নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধসহ সব অপরাধ দমন করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত মতবিনিময় সভার বক্তারা। 

তারা বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ প্রণয়ন করা হলেও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে অপরাধ দমনে বিস্তৃত ভূমিকা রাখছে না। আইনের অপপ্রয়োগই ‘মূল সমস্যা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার অনলাইনে আয়োজিত 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : নারীর মানবাধিকার' শীর্ষক এই সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ডাক টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, গাজী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা এবং আইন ও বিচার বিভাগের উপসচিব মাকসুদা পারভীন। সংগঠনের অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক জনা গোস্বামীর সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু।

সভায় বক্তারা বলেন, নারী-শিশু- নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সকল জনগণের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধে এবং মানবাধিকার রক্ষায় আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ অপপ্রয়োগ বন্ধের মাধ্যমে সংবিধানে প্রদত্ত বাক ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারের সুরক্ষা ও মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোস্তফা জব্বার বলেন, ‘বাংলাদেশকে ডিজিটাইজেশনের কথা বলা হলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিষয়ক কোনো আইন ২০১৮-এর আগে হয়নি। ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ দমনে এবং দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে আদেশের আগেই গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়ে আইন পাশ হয়। তবে এ আইন প্রণয়ন করা হলেও ২০২১ সালে এসে আইনটি অপরাধ দমনে বিস্তৃত ভূমিকা রাখছে না, এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।' 

ফেইবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা সাইটে সংঘাত- সহিংসতা, বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ চলছে বহু দিন ধরে। 

সেই প্রসঙ্গে ডাক,টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী বলেন, ‘অনলাইনে অপপ্রচার, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের জিম্মি অবস্থা দূর করতে ফেসবুক ও ইউটিউব সোশ্যাল মিডিয়া কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে আগের বিপন্ন অবস্থা থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। নিয়ম বহির্ভূত বিষয়গুলোর প্রচার বন্ধ করাও সম্ভব হয়েছে।  বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আইন থাকলেও এদেশে নেই।’

এসময় তিনি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আইনের সংশোধনে পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন।

নাছিমা বেগম বলেন, ‘নারীর প্রতি চলমান সাইবার অপরাধ, সাইবার বুলিং বন্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহারে কিছু টুল ব্যবহার করে এর সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’

শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘ডিজিটাল মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতামূলক, অশ্নীল, কদর্যমূলক বক্তব্য দেয়ার পরও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুসারে কাউকে গ্রেপ্তার করতে দেখা যায়নি।’ 

তিনি বলেন, ‘কেন এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কেন হল না? কেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এখনও নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ণ করা হয়নি? ফতোয়া বৈধ হয়ে আছে।’

সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক নানা ঘটনার কথা উল্লেখ করে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘মৌলবাদিতা, সাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং নারীবিদ্বেষী মনোভাব এখনও প্রশাসনের গভীরে আছে।’

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। যেকোনো ঘটনায় যদি নারী যুক্ত থাকেন, তাতে প্রত্যেকের নেতিবাচক মনোভাবের দৃঢ় উপস্থিত দেখা গেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে সবচেয়ে ভুক্তভোগী হলেন নারী। সবকিছু মিলিয়ে এই ৫০ বছরে মানবিকতার অবক্ষয়, নারীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব, উদারতার অবক্ষয় চরমভাবে ঘটেছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় নারীরা খুব কম পরিমাণে যাচ্ছেন, অনেকে সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, নিরাপত্তা বোধ করেন না।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নানা ধারা উপধারার উল্লেখ করে মাকসুদা পারভীন বলেন, ‘নারীর প্রতি সাইবার সহিংসতা দিন দিন বেড়ে গেছে।’

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক জরিপ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৫৩% নারী কোনো না কোনোভাবে সাইবার সহিংসতার শিকার। বাংলাদেশে মোট ৮টি সাইবার ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে, সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ করতে হবে।’