এতদিন দেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে আমাদের তেমন মাথাব্যথা ছিল না। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, চিকিৎসাসেবা খোলাবাজারের পণ্য। টাকার বিনিময়ে এর প্রাপ্তিযোগ।

যাদের টাকার জোর আছে অর্থাৎ উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা ব্যামো সারাতে লন্ডন, নিউইয়র্ক, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, দিল্লি, চেন্নাই, কলকাতা প্রভৃতি স্থানে যাবেন। এমনকি সর্দি-কাশি হলেও ওইসব স্থানে উড়ে যাবেন। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়াটাই যেন আভিজাত্য!

মধ্যবিত্তের যে অংশ বিদেশে যেতে পারছে না, তারা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। মধ্যবিত্ত কেউ সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলে সমগোত্রীয়রা নাক সিটকান। বলেন, কী নোংরা! ওখানে কি চিকিৎসা হয়?

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা হোক আর নাই হোক; স্বল্প আয়ের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্য সেটিই ভরসা। রাজধানীসহ সারাদেশের সরকারি হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা রোগীতে ঠাসা। ধারণক্ষমতার চেয়ে দুই-তিন গুণ রোগী ভর্তি হয়। তবে এসব রোগীর একাংশ ভালো চিকিৎসার প্রত্যাশায় বা দালালের খপ্পরে পড়ে প্রাইভেট হাসপাতালে চলে যায়। ঘরের আসবাবপত্র বেচে, জমি-ক্ষেত বন্ধক দিয়ে, ধারকর্জ করে প্রাইভেট হাসপাতালের খরচ জোগায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চিকিৎসক মহোদয় দিনে যে রোগীকেই সরকারি হাসপাতালে দেখতেন, রাতে সেই রোগীকে প্রাইভেট হাসপাতালে অপারেশন করেন।

একবাক্যে বলা চলে, চিকিৎসাসেবা পেতে চাই কেবলই টাকা। টাকা আছে, উন্নত চিকিৎসা আছে। টাকা নাই- সে দ্বার বন্ধ। কভিড-১৯ এর থাবা এই প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করল। বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কভিডে আক্রান্ত ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বিদেশে যেতে পারলেন না। দেশের চাকচিক্যময় প্রাইভেট হাসপাতালে যাবেন, সে সুযোগও নেই। অনেক প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক কভিড আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যায়। অগত্যা ধনী-দরিদ্র সবার ভরসাস্থল হয়ে ওঠে পাবলিক হাসপাতাল, যাকে আমরা সরকারি হাসপাতাল বলি।

সরকারি হাসপাতালের দিকে ওপরমহলের তেমন মনোযোগ ছিল না। নজরদারিও ছিল না। এসব হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিছু লোকের লুটপাটের ক্ষেত্র। উচ্চমূল্য দেখিয়ে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি আমদানি করে কিংবা বহুগুণ চড়ামূল্যে আসবাব, পর্দা, বালিশ, থালাবাসন ইত্যাদি সরবরাহ করে বহুজন আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। ওই অপকর্মের সহযোগী একজন মালেক ধরা পড়েছেন। বহু 'মালেক' ঘাপটি মেরে রয়েছে। আর মালেকের স্রষ্টারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। কভিড রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা ও সার্টিফিকেট কেলেঙ্কারিতে সাহেদ-সাবরিনা ধরা পড়েছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের যে কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব কেলেঙ্কারি-দুর্নীতি ঘটেছে, তারা কোথায়? দু-একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওইটুকুই।

করোনা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে- চূড়ান্ত বিচারে সব মানুষের ভরসার জায়গা সরকারি হাসপাতাল। সরকারি হাসপাতালের বিকল্প ভালো সরকারি হাসপাতাল। এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে অব্যবস্থা আর সীমাহীন দুর্নীতি, যা কঠোর হস্তে দমন করতে পারলে, নিয়ম-কানুন জোরদার করলে এসব হাসপাতাল জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা দিতে পারে।

