পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পর্যটন দিবস পালিত হয়। এরই সঙ্গে পর্যটনকে কেন্দ্র করে ইউএনডব্লিউটিও 'বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২১'-কে বিশেষভাবে 'অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে পর্যটন' স্বীকৃতিতে আখ্যায়িত করেছে। এই সেক্টরটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের একটি স্বীকৃত স্তম্ভ, যা বিশেষভাবে দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য হ্রাসকরণ, লিঙ্গ সমতা নিশ্চিতকরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য নিয়োজিত থাকে। পর্যটন খাতের ভূমিকা বর্তমানে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক, যা বিভিন্ন গোষ্ঠী, লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম এবং বিভিন্ন সেক্টর যেমন- কৃষি, উৎপাদন শিল্প পরিষেবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে সহায়তা করে।

পর্যটন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বৃহত্তম, সম্ভাবনাময় এবং দ্রুত বর্ধনশীল খাত, যা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনবদ্য অবদান রেখেছে এবং একটি দেশের সার্বিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পর্যটন খাতের সম্ভাবনার ছোঁয়া লেগেছে প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যে ঘেরা আমাদের বাংলাদেশেও, যা অনন্য চোখ জুড়ানো আকর্ষণ যেমন পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশাল ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের অকৃত্রিম সৌন্দর্য, সিলেটের নৈসর্গিক সবুজ অরণ্য, হাওর অঞ্চলের সাগরসদৃশ বিস্তীর্ণ জলরাশিসহ অসংখ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দ্বারা বেষ্টিত। এসব আকর্ষণ ঘিরেই বাংলাদেশে রয়েছে পর্যটন বিকাশের অসীম সম্ভাবনা। তাছাড়া কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরপাড়ে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে পর্যটননগরী কক্সবাজারের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ঘেরা সবুজ প্রকৃতি নজর কাড়ে লাখো পর্যটকের। ঐতিহ্যবাহী ও রূপ-লাবণ্যে ঘেরা সবুজ-শ্যামল গ্রামগুলো খুলে দিয়েছে অপার সম্ভাবনাময় গ্রামীণ পর্যটনের দ্বার। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবেও বাংলাদেশে রয়েছে কৃষি পর্যটন প্রসারের সুযোগ ও বিপুল সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের সাতটি জেলার (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রায় ৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে ৪২৩টি হাওর নিয়ে হাওরাঞ্চল গঠিত। হাওরের কোল ঘেঁষে থাকা সীমান্ত নদী, পাহাড়, পাহাড়ি ঝরনা, নানা প্রজাতির বনজ, জলজ প্রাণী, হাওর-বাঁওড়ের হিজল, নলখাগড়া বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হাওরপাড়ে বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় হাজারো পর্যটক, যা হাওর পর্যটন বিকাশে খুবই ফলপ্রসূ। বাংলাদেশের এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রতি বছর অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটককে আকৃষ্ট করে। পর্যটকসংখ্যা বিশ্নেষণ করে জানা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন এবং প্রায় এক কোটি দেশীয় পর্যটক সারাদেশ ভ্রমণ করেন। পর্যটকের আনাগোনা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধিকে বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করে। পর্যটনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়। বিশ্বের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান অপরিসীম যা ১০ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৭ সালের মধ্যে ১১ দশমিক ৭ শতাংশে গিয়ে পৌঁছবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে পর্যটন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় এবং দেশীয় মূল্য সংযোজনের পাশাপাশি 'ওইসিডি'তে গড় জিডিপির ৪ দশমিক ১ শতাংশ, কর্মসংস্থানের ৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং পরিষেবা রপ্তানির ১ দশমিক ৩ শতাংশ খাতে সরাসরি অবদান রাখছে। পর্যটন শ্রমবহুল খাত হিসেবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে, যা সংখ্যায় প্রায় ২৪ লাখ ৩২ হাজার।

