চলতি সপ্তাহে দেশে করোনা সংক্রমণের গতি কিছুটা শ্নথ। সংক্রমণের সংখ্যা তুলনামূলক কমতে থাকায় আপাত দৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও শঙ্কা কাটেনি। এ শঙ্কা কবে কাটবে, বলা মুশকিল। দ্বিতীয় ঢেউয়ের থাবায় এরই মধ্যে অর্থনীতি থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দরকার দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। সারাবিশ্ব এখন কৌশলগতভাবে ভ্যাকসিননির্ভর হচ্ছে। আমাদের দেশও সে পথে হাঁটছে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে, তৃতীয় ঢেউ আসার আগে বাংলাদেশের একটা পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।
কভিড মোকাবিলায় বর্তমানে বাংলাদেশের যৌক্তিক পদক্ষেপ কী কী হতে পারে, তা নিয়ে আমরা কিছু প্রস্তাবনা তুলে আনতে পারি, যার বাস্তবিক প্রয়োগ ভবিষ্যতে দারুণ ফল বয়ে আনতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশে ক্লাস্টার সংক্রমণের কোনো স্টাডি আমরা দেখতে পাইনি; তাই বলা মুশকিল, কত সংখ্যক মানুষ ক্লাস্টার সংক্রমণে কভিডে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংক্রমণের ধরন দেখে বোঝা যায়, সার্স-কভ-২ আক্রান্তদের একটি বড় অংশ ক্লাস্টার সংক্রমণের শিকার। সাধারণত বায়ু চলাচলে বাধা দেওয়া, জনসমাগম ও পারস্পরিক কথাবার্তা- এই তিন প্যারামিটারের সংমিশ্রণে ক্লাস্টার সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এ ক্ষেত্রে সার্স-কভ-২ রিপ্রোডাকশন নাম্বার যেমন বাড়বে, তেমনি দ্রুতগতিতে কমিউনিটি সংক্রমণ ছড়াবে। ক্লাস্টার সংক্রমণ এড়াতে যা করা যেতে পারে- দেশে সব ধরনের জনসমাগম যেমন মিছিল, সমাবেশ, সভা বন্ধ রাখা। শপিংমল, অফিস, ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দু-তিন মিটার দূরত্বের স্টিকারসংবলিত ফাঁকা স্থান তৈরি করা। জনসমাগম কমাতে এসব প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই অনলাইনে বুকিং দিয়ে ভোক্তাদের সেবা দেওয়া, যাতে সেসব জায়গায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের জমায়েত না হতে পারে। প্রতিটি দরজা-জানালা খোলা রাখা, যাতে সংশ্নিষ্ট ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। কারণ পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন থাকলে ভাইরাসের সংক্রমণশীল কণা ঘরের কোনো আসবাবপত্রে কোথাও লেগে থাকতে পারে না। পাশাপাশি কিংবা মুখোমুখি হয়ে রেস্তোরাঁয় খাওয়া, ভ্রমণ বন্ধ করা। নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।
সংক্রমিত ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণের ফলে কভিড সংক্রমণ অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে যারা আসছে, তাদের জানতে না পারলে সংক্রমণের ঢেউ চলতেই থাকবে। নিরবচ্ছিন্ন শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ বা সার্ভিলেন্স তথ্য একটি দক্ষ বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রযুক্তিগত অ্যাপ কিংবা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সিস্টেমের (এসএনএস) মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে তাদের আইসোলেশন করতে পারলে কভিড সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটি করতে যা করতে হবে- কিউআর কোড সংবলিত একটি অ্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে একজনের ব্যক্তিগত তথ্য যেমন থাকবে, তেমনি সেসব তথ্য নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে সরকার। সরকারকে এমন আদেশ জারি করতে হবে- বাস-ট্রেন, শপিংমল, অফিস-আদালতে কিউআর কোড রিডার স্থাপন করে ব্যক্তিদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলকভাবে এ অ্যাপের মাধ্যমে করতে হবে। এই অ্যাপে শরীরের তাপমাত্রার যেমন তথ্য থাকবে, তেমনি সে কোন এলাকায় ঘুরেছে, তা অনায়াসে জানা যাবে। আক্রান্তদের সঠিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এ অ্যাপের মাধ্যমে করা আবেদন কেন্দ্রীয়ভাবে নির্দেশনা স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে দেওয়া যেতে পারে। চিকিৎসকরাও ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবার তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে ডাটাবেজে জমা রাখবেন। অ্যাপটিকে এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে, যাতে সব শ্রেণির সুবিধা যেমন থাকবে, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও ব্যবহারের সুযোগ পাবে। ইন্টারনেট না থাকলেও যেন মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিনামূল্যে এ অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ পেলে মানুষ তা ব্যবহারে আগ্রহী হবে। যেটি অনেকটাই অল ইন ওয়ান অ্যাপ হবে।
কভিডে আক্রান্তদের চিহ্নিতকরণে বেশি প্রয়োজন শনাক্তকরণের হার বৃদ্ধি। সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করলে আক্রান্তদের শনাক্তকরণে সুবিধা হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা আরটিপিসিআর ছাড়াও সেরোলজিক্যাল টেস্টের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করছি। অ্যান্টিজেন কিংবা অ্যান্টিবডি দেখার জন্য র‌্যাপিড ডিটেকশন কিট ব্যবহার করতে পারি। ফলে কম খরচে বেশি মানুষের যেমন শনাক্তকরণ সম্ভব, তেমনি কমিউনিটি সংক্রমণ কিংবা আঞ্চলিক সংক্রমণের তথ্য পাওয়াও সহজ হবে।
গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান