বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। বাংলাদেশের জন্য প্রকৃতি প্রদত্ত এক অমূল্য উপহার। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটকের ঢল নামে এ সৈকতে। সমুদ্রতীরের শীতল হাওয়ায় প্রশান্তি খুঁজতে, সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ে পা ভেজাতে, সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের গর্জন শুনতে কিংবা রাতের সমুদ্র দেখতে সৈকতে মুখর থাকেন পর্যটকরা। এ যেন প্রকৃতি আর সমুদ্রের সঙ্গে পর্যটকদের গভীর মিতালি। তাই তো কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বহুমাত্রিক সৌন্দর্য উপভোগে ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যান পর্যটকরা। দূর হয় জীবনের ক্লান্তি-ক্লেশ-দুর্ভাবনা।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে পরিচিত করে বিশেষ পরিচয়ে। তবে কিছুদিন পরপর সমুদ্রের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। সমুদ্রস্নানে নেমে চোরাবালিতে আটকে পড়ে, গুপ্ত খাদে পড়ে কিংবা ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে গিয়ে সলিল সমাধি ঘটছে অনেকের। এর মধ্যে কারও কারও মরদেহ ফেরত পাচ্ছেন স্বজনরা। আবার কারও কারও জন্য অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর গুনতে হচ্ছে। গত এক দশকে এ রকম শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এ সৈকতে।

সম্প্রতি কক্সবাজারে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে সমুদ্রে ডুবে। পুলিশের ভাষ্যমতে, বাকি দু'জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। সব মৃত্যুর ঘটনা খতিয়ে দেখতে তদন্ত করছে পুলিশ। অল্প সময়ের মধ্যে এত প্রাণহানি নিঃসন্দেহে পর্যটনপ্রেমীদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। উদ্বিগ্ন করে তুলেছে অভিভাবক মহল, পর্যটন উদ্যোক্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে কেন এত প্রাণহানি? আমরা জানি, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দৈর্ঘ্যে ১২০ কিলোমিটার হলেও এর মধ্যে বিচরণ করা যায় মাত্র ১৫ কিলোমিটার এলাকায়। সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, শৈবাল পয়েন্টের পাঁচ কিলোমিটার; হিমছড়ির দুই কিলোমিটার; ইনানীর দুই কিলোমিটার; টেকনাফের তিন কিলোমিটার ছাড়া বাকি এলাকা থাকে অরক্ষিত। সৈকতের সুগন্ধা, কলাতলী ও লাবণী পয়েন্টের তিন কিলোমিটার অংশে স্নানে নেমে কোনো পর্যটক ভেসে গেলে উদ্ধারের জন্য লাইফগার্ড সদস্যরা কাজ করেন। আর অরক্ষিত সৈকতে নেমে পর্যটকরা বিপদে পড়লে সাহায্য করার কেউ থাকে না।

এ ছাড়া পর্যটক অনেকের মধ্যেই বিরাজ করে অতিউৎসাহ। তারা লাইফগার্ড সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের দিকনির্দেশনা মানতে চান না। পর্যটন মৌসুমের বিশেষ দিনগুলোতে সৈকতে মাইকিং ও বিলবোর্ডে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালানো হয়। বিশেষ মুহূর্তে মাইকিং করে সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কিংবা নিষেধাজ্ঞার কথা জানানো হয়। অনেকেই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে নোনাজলে গা ভেজাতে নেমে পড়েন সাগরে। বৈরী আবহাওয়া এবং জোয়ার-ভাটার হিসাব না মেনে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে নেমে ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যান অনেকেই। সৈকতের বালুচরে সাঁটানো লাল পতাকা কিংবা লাইফগার্ড কর্মীদের বাঁশির আওয়াজ তারা আমলে নিতে চান না।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতসহ অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রে বেশিরভাগ পর্যটকই সাধারণত একা ভ্রমণ করতে যান না। পরিবার, সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিচিতজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে তারা ভ্রমণে বের হন। এ ক্ষেত্রে সবার সচেতনতা ও সতর্কতা খুবই জরুরি। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে পর্যটন এলাকা সম্বন্ধে খুব বেশি জানা থাকে না। কাজেই পর্যটনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট যেমন পর্যটন এলাকা, সেখানকার পরিবেশ, বিধিনিষেধ, হোটেল, পরিবহন, গাইড, এজেন্সি, নিরাপত্তাসহ সবকিছু সম্বন্ধে ধারণা থাকা দরকার। তার আগে যাদের সঙ্গে ভ্রমণে বের হচ্ছেন তাদের সম্বন্ধেও জানা দরকার। এ ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতা কিংবা অসচেতনতার কারণে পর্যটকের আনন্দ মৃত্যুর বিষাদে পরিণত হতে পারে। সবার সচেতনতাই পারে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করতে।

কক্সবাজার আমাদের পর্যটননগরী। সম্ভাবনাময় এ নগরীকে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই সঙ্গে কক্সবাজারে পর্যটন সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা জরুরি। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের সামান্য অংশে পর্যটন সুবিধা বিদ্যমান। পর্যটনের স্বার্থেই এর পরিসর বৃদ্ধি করা দরকার। সেখানে পর্যটকদের নিরাপত্তায় যে সংখ্যক জনবল নিয়োজিত, তা একেবারেই অপ্রতুল। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া বৃহৎ স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি।

সাংবাদিক
saifulksg@gmail.com