১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। সারা বিশ্ব কৌতূহলে তাকিয়ে আছে নিউইয়র্কের জাতিসংঘের সদর দপ্তরের দিকে। আমেরিকা-চীনের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ নামে ছোট্ট একটি দেশ। প্রায় তিন বছরের চেষ্টার ফলে সেই দেশ মাত্র এর সপ্তাহখানেক আগে জাতিসংঘের সদস্যপদ পায়। এই দেশের নেতা বিশ্ববাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন এবং কী বলেন সেটাই শোনার বিষয়।

নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৩টা, ঢাকার ঘড়িতে রাত ১টা। নাম ঘোষিত হলো, অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার অব পিপলস রিপাবলিক বাংলাদেশ হিস এক্সিলেন্সি শেখ মুজিবুর রহমান ...। নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সভার সভাপতি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। এ এক বিরল সম্মান প্রদর্শন। সেই মহান নেতা গলা আঁটা কালো কোট গায়ে এসে দাঁড়ালেন লেকচার ডায়েসে। গমগমে গলায় বলতে শুরু করলেন, 'আজ এই মহান পরিষদে আপনাদের সামনে দুটো কথা বলার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। মানবজাতির এই পার্লামেন্টে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ প্রতিনিধিত্ব লাভ করায় আপনাদের মধ্যে যে গভীর সন্তোষের ভাব লক্ষ্য করেছি, আমিও তার অংশীদার ...।'

না, ইংরেজিতে নয়। তার প্রিয় মাতৃভাষাতেই তিনি বলে যেতে লাগলেন কথাগুলো। গানের মতো গীতল সেই ভাষার অর্থ বিশ্ববাসী বোঝেনি তৎক্ষণাৎ। কিন্তু এর আবেগ তাদের ঠিকই স্পর্শ করে। তারা জানে, এ নেতা ইংরেজি জানেন না বলে তার মাতৃভাষায় বক্তৃতা দিচ্ছেন, এমনটা নয়। বিবিসিতে দেওয়া তার ইংরেজি সাক্ষাৎকার তারা দেখেছে ও শুনেছে। তাই জানে, ভাষা কোনো সমস্যা নয়। নিজের ভাষায় ভাষণ দেওয়ার পেছনে এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা নিহিত। সেক্যুলারিজমের জন্ম যদিও ইউরোপে, কিন্তু সেই ধারণা আবর্তিত ছিল ধর্মকেই কেন্দ্র করে। খ্রিষ্টধর্মের দুটো উপমতের দ্বন্দ্বে রাষ্ট্র নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখবে- এই ছিল মূল ভাবনা। কিন্তু ধর্মকে রাষ্ট্র গঠনের উপাদান না করে সম্পূর্ণ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে সামনে রেখে একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি- পৃথিবীর ইতিহাসে এ এক নতুন ধারণা। সেটাই করে দেখিয়েছে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা বাঙালিরা। সেই প্রগতিশীল চিন্তার প্রতিভূ হিসেবে বিশ্ব জাতিগোষ্ঠীর সংগঠন জাতিসংঘে হাজির হন বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অতএব, তিনি যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভাষায় কথা বলবেন না, সেটাই স্বাভাবিক।

মাত্র ৪৫ মিনিটের ভাষণে সদ্য স্বাধীন সেই দেশটির জনগণের মনোভাব বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট করে তোলেন সেই কিংবদন্তি নেতা। ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের প্লাবনে স্বাধীনতা পাওয়া সেই দেশটির আদর্শ কী, তা বলতে গিয়ে নেতা বলেন, 'জাতিসংঘ সনদে যে মহান আদর্শের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের জনগণেরও আদর্শ এবং এ আদর্শের জন্য তারা চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এমন এক বিশ্ব-ব্যবস্থা গঠনে বাঙালি জাতি উৎসর্গীকৃত, যে ব্যবস্থায় সকল মানুষের শান্তি ও ন্যায়বিচার লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে এবং আমি জানি আমাদের এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণের মধ্যে আমাদের লাখো লাখো শহীদের বিদেহী আত্মার তৃপ্তি নিহিত রয়েছে।'

তার সদ্য স্বাধীন দেশটি তখন হাজারো সমস্যায় জর্জরিত। এ নিয়ে তার কোনো লুকোচুরি নেই। মুক্তকণ্ঠে তুলে ধরেছিলেন দেশের কঠিন বাস্তবতা। বলেছিলেন, 'জনগণের জীবন ধারণের মান নিছক বেঁচে থাকার পর্যায়ে থেকেও নিচে নেমে গেছে। মাথাপিছু যাদের বার্ষিক আয় ১০০ ডলারেরও কম, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বেঁচে থাকার জন্য যে নূ্যনতম খাদ্য প্রয়োজন, তারও কম খাদ্য খেয়ে যারা এতদিন বেঁচে রয়েছে, এখন তারা সম্পূর্ণ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।'