বিখ্যাত বিশ্নেষক হ্যাম্পটন এবং জিয়াচেয়া (২০১২) সর্বপ্রথম পর্যটনে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই প্রবৃদ্ধি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়, যা অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধায় ব্যাপক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে, যাতে সমাজের সব সদস্য অংশগ্রহণ করতে পারে এবং প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। তা ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির সুবাদে একটি দেশের অর্থনৈতিক অর্জন সবার মাঝে ন্যায়সংগতভাবে বণ্টন করা হয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করার জন্য পর্যটন সেক্টরকে অবশ্যই উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে হবে। তা ছাড়া টেকসই উন্নয়নের নীতি, কর্মসংস্থানের বিধান অনুসরণ এবং স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে শহুরে এবং গ্রামীণ উভয় এলাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে পর্যটন আরও ব্যাপকভাবে অবদান রাখতে পারে। প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য সমান সুযোগের অনুপস্থিতি দেশের মধ্যে বৈষম্যের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং নেতিবাচকভাবে অর্থনৈতিক বিকাশ ও উন্নয়নের সামগ্রিক গতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। পর্যটন খাতের দিক থেকে বলা যায়, গ্রামাঞ্চলে মানসম্মত রাস্তার অভাব শুধু স্থানীয় মানুষকে পর্যটন থেকে আয় করতে বাধা দেয় না বরং পর্যটন খাতকে প্রসারিত হতেও বাধা দেয়। এর মানে হলো, পর্যটন সুযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতার প্রভাব এবং এই সুযোগগুলোতে প্রবেশাধিকার যৌথভাবে বিশ্নেষণ করা প্রয়োজন। পর্যটন খাতের অবকাঠামোতে সমানাধিকার বর্ধিত এবং সম্ভাবনাময় সুযোগ তৈরি করতে পারে। শুধু তাই নয়, পর্যটন সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশগত মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং সুরক্ষিত অঞ্চলের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাহায্য করতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যটনের বিকাশ এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় সরকার, নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গবেষকদের উল্লেখযোগ্য মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সংশ্নিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতায় পর্যটনে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি প্রচেষ্টা সফল হতে পারে। বিশ্বজুড়ে পর্যটন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে পর্যটনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, পর্যটন অনেক উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। পর্যটন কাজে নিয়োজিত হওয়ার মাধ্যমে বেকারত্বের হার হ্রাস পায়, যা আয় বৈষম্য ও দারিদ্র্যের মাত্রাও হ্রাস করে। ফলে অর্থনীতিতে পর্যটন উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট উপায় খুঁজে বের করতে হবে। যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং আয় বৈষম্য ও দরিদ্রতা হ্রাস পায়। পর্যটকদের জন্য একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ প্রদান, দেশের পর্যটন আকর্ষণের জায়গাগুলোতে গ্রামীণ উন্নয়ন নিশ্চিত করা, পর্যটন প্রাপ্তিগুলোর অব্যবস্থাপনা এড়াতে দুর্নীতি কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এটি অর্জন করা যেতে পারে। তদুপরি, এ উদ্দেশ্যে এমন নীতি চালু করতে হবে, যা আন্তঃদেশীয় সংযোগকে শক্তিশালী করবে এবং পর্যটনকে বাড়িয়ে তুলবে ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে পর্যটনের সম্ভাবনাকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরবে। সর্বোপরি, পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সুপরিকল্পিত নির্দেশনা প্রদান এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পর্যটন খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

বিগত এক দশকে পর্যটন শিল্পের জন্য অনেক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড গঠন তার মধ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তা ছাড়া পর্যটন শিল্পের বিকাশে দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন স্থাপনার উন্নতি সাধন করা হয়েছে। পর্যটন শিল্পের জন্য তৈরি করা হচ্ছে মহাপরিকল্পনা, যা করোনা মহামারির জন্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন করছেন। বাংলাদেশকে একটি পর্যটনসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় উন্নত বিশ্বের আদলে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটসহ দেশের পর্যটন এলাকাতে নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালু আছে। এর মধ্যে দেশের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ তৈরির পরিকল্পনা আছে বলে জানা যায়। এসব পরিকল্পনা পর্যটন শিল্পের জন্য ইতিবাচক দিক। তবে এর সুফল পেতে হলে আমাদের স্বাভাবিক ও করোনামুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। করোনাকালে সংকট উত্তরণে এখন সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে পর্যটনে সম্পৃক্ত সবাই টিকে থাকতে পারেন। একমাত্র সুপরিকল্পনা, সঠিক বাস্তবায়ন ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দই পারে বাংলাদেশের পর্যটনকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে।

অধ্যাপক; সাবেক চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়