৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানিয়েছেন, ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে। ইতোমধ্যে টিকা গ্রহণকারীর বয়স কমিয়ে ১৮ বছরে নামানো হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বেশিরভাগই শিক্ষকই টিকা নিয়েছেন এবং ১২ বছর বয়সীদেরও টিকার আওতায় আনা হবে। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে করোনা মহামারিজনিত কারণে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বন্ধ না রেখেও যেমন উপায় ছিল না, তেমনি আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার বিকল্প এবং কার্যকর পথ খুঁজে বের করতে সরকার সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে শিক্ষার্থীরা সব পর্যায়েই সীমাহীন ক্ষতির শিকার হয়েছে। এ ক্ষতি এত সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

ভাবতেই খারাপ লাগে, দুটি বছর কোনো নতুন শিক্ষার্থী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পেরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং এভাবে তাদের জীবন থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ একেবারে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। যেসব শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হয়ে বাইরে আড্ডা মেরে সময় পার করেছে, তাদের অবস্থাও অনুরূপ। আবার যারা অনলাইন পরীক্ষা দিয়ে পরবর্তী ধাপে উন্নীত হয়েছে বাড়ি বসে তারা প্রায় সবাই বই খুলে পরীক্ষা দেওয়ার ফলে তাদের প্রকৃত ফল জানা যায়নি। প্রায় সবাই ভালো নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ে সম্ভব হতো না।

তবে স্বস্তির খবর হলো, ইতোমধ্যে করোনায় মৃত্যুর হার ও সংক্রমণের হার আনুপাতিক হিসাবে যথেষ্ট কমে এসেছে। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখাই শুধু নয়, তা ত্বরান্বিত বা দ্রুততর গতিসম্পন্ন করার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কেন সংক্রমণ, মৃত্যুর সংখ্যা ও হার কমে আসছে? না, এটা কোনো দৈব ঘটনা নয়। বিজ্ঞান এ কাজে শতভাগ সুযোগ করে দেওয়াতেই তা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা করোনার ভ্যাকসিন আবিস্কার করে তা উৎপাদন করে বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ায় এবং বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ডবল ডোজ ভ্যাকসিন প্রদানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যু ও সংক্রমণ কমে এসেছে। তাই এই প্রক্রিয়া শুধু অব্যাহত রাখাই নয়, তা আরও জোরদার করা দরকার। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, সরকারের হাতে এখন যথেষ্ট টিকা মজুদ আছে এবং ভারত, চীন ও অন্যান্য দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক ভ্যাকসিন আসবে শিগগিরই। গণহারে টিকাদান পুনরায় শুরু করার জোর প্রচেষ্টা দরকার। এ ক্ষেত্রে এমন করা যেতে পারে, গ্রামাঞ্চলে যখন কোনো ইউনিয়নে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে, তখন প্রতিদিন কয়েকটি এলাকা নির্দিষ্ট করে গ্রামের মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। এক সঙ্গে ইউনিয়নের সব গ্রামের মানুষ জড়ো হলে শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন এবং তা নিকট অতীতে যখন গণটিকা দেওয়া হচ্ছিল তখন দেখা গেছে।

শহরেও ওয়ার্ড ভিত্তিতে একই ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। নির্দিষ্ট দুটি করে ওয়ার্ডে টিকাদান করলে সেখানেও সুশৃঙ্খলভাবে টিকাদান সম্পন্ন হতে পারে। তবে দুটি শর্ত। এক. রেজিস্ট্রেশন অন দ্য স্পট ব্যবস্থা চালু করা দরকার; দুই. টিকাদানের বুথের সংখ্যা বাড়াতে হবে। শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েই যেন ভ্যাকসিন দেওয়া যায় এবং কম বয়সী যারা এখনও জাতীয় পরিচয়পত্র পায়নি, তাদের জন্য ভিন্ন কোনো সহজ ও গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার। সরকার টিকা গ্রহণকারীদের বয়সসীমা ১৮ করলেও টিকার আওতায় সবাইকে নিয়ে আসতে হবে। ১৮ বছর নির্ধারণ করায় এইচএসসি থেকে ওপরের স্তরের শিক্ষার্থীরা টিকা নিতে পারবে। সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে যে লাখ লাখ ছেলেমেয়ে শিক্ষাগ্রহণ করছে এবং যারা স্কুল খোলার পরে নতুন করে ভর্তি হবে বা পুরোনোরা ক্লাস করবে, তাদের তো টিকাদানের আওয়তায় আনা যাবে না। এমতাবস্থায় হাজার হাজার মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে স্তরভেদে সামান্যতম বৈষম্য একেবারে অনুচিত। শিশু-কিশোরদের দ্রুত শিক্ষাঙ্গনে ফিরিয়ে আনা এবং নতুনদের ভর্তির সুযোগ দ্রুত সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তা করতে হলে টিকা গ্রহণকারীর বয়সসীমা ছয় বছরে নামিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। তাতে টিকাদানের ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়লেও এই চাপ মোকাবিলা করে পূর্ণাঙ্গভাবে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। যেহেতু প্রায় সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই খুলছে, সেহেতু সব শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় আনা জরুরি। অবশ্যই কম বয়সীদের এ ব্যাপারে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

গণটিকা কার্যক্রম শুরু করতেই হবে। বিষয়টি আরও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে, একদিকে যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ এখনও বন্ধ রয়েছে, অন্যদিকে এর ফলে বেশকিছু সামাজিক সংকটেরও সৃষ্টি হয়েছে। যেমন লেখাপড়ার সুযোগ বন্ধ, তাই বহু অভিভাবক কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। ফলে বাল্যবিয়ে, অকাল মাতৃত্বজনিত সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের দিনরাত্রির বেশিরভাগ সময় নিজ নিজ বাড়িতে আবদ্ধ থাকার ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর পরিণতিতে আগামী ১০ বছরের মধ্যে একটা বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়তে হতে পারে। আবার অপ্রত্যক্ষ সংকটও সৃষ্টি হয়েছে। এটি অর্থনৈতিক। স্কুল-কলেজ তো শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নয়, গ্রামাঞ্চলেও অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের যানবাহন যথা- বাস, স্কুটার, রিকশা প্রভৃতিও যাত্রীর অভাবে দেড় বছর ধরে অর্থকষ্টে ভুগছিল, তারও অনেকটা সুরাহা হবে। তবে এও মনে রাখা জরুরি, শুধু টিকাদানই নয়, নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি রুম এবং আঙিনা জীবাণুমুক্ত করার জন্য স্প্রে, মাস্ক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে, অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনে ক্লাস পরিচালনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ
raneshmaitra@gmail.com