কিন্তু এ দেশ তো সুকান্তের 'সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়'। তাই নেতা স্বপ্টম্নদ্রষ্টার মতো বলে যান, 'একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা আমাদের কষ্টার্জিত জাতীয় স্বাধীনতার ফল আস্বাদ করতে পারব এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-শোক, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হবো।' শুধু দেশ নয়, সারাবিশ্ব ছিল তার ভাবনাজুড়ে। তিনি বিশ্ব পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ম্ফীতির ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যয় বহুগুণে বেড়ে গেছে। তাদের নিজেদের সম্পদ কাজে লাগানোর শক্তিও হ্রাস পেয়েছে। ইতোমধ্যে যেসব দেশ দরিদ্র ও ব্যাপক বেকার সমস্যায় ভুগছে তারা তাদের অতি নগণ্য উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোকেও কেটে-ছেঁটে কলেবর ছোট করতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ হারে বর্ধিত আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা ছিল। বিশ্বের সকল জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে অগ্রসর না হলে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এমন বিরাট আকার ধারণ করবে, ইতিহাসে যার তুলনা পাওয়া যাবে না। অবশ্য বর্তমানে অসংখ্য মানুষের পুঞ্জীভূত দুঃখ-দুর্দশার পাশাপাশি মুষ্টিমেয় মানুষ যে অভূতপূর্ব বৈষয়িক সমৃদ্ধি ও সুখ-সুবিধা ভোগ করছে তার তুলনা ইতিহাসে বিরল।'

সবার সঙ্গে 'শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সকলের সঙ্গে মৈত্রী' নীতি বাস্তবায়নে তিনি কতটা ছাড় দিতে রাজি তার উদাহরণও তিনি দেন বিশ্ববাসীকে। তিনি বলেন, 'আমরা আমাদের মহান নিকট প্রতিবেশী ভারত, বার্মা ও নেপালের সঙ্গে যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছি, তেমনি অতীত থেকে মুখ ফিরিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টায়ও লিপ্ত রয়েছি। অতীতের তিক্ততা দূর করার জন্য আমরা কোনো প্রচেষ্টা থেকেই নিবৃত্ত হই নাই। ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকেও ক্ষমা প্রদর্শন করে এই উপমহাদেশে শান্তি ও সহযোগিতার নতুন ইতিহাস রচনার কাজে আমরা আমাদের আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়েছি। এই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত থাকার অসংখ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ ছিল, তবু সকল অপরাধ ভুলে গিয়ে আমরা ক্ষমা ও উদারতার এমন উদাহরণ সৃষ্টি করতে চেয়েছি, যা ভবিষ্যতে এই উপমহাদেশে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। অন্যান্য অমীমাংসিত বিরোধ নিষ্পত্তির কাজেও আমরা ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সমঝোতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছি।' বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থিত প্রত্যেক মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতি তার সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার প্রমাণ মেলে তার ভাষণে। তিনি বলেন, '৬৩ হাজার পাকিস্তানি পরিবারের দুর্গতি এখন একটি জরুরি মানবিক সমস্যা হয়ে রয়েছে। পাকিস্তানের প্রতি তাদের আনুগত্যের কথা তারা আবার প্রকাশ করেছেন এবং স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য তাদের নাম রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির কাছে তালিকাভুক্ত করেছেন। আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া এবং আইন অনুসারে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করার অধিকার তাদের রয়েছে।'

আয়তন অথবা অর্থনৈতিক সামর্থ্য একটি দেশের শেষ কথা নয়। সেই দেশের মানুষ আত্মপ্রত্যয় আর দৃঢ়চেতা থাকলে দেশ ঘুরে দাঁড়াবেই। বাংলার লড়াকু মানুষই ছিল নেতার অহংকারের ভিত্তি। তাই তিনি দীপ্ত কণ্ঠে এক মর্যাদাশীল রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেন এভাবে, 'আমি মানবের অসাধ্য সাধন ও দুরূহ বাধা অতিক্রমের অদম্য শক্তির প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থার কথা আবারও ঘোষণা করতে চাই। আমাদের মতো জাতিসমূহ, যাদের অভ্যুদয় সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে, এই আদর্শ, বিশ্বাসই তাদের বাঁচিয়ে রাখবে। আমাদের কষ্ট স্বীকার করতে হতে পারে। কিন্তু আমাদের ধ্বংস নেই। এ জীবন যুদ্ধের মোকাবিলায় জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞাই শেষ কথা। আত্মনির্ভরশীলতাই আমাদের লক্ষ্য। জনগণের ঐক্যবদ্ধ যৌথ উদ্যোগই আমাদের নির্ধারিত কর্মধারা।' পৌনে এক ঘণ্টার এই ভাষণ ছিল এক সাহসী জাতির বিশ্বদরবারে নির্ভীক অভিষেক। এদের দারিদ্র্য থাকতে পারে, সম্পদের অভাব থাকতে পারে, কিন্তু আত্মমর্যাদার সংকট ছিল না বিন্দুমাত্র।

এসব হয়তো কারো কারোর ভালো লাগেনি। তাই ওই ভাষণের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাকে ঘাতকের বুলেটে সপরিবারে প্রাণ হারাতে হলো। কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, মিয়ানমারের অং সান কিংবা ইন্দোনেশিয়ার সুকর্নেরও প্রায় একই পরিণতি হয়েছিল। যারাই তাদের জাতিকে ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে মুক্তি দিয়ে আত্মনির্ভরতার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন, তারাই হয়েছেন ষড়যন্ত্রের শিকার।

অধ্যাপক, হৃদরোগ বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
mustafazaman44@gmail.com