এএসএম আলী কবীর সেরনিয়াবাত চলতি বছরের গোড়ার দিকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। ২০১১ সালে তিনি সরকারের সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর আলী কবীর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক হিসেবে। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ জনপ্রশাসন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্য ও অনুবাদের বিভিন্ন শাখায় স্বাচ্ছন্দ্য আলী কবীরের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে চাঁদেরবিচ্ছেদ, ঊনসত্তরের ডায়েরি, বাংলা মায়ের খোকা, বিচিত্র প্রসঙ্গ। তার জন্ম ১৯৫২ সালে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে, পিতার কর্মস্থলে।


সমকাল : দীর্ঘ কর্মজীবনে আপনি যেসব দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন সেগুলোর মধ্যে নদী ও পানিসম্পদ-সংশ্নিষ্ট সংস্থাও রয়েছে। যেমন বিআইডব্লিউটিসি, ওয়ারপো; বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব কি খানিকটা আলাদা?

এএসএম আলী কবীর : কেবল দাপ্তরিক দায়িত্বের কারণে নয়; নদ-নদী নিয়ে এমনিতেও আমি বিভিন্ন সময় মাথা ঘামিয়েছি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে কাজ করতে গিয়ে দেশের প্রধান প্রধান রুটে নৌপরিবহন নিয়ে খোঁজ-খবর রাখতে হয়েছে। আসলে বাংলাদেশে যাদের জন্ম, নদী নিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনা করতেই হয়। সেদিক থেকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের দায়িত্ব আমার কাছে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ নয়।

সমকাল : কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সামনে তো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেগুলো সম্পর্কে বলবেন?

আলী কবীর : এই চ্যালেঞ্জগুলো নতুন নয়, শুরু থেকেই ছিল। কমিশনের আইনে কিছুটা দুর্বলতা আছে, স্বীকার করতে হবে। তারপরও আইনে যা বলা হয়েছে, তাতে গত সাত বছরে দখল-দূষণকারীরা বুঝতে পেরেছে- আগের মতো আর চলবে না। তাদেরই চ্যালেঞ্জ করার মতো সরকারি ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এখন তৈরি হয়েছে। দখল-দূষণকারীদের ভালো হতে হবে অথবা পাততাড়ি গোটাতে হবে।

সমকাল : এ কমিশনের কাজ তো শুধু সুপারিশমূলক।

আলী কবীর : এটা ঠিক, নদী রক্ষা কমিশন নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক সংস্থা নয়। এটা একটা বিধিবদ্ধ সংস্থা। আমরাও চাই নদী কমিশন সাংবিধানিক কমিশনের মতো স্বাধীন হোক। এর পরিকাঠামো, অবকাঠামো, লোকবল সংকট রয়েছে। সব দূর করে শক্তিশালী হোক। আমরা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কমিশন আইন সংশোধনের সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য নিয়মিত তাগিদ দিচ্ছি। কিন্তু যতক্ষণ তা হচ্ছে না, ততক্ষণ তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা যাবে না।

সমকাল : অভিযোগ আছে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন শক্তিশালী হোক- এটা সরকারই চায় না।

আলী কবীর : জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সরকারের অংশ। বলতে পারেন, ছায়া রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ফলে কমিশনে আমরা যারা কাজ করি, তাদের বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সজাগ ও সংবেদনশীল থাকতে হবে। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কী? সিদ্ধান্ত হচ্ছে, নদী দখলে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আমাদের বলা হয়েছে, সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যান। আমাদের যা আছে, আমরা তাই নিয়ে সাহসের সঙ্গে কাজ করছি।

সমকাল : যারা নদী দখল ও দূষণে জড়িত, তাদের প্রায় সবাই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী।

আলী কবীর : তাদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে। এটা বিচিত্র কিছু নয়। কিন্তু নদী দখল বা দূষণে জড়িত থাকলে তাদের ব্যাপারে আইনই সিদ্ধান্ত নেবে। আমাদের যে আইন দেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না।

সমকাল : নদী দখল-দূষণ তো থামছে না। সরকারের প্রধান নির্বাহী চাইছেন, আদালতের নির্দেশনা রয়েছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আপনি বলছেন, নদী রক্ষা কমিশন আইন অনুযায়ী কাজ করে যাবে। তাতে কাজ হচ্ছে না কেন?

