বরিশাল জেলার মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী ইউনিয়ন উলানিয়াকে মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষার্থে একনেকে অনুমোদিত ৩৮৬ কোটি টাকার কাজ চলছে। দুই বছর ধরে চলে আসা কাজের মধ্যে রয়েছে নদীতীরে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে বাঁধ নির্মাণ। আশপাশের জলাশয় ভরাট ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ। এখন পর্যন্ত জলাশয় ভরাটের পাশাপাশি কংক্রিটের ব্লক দিয়ে বাঁধ নির্মাণের চিত্রই দৃশ্যমান। নদীভাঙন খুব স্বাভাবিক ঘটনা হলেও ২০০৩ সালে হঠাৎ মেঘনা আগ্রাসী রূপ নেয়। এতে মাত্র দুই বছরের মধ্যে উলানিয়ার সীমান্তঘেঁষা গোবিন্দপুর ইউনিয়নটি পুরোপুরি মেঘনায় বিলীন হয়ে যায়। যদিও বর্তমানে মেঘনার মাঝখানে একটি চর জেগেছে। সেটিকে ঘিরে বানানো হয়েছে ৯টি ওয়ার্ড। গড়ে তোলা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়। সেই চরে উলানিয়া থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে যেতে সময় লাগে ৩০-৪০ মিনিট। স্থানীয়দের ভিটামাটি হারানো চরকে ঘিরে পকেট ভারী করায় ব্যস্ত কয়েকটি চক্র। চরের ফসল, মাছ, দুধ-দইয়ে তাদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। আর জমির প্রকৃত মালিকরা নীরবে তাকিয়ে দেখছেন। গোবিন্দপুর ইউনিয়নটি পুরোপুরি বিলীন হওয়ার পর আতঙ্কিত উলানিয়া ইউনিয়নের লোকজন ভিটামাটি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়। তারা পকেটের টাকায় ভাঙনকবলিত নদীতীরে বালুভর্তি বস্তা ফেলে। ১০-২০ হাজার টাকা নয়; ৮০ লাখ টাকা খরচ করে তারা। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সিএস করিম সরকারি অর্থায়নে উলানিয়া খালের মুখে বাঁধ দিয়ে দেন। না হলে আরও বিপদ হতে পারত। এর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। জিও ব্যাগের ওপর কংক্রিটের ব্লক দিয়ে বাঁধ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বন্যা ও স্রোতে এসব ব্লক কোনো কোনো স্থানে ধসে পড়ে। ৩৮৬ কোটি টাকা একনেকে অনুমোদন হওয়ার পরও সে ব্লকই বসানো হচ্ছে। এসব ব্লকের মান নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ এগুলো বানানোর পর বসানোর আগেই ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। একটি ইউনিয়নকে রক্ষায় এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের নেপথ্য কারিগর উলানিয়ার সন্তান, 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি'- অমর এ গানের রচয়িতা, প্রখ্যাত সাংবাদিক-কলামিস্ট আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আসাদ চৌধুরী, স্থানীয় সংসদ সদস্য পংকজ নাথসহ অনেকে। ৩৮৬ কোটি টাকা! এতেই খুশি হয়েছিল উলানিয়াবাসী। কিন্তু বর্তমানে কাজের গতি-প্রকৃতিতে তারা অনেকটা হতাশ।

২০০৩ সালেও বিশাল বেড়িবাঁধ ছিল। কিন্তু মুহূর্তেই সে বাঁধ মেঘনায় হারিয়ে গিয়েছিল। নদীভাঙন রোধে চিরায়ত বাঁধ নির্মাণের কৌশল সংস্কারের সময় এসেছে কিনা, সেটিও ভেবে দেখা দরকার। ৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ সমকালে পানিসম্পদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত লিখেছেন, "বস্তুত আমরা গত ৫০ বছর ধরে যে গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় পানি ব্যবস্থাপনা করে আসছি, এর খোল-নলচে বদলাতে হবে। সরকার 'ডেলটা প্ল্যান' নামে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সেই পরিকল্পনায় যে নীতিমালার কথা উল্লেখ রয়েছে এবং সেই পরিকল্পনায় যে দিকনির্দেশনা আছে, তার ভিত্তিতেই এই কথাগুলো বলছি। জবাবদিহিহীন ও অংশীদারিত্বহীন কর্মকাণ্ড বন্ধের সময় এসেছে। স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে, তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এবং পুরো কাজটি জবাবদিহিতামূলক পদ্ধতিতে পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ লক্ষ্যে বহু কথা বলছেন, বহু দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন; কিন্তু গতানুগতিকতার চাপে কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে না।"

৫০-৬০ বছর আগে দেখেছি, কেবল নগর রক্ষায় নদী শাসনের কাজ কিংবা নদীর পাড় রক্ষার কাজ হাতে নেওয়া হতো। চাঁদপুর কিংবা সিরাজগঞ্জে যে টাকা খরচ হয়েছে, তাতে শহরগুলো অন্যত্র স্থানান্তর করা যেত। তবে, একটি শহর অন্যত্র স্থাপন করা সহজ হলেও শহরের ঐতিহ্য অন্য জায়গায় কিংবা অন্যত্র নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ১৯৮৭-৮৮ সালের বন্যার পরে নদী ভাঙছে কেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণকারী বাঁধ ধসে পড়ছে কেন- এ বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হয়। ১৯৮৯ সালে বন্যা ব্যবস্থাপনা নামক একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু আমরা সেই নীতিমালার কথা সম্ভবত ভুলে গেছি। পরিকল্পিতভাবে নদী শাসনে নদীভাঙন ঠেকানো সম্ভব, যদি উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এ জন্য যে খরচ হবে, এর যৌক্তিকতা নিরেট অর্থনীতির বিবেচনায় পূরণ হবে না।

সাংবাদিক
mizanshajahan@gmail.com