দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর স্কুল খুলেছে। শিশুদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। বিষাদ ঝেড়ে আনন্দময় এক পথে যাত্রার ধ্বনি চারদিকে। এই আনন্দ ধরে রাখা এবং আনন্দময় শিক্ষার দিকে শিশুদের নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। আমাদের শিশুরা শিক্ষার মধ্যে থেকেও এক সময় ক্লান্তি ও অবসাদের মধ্যে ঢুকে যায়। নিরানন্দময় একঘেয়েমি শিক্ষার মধ্যে তাদের ধরে রাখার জন্যই সেটি হয়। অথচ চাইলেই আমরা তাদের জন্য যুগপৎ আনন্দ এবং অনুসন্ধিৎসু জাগিয়ে তোলার মতো শিক্ষার আয়োজন করতে পারি। এই শিক্ষার জন্য বাড়তি খুব একটা খরচ হবে তেমন নয়, প্রয়োজন শুধু আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ। শিশুদের আনন্দময় পাঠের আয়োজন করা যেতে পারে তাদের সপ্তাহান্তে কিংবা দুই সপ্তাহ পরপর প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। প্রকৃতিকে চেনাজানার মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক এক শিক্ষার ভেতর দিয়ে সহজে আনন্দ খোঁজে নেওয়ার ব্যবস্থা পৃথিবীর বহু দেশে রয়েছে। বড় ভাবনা এবং বড় কাজের জন্য তাদের তৈরি করার কাজও কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হতে পারে। 

মানুষ আসলে প্রকৃতিরই সন্তান। মায়ের গর্ভে জন্ম নিলেও মানুষ তার চারপাশের বিশাল প্রকৃতি আর পরিবেশের মধ্যেই বেড়ে-বর্তে ওঠে। মায়ের কোল ছেড়ে আসা মানুষ বাস্তবে লালিত হয় প্রকৃতিরই কোলে। ফলে প্রকৃতি পাঠের মধ্য দিয়েই তার শিক্ষার উদ্বোধন ঘটবে এমনটি প্রত্যাশা করাই তো যৌক্তিক। প্রকৃতি উদার হস্তে আমাদের কত কিছুই না দিয়েছে। এদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র বিজ্ঞান আছে এবং আছে একে অন্যের সঙ্গে ক্রিয়া-আন্তঃক্রিয়ার চমৎকার বৈজ্ঞানিক সম্পর্কও। শিশু বেড়ে ওঠে আর তার চারপাশের প্রকৃতি পরিবেশটাকে চিনতে-বুঝতে শুরু করে। প্রশ্ন করে করে সবকিছুর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার শিশুর এ আকাঙ্ক্ষাই তার অনিসন্ধিৎসু মনের বহিঃপ্রকাশ। শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন থাকে তার চারপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশের নানা বিষয়-আশয় নিয়ে। গাছ, ফুল, পাখি, ঘাসফড়িং, প্রজাতি, সাপ, ব্যাঙ ছাড়াও তাদের চোখ যা কিছুর ওপর আটকে যায় সেটি নিয়েই শুরু হয় তাদের প্রশ্ন। প্রকৃতি তো এমনি বিশাল সব বিষয়ের সমারোহ। ফলে প্রকৃতিকে জানার মাধ্যমে কত বিষয়-আশয় জানার-শেখার সুযোগ ঘটে শিশুদের। বিখ্যাত প্রকৃতিবিজ্ঞানী সুইস এগাসিক বরাবরই প্রকৃতি ও পরিবেশকে জানার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এই এগাসিকই 'প্রকৃতি অধ্যয়ন করো, গ্রন্থসমূহ নয়' প্রবাদপ্রতিম শব্দগুচ্ছ প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন। কেবল শ্রেণিকক্ষের মধ্যে আটকে রেখে শিক্ষা প্রদান করার চিরাচরিত পন্থার খানিক বদল করলেই শিক্ষাটা হতে পারে আনন্দময়।

আমাদের চার পাশে প্রকৃতির কত উপাদান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। স্কুলের আশপাশে থাকা কোনো বনজঙ্গল কিংবা ছোট-বড় জলাশয়ের পাশে নিয়ে গেলে আনন্দের সঙ্গে কত কিছু শেখানো যায় শিশুদের। যেতে যেতে কত রকম গাছগাছালি আর পশুপাখির সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়। ছোট-বড় গাছগাছালি যেমন- তৃণ, গুল্ম এবং বৃক্ষের মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরে উদ্ভিদবিজ্ঞানের সহজ-সরল পাঠের মধ্যে তাদের নিয়ে যাওয়া যায় অনায়াসেই। পাতা, ফুল, ফল এসব ছিঁড়ে নিয়ে সহজেই তাদের দেখানো যায় কী রকম মজার খেলা চলছে প্রকৃতিতে। একের সঙ্গে অন্যের মিল-অমিলের বৈজ্ঞানিক কত বিষয়ে সহজেই বুঝিয়ে দেওয়া যায়। ফুলের প্রতি শিশুর আকর্ষণ অনেক বেশি। ফুলের আকার-আকৃতি, বর্ণ-বৈভব আর গন্ধ মাধুরী শিশুরা ভীষণ উপভোগ করে। প্রকৃতির ভান্ডার থেকে ফুল তুলে নিয়ে তাদের ব্যবচ্ছেদ করে পাপড়ির বিন্যাসসহ কত কিছু হাসতে-খেলতে শেখানো যায়। দেখে শেখার মধ্যে অবশ্যই এক রকম আলাদা আনন্দ আছে। ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো প্রজাপতি কিংবা কীটপতঙ্গ দেখে শিশুরা ভীষণ উদ্বেল হয়ে ওঠে। এদের ধরার জন্য দৌড়-ঝাঁপ দেওয়া, ধীরে ধীরে চুপি চুপি এগিয়ে যাওয়া বেশ উপভোগ করে শিশুরা। বনজঙ্গলে কেবল তো গাছগাছালি নয়, দেখা মেলে কত রকম সব প্রাণীর। পাখপাখালি, কাঠবিড়ালি, ব্যাঙ, সাপ, গুঁইসাপ এমনি কত সব প্রাণীর দেখা মেলে সেখানে।

