সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা আফগানিস্তান ত্যাগ করার পরে 'ধারণাতীত' দ্রুততম সময়ের মধ্যে তালেবান বাহিনী আফগানিস্তান দখল করে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। বেশ কয়েক দিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল আফগানিস্তানের তালেবান। বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলোও তাদের দূরদর্শন, ছাপা কাগজ, অনলাইন পোর্টালে প্রতি মুহূর্তের সর্বশেষ খবরে প্রাধান্য দিয়েছে তালেবানের কর্মকাণ্ড, সংবাদ সম্মেলন, সরকার গঠনের তৎপরতা। প্রাধান্য দেয় তালেবানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ব্রিটেন, জার্মানি, কাতার, পাকিস্তান, ভারতসহ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর বক্তব্য ও কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।

আফগানিস্তানের ওই ঘটনার পরপরই বাংলাদেশেও কয়েকটি চাঞ্চল্যকর এবং উত্তাপ-বিস্তারকারী ঘটনা ঘটে গেল। বিএনপি নেতাকর্মীরা তাদের নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দেওয়ার সময়ে চন্দ্রিমা উদ্যানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লেন। ওই একই সময়ে বরিশালে মেয়রের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর দ্বন্দ্বের জেরে ইউএনওর বাসায় পোস্টার তুলে ফেলাকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী আহত হন। তড়িঘড়ি করে বিবৃতি দিতে গিয়ে বিসিএস প্রশাসন অ্যাসোসিয়েশন বরিশালের মেয়রকে 'দুর্বৃত্ত' (!) বলে অভিহিত করে। ওই বিবৃতি সরকার, আওয়ামী লীগ ও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে। দু'দিন পরে জ্যেষ্ঠ সচিবরা জানান, তারা এই বিবৃতির সঙ্গে একমত নন। এদিকে দলমত নির্বিশেষে সবাই একমত হন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অ্যাসোসিয়েশনের ভাষা এত নিষ্ঠুর ও শালীনতা-বিবর্জিত হওয়া উচিত হয়নি। কাছাকাছি সময়ে একজন অধ্যাপকের ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনাগুলোর কোনোটির সঙ্গে কোনোটির কার্যকারণ সম্পর্ক নেই। তবে আফগানিস্তানে তালেবানি দখলের পরপরই ঘটনাগুলো ঘটে যাওয়ায় ওই ঘটনার উত্তাপ বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তাপদাহ বিস্তার করা শুরু করল কিনা, এই প্রশ্ন ওঠাটা অস্বাভাবিক নয়।

দুই.

আফগানিস্তানে তালেবানি কর্তৃত্ব বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের নানা মহলে নানা উচ্চতা, মাত্রা, ব্যাস ও ব্যাসার্ধের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। রাজনৈতিক দল, ধর্মভিত্তিক সংগঠন, নারী নেতৃত্ব, মানবাধিকার কর্মী, সাংস্কৃতিক শক্তিসহ সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্রিয়াশীল নানা 'ফোর্স ও কাউন্টার ফোর্স' তাদের মতো করে তালেবানি বিপ্লবের অভিঘাতে লাভক্ষতির হিসাব কষতে শুরু করেছে। নানা ঘটনাপ্রবাহে এটি স্পষ্ট, এবারের তালেবান ২০ বছর আগের তালেবানের চেয়ে আলাদা। কেননা, জাতিসংঘসহ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আফগানিস্তানের নতুন সরকারের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। নারী অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সর্বজনীন মানবাধিকারের চর্চা ও সুরক্ষা নিয়ে নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রগুলোর চাপ আছে তালেবান সরকারের ওপর। এদিকে আফগান অর্থনীতির যে নাজুক অবস্থা তাতেও তালেবান সরকারকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে।

দিন কয়েক আগে আফগানিস্তানের নারীরা তাদের অধিকার, শিক্ষা, ও কর্মসংস্থানের সমর্থনে শোভাযাত্রা বের করেন। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে তালেবান প্রতিনিধিরা নারী মন্ত্রণালয় খুলে দেওয়া ও ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। আফগানিস্তানের তালেবানি দখলে শুধু যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিই তৎপর হয়েছে তা-ই নয়, শক্তিশালী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দিন কয়েক আগে পাকিস্তানের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধানের উদ্যোগে চীন, রাশিয়া, ইরানসহ আটটি দেশের গোয়েন্দা প্রধানরা পাকিস্তানে সভা করেছেন। আফগানিস্তানের বিপুল পরিমাণ খনিজসম্পদ এবং তার পাহারাদার তালেবান সরকার ও তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সখ্য ও সদ্ভাব বজায় রাখার 'কমন স্ট্র্যাটেজি' নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা করেছেন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা- তা ধারণা করা যায়।

তিন.

