আশা করা হয়েছিল, আগামী অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ছয় লাখ টন হবে। ২০০৮ থেকে ২০১৯ অর্থবছরের সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিবছর ইলিশের উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় সাত দশমিক ১১ শতাংশ। মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। আমরা জানি, আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু এবার রুপালি ইলিশ জালে ধরা পড়ার ভর মৌসুমেও বাজারে তেমন ইলিশ মিলছে না। শুক্রবার সমকালের একটি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে ইলিশ বিপর্যয়ের কারণগুলো।

অতিরিক্ত আহরণ, জাটকা নিধন, নদীতে পলির আধিক্য, খটাজালের ফাঁদ, নাব্য হ্রাসের কারণে নদীতে স্রোতহীনতা, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণসহ ইত্যাদি নানা কারণে ইলিশের গতিপথ প্রতিকূল হওয়ার পাশাপাশি অনুকূল আবাসন ও পরিবেশের বৈরী পরিস্থিতি এর জন্য দায়ী। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইলিশ যেমন গতিপথ পাল্টাচ্ছে, তেমনি পরিবর্তন আসছে প্রজননের মৌসুমেও। আমরা জানি, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ ও জাটকা নিধন বন্ধে সরকার প্রতিবছর বিশেষ কর্মসূচি নিয়ে থাকে। উপকূলীয় অঞ্চলে ইলিশ আহরণ করে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের সরকার প্রণোদনা দিয়ে থাকে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ আছে, জেলেরা মাঠ পর্যায়ে সরকারের অসাধু দায়িত্বশীলদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হন এবং তারা তখন জীবিকার তাগিদে গোপনে ইলিশ আহরণ করেন। আমরা মনে করি, ইলিশ উৎপাদনে ভাটা পড়ার এও একটি কারণ। ইলিশ যে শুধু বাঙালির রসনা বিলাসেই শীর্ষে তাই নয়, ইলিশ রপ্তানির মাধ্যমে অর্জিত হয় বৈদেশিক মুদ্রাও। কিন্তু এবার ইলিশের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোতে আকাল চলছে। এমতাবস্থায় ইলিশ নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ-শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই লিখেছিলাম, ইলিশ রক্ষায় ব্যবস্থাপনা হতে হবে সার্বিক। ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ-২ প্রকল্পের দলনেতা অধ্যাপক আবদুল ওহাব সমকাল প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ সময়ে যদি নদীতে ইলিশ আসে, তবে বুঝতে হবে আগে তাদের আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে। যদি একদমই না আসে তাহলে এও বুঝতে হবে, ইলিশ বৃদ্ধির ক্ষেত্র বিপর্যয়ের মুখে। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ইলিশের প্রজনন সময় নির্ধারণ, বংশবৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি এবং সংরক্ষণ ইত্যাদি নিয়ে যারা গবেষণা করছেন, তাদের সহযোগিতায় সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ইলিশের বিপর্যয় রোধে করণীয় সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে বৃহৎ স্বার্থে। একই সঙ্গে ব্যাপকভাবে গবেষণা করে সম্মিলিতভাবে নতুন পরিকল্পনা নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। পদ্মা, মেঘনা এবং ভোলা, খুলনা, পটুয়াখালী, বরগুনাসহ দেশের অন্যান্য উপকূলীয় নদীতে সাগর থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ইলিশ না আসার অন্যতম কারণ নাব্য সংকট ও প্রবেশপথে বাধা। সাগরেও পানির তাপমাত্রায় হেরফের ঘটায় জেলেরা ইলিশের তেমন সন্ধান পাচ্ছেন না।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পরিবর্তন এসেছে ইলিশের জীবনচক্রেও। ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণে বিঘ্ন ঘটায় তারা বেছে নিচ্ছে গভীর সমুদ্র। নদীর নাব্য সংকট, দূষণ, প্রবেশপথে প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি দূর করার পাশাপাশি ইলিশের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে হবে। ইলিশের অভয়াশ্রমগুলোতে বাড়াতে হবে নজরদারি। গবেষকরা এও বলেছেন, ইলিশের প্রজননকালে নদীতে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালি উত্তোলনের কারণেও ইলিশের ডিম ও রেণু পোনার ক্ষতি হচ্ছে।

আমরা মনে করি, গবেষণায় উঠে আসা বিষয়গুলো আমলে নিয়ে পরিকল্পিত কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ জরুরি। ইলিশের উৎপাদন নিয়ে আমরা গর্বিত হলেও এর পাশাপাশি এখন দাঁড়িয়ে গেছে চ্যালেঞ্জও। বিদ্যমান কারণগুলো আমলে নিয়ে ইলিশ-সংক্রান্ত গবেষণা আরও বাড়ানো সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। একই সঙ্গে ইলিশ উৎপাদনে আমাদের অর্জন ধরে রাখতে হলে আবাসস্থল সংরক্ষণে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাবে আমাদের জাতীয় সম্পদ ইলিশের উৎপাদন যেন হুমকির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতেই হবে।