নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক ভেন্যু হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বর্তমানে বোঝার উপায় নেই, এটা স্টেডিয়াম না জলাশয়। বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, নকশার ত্রুটির কারণে ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় মাত্র ২১ বছরেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে স্টেডিয়ামটি। ছয় বছর ধরে অযত্ন-অবহেলায় এটি পরিত্যক্ত। দেশের তৃতীয় ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে পরিচিতি পাওয়া স্টেডিয়ামটির দুর্দশা দুঃখজনক। আমরা মনে করি, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবেই ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ এ ভেন্যুটি বেহাল। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি আর অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণের কারণেই স্টেডিয়ামটির এই হাল। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক মানের একটি স্টেডিয়াম তৈরিতে নির্মাণ ত্রুটি থাকে কীভাবে? আর নির্মাণ ত্রুটি থাকলেই তো এমন একটি সম্ভাবনাময় ভেন্যুকে অবহেলায় ফেলে রাখা যায় না; বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার করে কীভাবে একে খেলার উপযোগী রাখা যায়, তাতে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।

সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০০ সালে উদ্বোধনের পর ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ভেন্যু হিসেবে পরিচিত হয় এটি। উদ্বোধনের পর এখানে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়। এরপরও কেন স্টেডিয়ামটি সচল রাখা যায়নি? অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ শুধু নতুন স্টেডিয়াম বানানোর প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। অথচ এই স্টেডিয়ামটি সংস্কার করলে যে অর্থ খরচ হবে, নতুন একটি স্টেডিয়াম তৈরি করতে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ লাগবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন স্টেডিয়ামের প্রয়োজন অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু আমরা মনে করি, গুরুত্ব দিতে হবে পুরোনো স্টেডিয়ামগুলো সংস্কারে। বিশেষ করে পঁচিশ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সম্ভাবনাময় খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকতে পারে না। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, সেখানে মূল স্টেডিয়াম এবং সংলগ্ন আউটার স্টেডিয়ামজুড়ে থইথই পানি আর কচুরিপানা। মাঠটি ডিএনডি প্রকল্পের ভেতরে থাকায় এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোড থেকে নিচু হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায়। সেখানে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসার চেয়ার, ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ড, ভিআইপি গ্যালারি, প্রেস বক্স, ক্রিকেটারদের ড্রেসিং ও ওয়েটিংরুম, বাথরুম সবই ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ার পথে। স্টেডিয়ামের ভেতরে অনেক স্থানেও দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল।

আমরা জানি, একটি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম তৈরির ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক অনেক কিছু নিশ্চিত করতে হয়। আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠানের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়ও বটে। খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামটিতে সব মেনেই নিশ্চয় খেলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ছয় বছর পরিত্যক্ত থাকায় স্টেডিয়ামটির অনেক সম্পদই ধ্বংসের মুখে। কয়েক বছর আগে ক্রীড়ামন্ত্রী মাঠটি পরিদর্শন করলেও মাঠের ভাগ্য বদল হয়নি। আশার বিষয়, অবশেষে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যৌথভাবে স্টেডিয়ামটি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সমকালের প্রতিবেদন বলছে, এরই মধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সমীক্ষা শেষে কয়েক দিনের মধ্যে সম্ভাব্য বাজেটের প্রস্তাবনা দেওয়া হবে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।

আমরা প্রত্যাশা করি, এ লক্ষ্যে এখনই কাজ শুরু করা হোক। বাজেটের কথা বলে আবার যেন দীর্ঘদিন স্টেডিয়ামটি পরিত্যক্ত রাখা না হয়। এমনিতেই খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামটি বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, একে সংস্কার করে খেলার উপযোগী করতেও কয়েক মাস লেগে যাবে। তবে কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে এটি অসম্ভব নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। দেশের মাটিতে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দুটি শক্তিশালী দলের বিপক্ষে যেমন সিরিজ জয়ের মতো রেকর্ড গড়েছে, তেমনি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও ক্রিকেটে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য রেকর্ড অর্জন করেছে। বাংলাদেশের রেকর্ডের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। আমাদের ক্রিকেটের এ খ্যাতি ধরে রাখতে হলে দেশে অধিকসংখ্যক আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের বিকল্প নেই। নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামটি রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় অধিক গুরুত্ব বহন করে। এ স্টেডিয়ামটিতে আবার ক্রিকেট জেগে উঠুক- এটাই প্রত্যাশা।