ঐতিহাসিক ২৫ সেপ্টেম্বর। ১৯৭৪ সালের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলায় দৃপ্ত কণ্ঠে বক্তৃতা দেন। সেদিন বিশ্ব আবার অবাক হয়ে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বদরবারে দেখতে পায়। বাংলা বাঙালির ভাষা। জাতি হিসেবে বাঙালি পরাধীন তো ছিলই আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষার কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছিল না। এ জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছে। বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার ১৯৪৮-৫২ সময়ের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন পর্যায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন, কারাবরণ করেন, নির্যাতিত হোন। সেই বাংলা ভাষাই এখন স্বাধীন বাংলাদেশের ভাষা এবং এই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে ভাষণ দেন। এটি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের এবং বাঙালির জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি ও সাফল্য।

প্রদত্ত ওই ভাষণে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ার অকাট্য যৌক্তিকতা তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাকে অন্যতম আন্তর্জাতিক ভাষা করার দাবি উপস্থাপন করেন। উপস্থিত সবাই বাংলায় প্রদত্ত ওই ভাষণ স্বাগত জানান এবং বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করেন। তাই ব্যক্তি মুজিব মাত্র ৫৫ বছরকাল বাঁচলেও ইতিহাসে মুজিবের কোনো মৃত্যু নেই। আদর্শের মুজিব চিরঞ্জীব। আবার ৫৫ বছরের মধ্যে শৈশব ও কৈশোরের ১৩ বছর এবং যৌবনকালে কারাবন্দি ১৩ বছর যোগ করে ২৬ বছর বাদ দিলে রাজনীতিক মুজিব মাত্র (৫৫-২৬) ২৯ বছরের। এই ২৯ বছর মানে ব্রিটিশ শাসনের বন্দিদশা থেকে বাঙালির মুক্তির প্রথম ধাপ (অর্থাৎ পাকিস্তান) অর্জন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন অখণ্ডিত অধ্যায়ের পারফেক্ট লিডার। বাংলাদেশ বা বাঙালির মুক্তির জন্য আরও অনেক নেতা ছিলেন। মুজিব তাদের মধ্যে অনেক নেতারই শিষ্য। নেতা হিসেবে গড়ে ওঠার প্রথম দিকে কোনো নেতার আদর্শের দ্বারা পরিচালিত হওয়াই স্বাভাবিক। বঙ্গবন্ধুর বেলায়ও তাই হয়েছে। যেসব নেতার ভাবাদর্শে এক সময় যে মুজিব পরিচালিত হয়েছেন, সেই নেতাদের কেউ কেউ আবার পরবর্তী সময়ে মুজিবেরই নেতৃত্বাধীন ছিলেন এবং তার জয়গান গেয়েছেন। বিশ্বে সব নেতার চেয়ে বাঙালি নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এখানেই পার্থক্য। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু মুজিবের নেতৃত্ব বাংলাদেশ তথা এশিয়া মহাদেশ ছেড়ে বিশ্বদরবারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরব উপস্থিতি ও প্রাধান্য প্রসারিত হচ্ছিল এবং প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠছিলেন। এমন প্রভাবশালী বাঙালি কোনো নেতার নাম আমাদের ইতিহাসে নেই।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি দেশের স্বীকৃতি এবং জাতিসংঘসহ বিশ্বের সংগঠনগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কার্যকর ও অপরিহার্য সম্পৃক্ততা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন এবং দেখা যায় প্রতিটি উদ্যোগেই তিনি সফল হয়েছেন। এসব ক্ষেত্রেই তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ বাঙালি চেতনা নিয়েই অগ্রসর হয়েছিলেন। এই প্রচেষ্টার অন্যতম সফল প্রচেষ্টা হচ্ছে জাতিসংঘ এবং কমনওয়েলথের সদস্যভুক্ত হওয়া এবং একইসঙ্গে 'জুলিওকুরি' শান্তিপদক লাভ করা। তাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং বাঙালির চিরকালের আদর্শ। বাঙালি জাতির পিতা বলেই তিনি ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্যপদের স্বীকৃতি লাভের পরপরই ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বাংলায় বক্তৃতা করেন। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলায় প্রদত্ত ওই ভাষণ অসাধারণ ভূমিকা রাখতে যেমন সক্ষম হয়েছে, তেমনি এ উদ্যোগ বাঙালির হাজার বছরের মায়ের ভাষা, স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এই বাংলার পরিচিতির পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের একটি স্বীকৃত ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে। এই পথ ধরেই বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি ২০২১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭৬তম সাধারণ অধিবেশনে আবার বাংলায় ভাষণ দিলেন। এই ভাষণসহ কম করে হলেও তিনি ১৮ বার বাংলায় বক্তব্য দেন। এই ঐতিহাসিক বা ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতেই বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্বব্যাপী আমাদের আন্দোলনকে জোরদার করতে হবে।

আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামের সঙ্গে আমাদের শহীদদের পবিত্র স্মৃতি জড়িত। শহীদদের বিদেহী আত্মার শান্তি ও মূল্যায়নের তাগিদে বাংলাকে আরও সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল করতেই হবে। বাঙালি জাতিভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করবে। বাংলা ভাষার গৌরব, সুনাম ও প্রসার ঘটবে; যা বাঙালি জাতিকে জাতীয়তাবোধে আরও সুদৃঢ় করতে সহজ হবে এবং বিশ্বের সঙ্গে বাঙালির যোগাযোগ কার্যকর ও সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে বাঙালির ব্যক্তিত্ব বিকাশ, মর্যাদার ক্রম বৃদ্ধি, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ সহজতর হয়ে উঠবে। সব যোগ্যতা থাকার কারণেই বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ এখন বাঙালির আন্তর্জাতিক অধিকার হিসেবে দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ওই প্রথম ভাষণই হবে উক্ত অধিকার আদায়ের ভিত্তি। এই অধিকার আদায় এখন বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সর্বস্তরে বসবাসকারী বাংলাভাষীর দায়িত্ব হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ সম্ভব হলে বাংলা ভাষায় সমৃদ্ধ একটি বাঙালি সম্প্রদায়ের ভিত্তি সুদৃঢ় হবে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মানেই বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি, বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা এবং বাংলা ভাষা চর্চা বৃদ্ধি। ফলে অন্য ভাষাভাষীদের বাংলা ভাষা শেখার ও জানার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশে স্থাপিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সমৃদ্ধি ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য ২৫ সেপ্টেম্বরকে দেশব্যাপী বিশেষ মর্যাদা দানের একটি উদ্যোগও বড় ভূমিকা রাখবে। বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ফলে বঙ্গবন্ধুর মর্যাদাই বৃদ্ধি পাবে। কারণ বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন আমাদের একমাত্র নেতা যিনি বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। মনে রাখতে হবে, ইউনেস্কো ১৯৭১-এর ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত যে অলিখিত ভাষণকে বিশ্বের সেরা ভাষণের স্বীকৃতি দিয়েছে তা বাংলা ভাষাতেই বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন। তাই বলা যায়, বাংলা ভাষার ওপর বিশ্বের অগ্রিম স্বীকৃতি রয়েছে। বাংলা একাডেমিসহ শুদ্ধ বাংলা চর্চার কেন্দ্রগুলো বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের মর্যাদা, তাৎপর্য, ব্যাপকতা ও গুরুত্ব তুলে ধরে সভা, সেমিনার, স্মরণিকা প্রকাশ ও গবেষণা পরিচালনা করতে পারে। এমনকি বাংলা একাডেমি বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রাঙ্গণে কিংবা উপযুক্ত অন্য কোনো স্থানে একটি স্মারক স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা যেতে পারে। ভাষণটির মর্যাদা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে উন্মুক্ত রচনা ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে পারে।

সরকারের সাবেক সচিব
humayunkhalid57@gmail.com