পাখির বর্ণবৈচিত্র্য বরাবরই টানে শিশুদের। পাখির কলকাকলি আর এদের ওড়াউড়ি খুব উপভোগ করে শিশু। এসবই শিশুদের কাছে মহাজিজ্ঞাসার বিষয়। মৌমাছির চাক, উইপোকার ঢিবি আর পাখপাখালির বাসা তো তাদের কাছে বিস্ময়েরই বিষয়। কত কিছু জানার আছে এদের প্রতিটি থেকেই। পাখি আর পাখির বাসা তো শিশু-কিশোরদের বিস্ময় উদ্রেক করা এক বিষয়। পাখির বাসায় পাখির ছানাদের কিচিরমিচির আর মা পাখির কচি ছানাদের খাবার খাইয়ে দেওয়ার দৃশ্য তো মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো ঘটনা। তাছাড়া পাখির বাসা বানানোর চমৎকার কৌশল তো শিশুদের সহজেই দৃষ্টি কাড়ে।

উদ্ভিদ আর প্রাণী প্রকৃতির জীবিত উপাদান বটে। তবে এরাই একমাত্র উপাদান নয়। বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবকুলের বাইরে প্রকৃতিতে রয়েছে কত রকম জড় উপকরণ। পৃথিবীর বাইরে যে বিশ্বমণ্ডল তা নিয়ে মানুষের কত প্রশ্ন। আকাশের সীমানা অতিক্রম করে কী আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে? কী আশ্চর্য টান রয়েছে ওপর জগতে যে মানুষের নিক্ষিপ্ত রকেট আপন গতিতে চলমান থাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর? আর কী দিয়েই বা গঠিত সে জগৎ? রাতে, দৃশ্যমান স্থির তারা এবং দ্রুত ধাবমান তারার দল আর মিট মিট করে জ্বলা তারা কত কিছু রয়েছে দূর আকাশে, রয়েছে আকাশের সীমা ছাড়িয়ে আরও বহু দূরে। আছে বিস্ময় করা চাঁদ আর চাঁদের আলো, আছে জ্বলজ্বল করা সূর্যসহ আরও কত কী? এসব নিয়ে শিশু-তরুণদের প্রশ্নও তো কম নয়। আমাদের প্রকৃতি পাঠ কিংবা পরিবেশ চর্চার জন্য পুস্তক নেই, এ কথা বলছি না। তবে পুস্তক যদি সব হয় তাহলে হাতেনাতে ছুঁয়ে, আনন্দময় প্রকৃতি শিক্ষার সুযোগ তো থাকে না। প্রকৃতি পাঠবিষয়ক পুস্তক সহায়ক গ্রন্থ হতে পারে বটে, সেটি প্রকৃতির মধ্যে অবগাহন করে চোখ-মন জুড়িয়ে নেওয়ার যে আনন্দ এর কখনও বিকল্প হতে পারে না।

প্রতিদিন শিশুদের নিয়ে যেতে হবে প্রকৃতির কাছে তা তো নয়। সপ্তাহে এক দিন, দু'সপ্তাহে এক দিন কিংবা নিদেন পক্ষে মাসে এক দিন তাদের নিয়ে যাওয়া যায় প্রকৃতির কাছাকাছি। অসম্ভব নয় সেটা অবশ্যই। শুধু শেখানোর দায়বোধ থাকলেই তা করা সম্ভব। খুব দূরে যাওয়ার দরকার নেই। গ্রামবাংলার জঙ্গলগুলোর আশপাশেই গাছগাছালি আর নানা রকম প্রাণীর সন্ধান পাওয়া সম্ভব। শুধু প্রয়োজন উদ্যোগ গ্রহণ আর শিশুদের আনন্দময় প্রকৃতি পাঠের জন্য দরদ নিয়ে তাদের প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়া। এর সুফল যে কত বড় হতে পারে তা কল্পনা করাও কঠিন। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ আর প্রকৃতির মধ্যে খানিক সময় কাটানো পাঠ কক্ষে বসে প্রকৃতি পাঠের চেয়ে হাজার গুণ উত্তম। এর মধ্য দিয়ে শিশুর মনের মধ্যে কোনো বিষয়বস্তু জানা-বোঝার যে আগ্রহ জেগে ওঠে, তাই তাকে নিয়ে যেতে পারে বড় জিজ্ঞাসার জগতে।

উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়