আফগানিস্তানে তালেবানের নিরঙ্কুুশ নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন মহলে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিলেও আফগানিস্তানের লড়াকু মানুষ এই বার্তা বিশ্বকে জানিয়ে দিতে পেরেছেন, আফগানিস্তান কখনও কারও বশ্যতা স্বীকার করেনি। মহাপরাক্রমশালী সোভিয়েত সমাজতন্ত্রী এবং বৈশ্বিক মোড়ল মার্কিন বাহিনীকে নাস্তানাবুদ হয়ে আফগানিস্তান ছাড়তে হয়েছে। তালেবান বাহিনীর এই 'জবরদস্ত' উত্থান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আল কায়দা ও আইএসের সদস্যদের উজ্জীবিত করেছে। পাকিস্তানের জঙ্গিরা তাদের দেশে তালেবানের মতো সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ভারত ও বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো তালেবানি উত্থানে অনুপ্রাণিত হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে।

কয়েক দশকের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য, বহুত্ববাদী সংস্কৃতির চর্চা এবং ভারতীয় সত্তার আত্তীকরণের কারণে ভারতের সাধারণ মুসলমানদের ওপর আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনার প্রভাব জঙ্গিদের মতো হবে না। ওই একই কারণে বাংলাদেশের মুসলমানদের ওপরও আফগানিস্তানের তালেবানি দখলের প্রভাব হবে মিশ্র, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো চাঙ্গা হয়ে উঠবে বা উঠেছে, ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ওপর সওয়ার হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার ছক কষতে পারে। নারী ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলো প্রমাদ গুনবে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি উৎকণ্ঠিত হলেও সতর্ক থাকবে, যেন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানি ও তালেবানি চেতনার কোনো শক্তির কাছে চলে না যায়।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মুসলমানরা একই ধর্মাবলম্বী হলেও তাদের ওপর তালেবানি উত্থানের প্রভাব একই রকম হবে না। এ প্রভাব গোঁড়াপন্থি ও জঙ্গি মুসলিমদের ওপর একরকম হবে; উদারপন্থি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মুসলিমদের ওপর অন্যরকম হবে। আবার তালেবানি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাকিস্তানি মুসলমানদের যেভাবে ওই ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করেছে, সেভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের মুসলমানদের উজ্জীবিত করবে না। কারণ সামাজিক, রাষ্ট্রিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং চর্চার ভিন্নতা।

চার.

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি আফগানিস্তান হবে? সোজাসাপ্টা উত্তর হচ্ছে, বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়নি, আফগানিস্তান হওয়ার সম্ভাবনাও নেই বললেই চলে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে পাকিস্তান বা মিনি পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা হয়েছে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশও ছিল তখন তৎকালীন শাসকদের অনুকূলে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো ছিল ক্রুদ্ধ ও বিক্ষুব্ধ। ১৯৭৫ সালের পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় বাংলাদেশকে পাকিস্তানের 'মিনিয়েচার'-এ পরিণত করতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের পুনর্বাসন ও পৃষ্ঠপোষকতা; মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা; বাংলাদেশের রেডিও, টেলিভিশন, গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনীসহ নানা প্রতিষ্ঠানকে পাকিস্তানের আদলে গড়ে তোলার চেষ্টা, সেই নির্মম সত্যকে মনে করিয়ে দেয়।

সামরিক শাসক এরশাদ ক্ষমতায় আসার পরে পাকিস্তানি ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন বা রাখার চেষ্টা করেন। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশে প্রত্যাবর্তন, খালেদা জিয়ার বিএনপির হাল ধরা এবং ৮ দলীয়, ৭ দলীয় ও ৫ দলীয় জোটের নেতৃত্বে শক্তিশালী বিরোধী দলের আত্মপ্রকাশ বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি ইতিবাচক মাত্রা দেয় এই অর্থে যে, বাংলাদেশে তখন একজন পরাক্রমশালী সামরিক শাসক যেমন ছিলেন, তেমনি ওই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত নানা দলমতের একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনও ছিল। এই 'মিলিটারি ফোর্স ও তার কাউন্টার গণতান্ত্রিক ফোর্স'-এর ঘাত-প্রতিঘাত ও মিথস্ট্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

ওই সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার বিকাশের ভ্রূণকে মহিরুহে পরিণত করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। সঙ্গে ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ প্রগতিশীল সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ছিলেন আরও শ্রমজীবীরাও। বলতে কোনো দ্বিধা নেই, এক দশকেরও অধিক সময় ধরে চলা উন্নয়নের অভিযাত্রায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং এর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবস্থা দেখে আক্ষেপ করতেন। কেননা, বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শুধু সমাদরই করতেন না, শ্রদ্ধা করতেন এবং তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্প গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

পাঁচ.

বাংলাদেশ আদৌ আফগানিস্তান হবে কিনা, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সংবিধানে সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার অন্তর্ভুক্তির ইতিহাসও একটু দেখে নিতে হবে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সংবিধানের খসড়া এবং গণপরিষদে বিস্তারিত আলোচনার পর সংবিধানটি গৃহীত হলেও সংবিধানের নীতিগত বিষয় ও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ফলে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ মূল্যবোধ ও উদার মানবিক নৈতিকতাও অনুপ্রবিষ্ট হয় সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলোতে। একটি আলোচনা সভায় আমার এক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, সেকুলারিজম রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সংবিধানে থাকবে কিনা, সেটি নিয়ে দ্বিমত ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তায় জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সংবিধানে স্থান করে নেয় সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা।

বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম, সম্প্রদায়, মত-পথ ও আদিবাসীদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গৃহীত না হলে রাষ্ট্র চালানো মুশকিল হবে- বঙ্গবন্ধু তার ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সেটি বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে দ্বিধাহীনভাবেই এ কথা বলা চলে, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া হবে বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বাংলাদেশে সম্প্রীতি রক্ষায় প্রগতিশীল সবাইকে থাকতে হবে যূথবদ্ধ।

অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়