেরনিয়াবাতকে হত্যা করছিল, তখন এ দুই বালক-বালিকা শুধু পিতার পাশে থাকার কারণেই নিহত হন। সেরনিয়াবাতের বড় ছেলে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র বাবু নিহত হওয়ার সময় ছিল মাত্র ৪ বছরের শিশু। থাকত বাবা-মায়ের সঙ্গে বরিশালের গৌরনদীতে; কিন্তু সে সময়ে ঢাকায় দাদার বাসায় বেড়াতে এসেছিল। বাবুর বাবা তখন ঢাকার বাইরে থাকাতে প্রাণে বেঁচে যান।
বঙ্গবন্ধু তার সারাটা জীবন পরিবার-পরিজনকে এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বেদিমূলে উৎসর্গ করেছেন। 'বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা/এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা?' কখনও না! যতদিন এই দেশ ও জাতি টিকে থাকবে ধরণীর বুকে; এ মহান আত্মত্যাগের কাহিনি বর্ণিত হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
সাবেক উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া