আলী কবীর : এখন যে দখল-দূষণ দেখছেন, তা কয়েক দশক ধরে চলছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন মাত্র সাত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও উন্নতি হবে। আপনাকে শুধু এতটুকু বলতে পারি যে, নতুন করে কেউ দখল ও দূষণ করতে পারছে না। পুরোনো দখলদারদের ইতোমধ্যে খবর হয়ে গেছে।

সমকাল : নতুন করে যে দখল-দূষণ হচ্ছে না- এটা কীসের ভিত্তিতে বলছেন?

আলী কবীর : আমাদের নিজস্ব অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বলছি। কিছু প্যারামিটার সেট করেছি আমরা। যদিও নিজস্ব জনবল নেই; জেলা ও উপজেলা প্রশাসন থেকে আমরা নিয়মিত খোঁজ-খবর নিচ্ছি।

সমকাল : আপনাদের নিজেদের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে যে তালিকা দিয়েছেন, সেখানে দেখা যাচ্ছে, কিছু দখল উচ্ছেদ হয়েছে; বেশিরভাগই রয়ে গেছে। নতুন দখল না হওয়ার খোঁজ-খবর নিতে পারলে পুরোনো দখল উচ্ছেদ হচ্ছে না কেন?

আলী কবীর : বর্তমানের নদী রক্ষা কমিশনের হাত আছে, হাতিয়ার নেই। আমাদের কাজ করতে হয় জেলা বা উপজেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ বা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে। তাদেরও নানা কাজ থাকে। নদী কমিশনের নিজস্ব জনবল থাকলে পরিস্থিতির আরও দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব হতো।

সমকাল : বিষয়টি কি এমন, নদী কমিশনের নির্বাহী ক্ষমতা নেই বলে জেলা বা উপজেলা প্রশাসন নির্দেশ পালনে ততটা গরজ দেখায় না?

আলী কবীর : চাইলে আমরা এখনও নির্বাহী আদেশ দিতে পারি। কারণ উচ্চ আদালতের রায়ে আমাদের সেই ক্ষমতা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। আমরা মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেতের জন্য বসে আছি। কিন্তু বেশি দিন বসে থাকব না।

সমকাল : কমিশন নদী দখল নিয়ে যতটা তৎপর, দূষণ নিয়ে ততটা নয়...

আলী কবীর : দেখুন, দখল তো কাঠামোগতভাবে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু দূষণ চিহ্নিত করা ততটা সহজ নয়। তারপরও যেখানেই দূষণ চোখে পড়ছে আমরা জেলা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলছি। যেমন গাজীপুরে কয়েকটি কারখানা দূষণ করেছে। জেলা প্রশাসককে বলেছি এক মাসের মধ্যে এসব বন্ধ করে দিতে। যদি কথা না শোনে, তাহলে পাইপের মধ্যে জিও ব্যাগ দিয়ে পাইপ বন্ধ করে দিতে বলেছি।

সমকাল : বালু উত্তোলন নদীর জন্য একক বৃহত্তম বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ জন্য কমিশন কী করছে?

আলী কবীর : নদীর জন্য ক্ষতিকর যে কোনো বিষয় আমরা বন্ধ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু কয়েক দশকের জঞ্জাল রাতারাতি সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। আপনারা আমাদের সময় দিন ও দেখুন। আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছি। জনবল, অর্থবল বাড়ানোর কথা বলছি। এগুলো পূরণ হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।

সমকাল : জনসাধারণকে সঙ্গে নিতে হবে। তাহলে অনেক কাজ সহজ হয়ে যাবে।

আলী কবীর : জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন প্রথম থেকেই নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সামনে আরও বেশি জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি গ্রহণ করব আমরা।

সমকাল : আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আলী কবীর : সমকালকেও শুভেচ্ছা।