কন্যা, জায়া, জননী। কতভাবেই না কন্যাদের উপস্থাপন করা হয়। জীবনের এক-একটি পর্বে এক এক নামে হয় তাদের পরিচয়। তবে বিয়েযোগ্য কন্যাদের একটি শব্দ প্রায়ই শুনতে হয়। তা হলো 'কন্যাদায়'। মেয়েরাও এই 'কন্যাদায়গ্রস্ত' শব্দটি শুনতে শুনতে অবচেতন মনেই নিজেকে পরিবারের বোঝা ভাবতে শুরু করে। পিতা-মাতা যেহেতু 'পাত্রস্থ' করার মধ্য দিয়ে দায়মুক্তি খোঁজেন, তখন মেয়েরাও উচ্চশিক্ষা বা চাকরির মতো মুক্তির পথ না খুঁজে 'ভালো পাত্রের' যোগ্য পাত্রীর প্রমাণ দিতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ কন্যাদের যদি 'কন্যারত্ন' বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, যদি কোনো মেয়ের পিতা-মাতা বলেন- তারা 'কন্যারত্নে'র গর্বিত পিতা-মাতা, তাহলে বারবার এই শব্দটি শুনতে শুনতে জীবন সম্পর্কে মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে পারে। এ ধরনের শব্দের সঙ্গে শৈশব বা কৈশোরকাল থেকে তাদের পরিচিত করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। কৈশোর স্তরটি হলো জীবনের বাকি পর্বগুলোর জন্য প্রস্তুতিপর্ব। এ পর্বে তাদের সামনে আইকন হিসেবে আগের এবং বর্তমানের সকল নারী ব্যক্তিত্বকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
আমাদের নারীরা নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে পুরুষের সঙ্গে সমান তালে ভূমিকা রেখেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ছিল সক্রিয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কনকলতা বড়ুয়া, বীনা দাস, সরোজিনী নাইডু, মাতঙ্গিনী হাজরা প্রমুখের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে ছাত্রীরা ছাত্রদের পাশাপাশি অবস্থান নিয়েছিলেন। রওশন আরা বাচ্চু, মমতাজ বেগম (প্রকৃত নাম কল্যাণী রায় চৌধুরী), প্রতিভা মুৎসুদ্দিসহ অনেক ছাত্রীই পিকেটিংসহ সর্বাত্মক আন্দোলনে অংশ নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবি বা সেতারা বেগমের মতো বহু নারীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নেই ১৯৪৮ সালের কিছু ঘটনার স্মৃতিচারণ পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনীতে। তিনি লেখেন- '১১ মার্চ ভোর বেলা থেকে শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করল। সকাল ৮টায় পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের ওপর ভীষণভাবে লাঠিচার্জ হলো। কয়েকজন ছাত্রীও মার খেয়েছিল।' তিনি আরও লিখেছেন- 'পরদিন আমরা জেলে ছিলাম, সকাল ১০টায় স্কুলের মেয়েরা (মুসলিম গার্লস স্কুল) ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর ৪টায় শেষ করত। ছোট ছোট মেয়েরা একটুও ক্লান্ত হতো না।' স্মরণযোগ্য ও কিশোরীদের সামনে আইকন হিসেবে উপস্থাপনযোগ্য আরেকটি নাম বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে জাতির পিতার পাশে যিনি ছায়ার মতো থেকেছেন। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ কারাবাসের দিনগুলোতে সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন, সংসার সামলেছেন।
কিশোরীদের বিকাশে আরেকটি দিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। তা হলো তাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন দেখার আকাশটিকে ছোট করে না দেওয়া। বেশিরভাগ বাবা-মা তাদের কন্যাদের পাত্রস্থ করতে পারলেই খুশি হন। যারা ইতোমধ্যে একটু অগ্রসর চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেছেন তারাও কন্যাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা স্কুল-কলেজের শিক্ষকের বাইরে আর কিছু ভাবতে পারেন না। পুত্র সন্তান রাজনীতি করবে, স্বাভাবিক। ক্লাবে যাবে, স্বাভাবিক। কিন্তু মেয়েটি যখন একটি বাইসাইকেলের জন্য আবদার করবে তখন বাবা-মা বলবেন, এটি ছেলেদের। অথচ যে চাকা আবিস্কারের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতার বিকাশ হয়েছিল, সেই চাকা পুত্র সন্তানের পাশাপাশি কন্যা সন্তানের হাতেও তুলে দেওয়া যেতে পারে। একটি বাইসাইকেলও হয়ে উঠতে পারে মুক্তির চাকা।
কন্যাশিশুটিকে মুক্ত দিগন্তের সন্ধান দেওয়া জরুরি। ক্যারিয়ার যে অনেকভাবে ঢেলে সাজানো যায়, তা তাকে বোঝাতে হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, চিত্রশিল্পী, রন্ধনশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, রাজনীতিবিদ, সংগীতশিল্পী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বৈমানিক, সৈনিক, উদ্যোক্তা বা খেলোয়াড়- কত কিছুই না হওয়ার আছে।
বাঙালি কন্যা নিশাত মজুমদার এবং ওয়াসফিয়া নাজনীন যখন মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান, তখন পাহাড় ডিঙিয়ে ফেলি আমরাও। আজমেরী হক বাঁধন যখন কানের লালগালিচায় হাঁটেন, তখন সে উৎসবের বর্ণচ্ছটা আমাদেরও রাঙিয়ে দিয়ে যায়। বাঙালি রাঁধুনি কিশোয়ারের পান্তা-ভাত আমাদের পিতামহী, মাতামহীকেই যেন বানিয়ে ফেলে মাস্টার শেফ। বিদেশের মাটিতে উপস্থাপিত হয় মা, মাতৃভূমির শ্যামল মায়া।
সেপ্টেম্বর মাস। কন্যাশিশুর মাস। এই সেপ্টেম্বর মাসেই জন্মগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের কন্যারত্ন- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জীবনের বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এক কঠিন সময়ে যিনি নির্বাসনে থেকেছেন। ফিরেছেন এক টুকরো কল্যাণী রোদ হয়ে। তার হাত ধরেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাস্তবায়িত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। তাই বলে আমাদের অগ্রযাত্রা শেষ হয়নি। এখনও আমাদের যেতে হবে বহুদূর। ২০৩০ সালের এসডিজি অর্জনসহ ২০৪১ সালে মাধ্যম আয়ের দেশ হবে বাংলাদেশ। সেই অগ্রযাত্রায় শামিল হতে হবে কন্যাদেরও। মহামতি লেনিন যেভাবে বলেছেন- 'নারীর সাহায্যে, তার চিন্তাশক্তি ও সচেতনতায় নবসমাজের নির্মাণ সুদৃঢ় হতে পারে।'
কন্যাশিশু দিবসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের কন্যারত্নগণ অবশ্যই সুদৃঢ় সমাজ বিনির্মাণে অংশীদার হবে। সে জন্য শিক্ষিত, সচেতন ও স্বনির্ভর হতে হবে। প্লেটোর কথা দিয়ে শেষ করতে চাই, 'নারীর কাছ থেকে পুরুষের মতো কাজ আশা করলে তাকে অবশ্যই সমান শিক্ষা দিতে হবে।'
উপসচিব, খাদ্য মন্ত্রণালয়