প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর কুড়িগ্রাম সফরকালে জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে 'কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন'-এর খসড়া প্রণয়ন করে ২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় চূড়ান্ত করা হয়। পরে আরও কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ২০২১ সালের ২৮ জুন শিক্ষামন্ত্রী বিলটি জাতীয় সংসদের ১৪তম অধিবেশনে উত্থাপন করেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের পঞ্চদশ অধিবেশনে 'কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়' বিলটি উত্থাপিত ও গৃহীত এবং ১৫ সেপ্টেম্বর আইনটি পাস হয়।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদে আরও ছয়টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলো হচ্ছে- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯৮), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (২০০১), সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৬), চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৬), খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৮) ও হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৯)। কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অষ্টম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলার কৃষি খাত সমৃদ্ধকরণে কুড়িগ্রামে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সত্যিই প্রশংসনীয়। কুড়িগ্রামের বাসিন্দা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

কুড়িগ্রাম পিছিয়ে পড়া জনপদগুলোর অন্যতম। দারিদ্র্যের হার ২০১৪ সালে ৬৩ দশমিক ৭ থেকে বেড়ে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশের ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশ সম্পদ, যা উন্নয়ন বৈষম্যের চিত্র। কুড়িগ্রামের পিছিয়ে পড়ার কারণগুলো মনে করা হয়- প্রাকৃতিক বন্যা ও নদীভাঙন, পূর্বের বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শাসনামলে কুড়িগ্রামের দিকে তেমন নজর না দেওয়া। সময় এসেছে ওই কারণগুলো সামনে রেখে, কুড়িগ্রাম জেলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের ধারায় সংযুক্ত করা। কুড়িগ্রাম জেলার জন্য শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, নদীভাঙন রোধ, বন্যানিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি কৃষি। দেশে কৃষিব্যবস্থার আধুনিকায়ন তথা বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন ও কৃষিবিজ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্বমানের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। খসড়া আইনে বলা হয়েছে, এ বিশ্ববিদ্যালয় কৃষিবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাদান এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রমের পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয় টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি ও উচ্চফলনশীল কৃষিজ দ্রব্যের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করবে। দেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকা রাখতে পারবে। এ বিশ্ববিদ্যালয় হবে বিশ্বমানের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের উদ্ভাবন ঘটানোর চেষ্টা করা হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকাবাসীর জন্য নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের এখানে আসার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে কুড়িগ্রামবাসীর উচ্চশিক্ষার জন্যও সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর্থিক সমস্যার কারণে যাদের মেধাবী সন্তানকে দূরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে অসুবিধা হয়, তাদের কষ্ট লাঘব হবে। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, কুড়িগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে বলে যে কেউ ভর্তি হতে পারবে না। যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরাই এখানে ভর্তি হলে দেশে কৃষিশিল্প আধুনিক ও বিশ্বমানের হবে- এ প্রত্যয় সবার।

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কুড়িগ্রাম জেলার কোন স্থানে হবে, সেটি আইনে উল্লেখ করা হয়নি। আধুনিক ও বিশ্বমানের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করার প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ মাথায় রেখে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা উচিত। স্থান নির্ধারণ হয়ে গেলে দক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি আধুনিক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে সে অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নান্দনিক ও নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান এবং প্রকল্পের গুণগত ব্যয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সুধীজনের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। তাদের পরামর্শ ও তদারকির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠবে এবং ভবিষ্যৎ চলার পথ মসৃণ হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হবে। সে লক্ষ্যে কৃষির বর্তমান অগ্রগতির ধারাকে আরও উন্নত এবং আধুনিক করার সহযোগী হবে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। উন্নত বিশ্বের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে।

শিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ এবং প্রশিক্ষণের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক, প্রশিক্ষক, টেকনিশিয়ান এবং সম্প্রসারণ কাজে যুক্ত সবাই যদি বিশ্ববিদ্যালয়টি ধারণ করার মানসিকতা নিয়ে তাদের স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করেন, তবেই বিশ্ববিদ্যালয়টি সফলতার মুখ দেখবে। শান্তিপূর্ণ সুষ্ঠু পরিবেশে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের ধারায় কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এক দিন আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ব এবং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সম্মানজনক স্থানে অধিষ্ঠিত হবে- এটি আমাদের সবার প্রত্যাশা।

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়