সরকার বলছে, দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতিতে তারা অটল। সম্প্রতি সরকার পাবলিক হাসপাতালের দুর্নীতি-কেলেঙ্কারির হোতা সাহেদ-সাবরিনাদের গ্রেপ্তার করেছে। কোনো কোনো বিভাগীয় কর্মকর্তার সংশ্নিষ্টতা খতিয়ে দেখছে। তবে কেবল বিভাগীয় তদন্ত করলে চলবে না। দুর্নীতিবাজ আমলাদের আদালতে সোপর্দ করতে হবে। অযোগ্য আর অথর্ব; যারা বলে, কে যেন আমার হাতে তামাক খেয়ে গেছে! তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে।

দুর্নীতি মোকাবিলায় দরকার কড়া নজরদারিও। এ জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে মনিটারিং সেল গঠন করা যেতে পারে, যারা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে হাসপাতাল পরিদর্শন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করবেন। পাশাপাশি জনগণকেও অবহিত করবেন। এমনই বহুমুখী নজরদারি ছাড়া দুর্নীতির লাগাম টানা যাবে না। আর একটি স্পর্শকাতর বিষয় না বলে পারছি না। সেটি হলো, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের একাংশের অমনোযোগের কারণ প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি ও প্রাইভেট প্র্যাকটিস। জানি, কোনো রাজনৈতিক সরকার এটি বন্ধ করার কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, ভাববেও না। ভেবেছিলেন স্বৈরশাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করতে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তখন আমরা সবাই এর বিরোধিতা করেছি, এরশাদকে গালি দিয়েছি। আজ মনে হয়, এটি ছিল যৌক্তিক পদক্ষেপ। তা ব্যর্থ হলেও প্রশংসা তার প্রাপ্য। আমি মনে করি, চিকিৎসকদের বেতন, ওভারটাইম, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি আরও অনেক বাড়িয়েও যদি এটি করা সম্ভব হয়, তবে তা হবে চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে মাইলফলক।

সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থারও বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে চিকিৎসাসেবা। সরকার উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স করেছে; তৃণমূলে কমিউনিটি ক্লিনিক করেছে। এসব নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। এ জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বিশেষায়িত হাসপাতাল ঢাকাতেই; অন্য কোথাও নেই। যৌক্তিক প্রয়োজনেই প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরে; পর্যায়ক্রমে বৃহত্তর জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে। এ জন্য চাই স্বাস্থ্য খাতে আরও বরাদ্দ। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে কম। বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে বার্ষিক বরাদ্দ জিডিপির শতকরা এক/দেড়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যেখানে ভারতে জিডিপির ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ (২০১৮) এবং নেপালে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ (২০১৮)।

এ প্রসঙ্গে কেউ বলতে পারেন, যে টাকা বরাদ্দ হয়, তা ব্যয় করার সক্ষমতা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেই। প্রতি বছরই বরাদ্দকৃত টাকা ফেরত যায়। এর কারণ অনুসন্ধান করেছি। একজন অভিজ্ঞ স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তার কথা- টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফন্দিফিকির করতেই সময় চলে যায়। তাই মেয়াদের মধ্যে সব টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয় না।

স্বাস্থ্য খাতের জন্য যেমন ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো দরকার, তেমনি দরকার সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের। আমাদের ভুললে চলবে না, সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সাংবিধানিক নির্দেশ। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে অন্যান্য মৌালিক অধিকারের সঙ্গে চিকিৎসাসেবায় রাষ্ট্রের অঙ্গীকার রয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৮-তে বলা হয়েছে- 'জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন।' আর জনস্বাস্থ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ চিকিৎসাসেবা। রাষ্ট্র এ দায়ভার বহনে অস্বীকার করতে পারে না। এর মানে এই নয় যে, প্রাইভেট চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকবে না। আজকের বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় আয়োজনের পাশাপাশি প্রাইভেট চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিক এ থেকে অর্থ উপার্জন করবে, তা নিয়ে আপত্তি করছি না। তবে প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকেও হতে হবে মানবিক। আর দশটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো কেবল মুনাফাভিত্তিক নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও মানবিক দায়-দায়িত্বের উল্লেখ রয়েছে। বাস্তবে আমরা কী দেখি? কোনো কোনো প্রাইভেট হাসপাতালের গেট থেকে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, সরকারি হাসপাতালে যান। সেখানে আগাম পেমেন্ট ছাড়া মুমূর্ষু রোগীকেও অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় না। আপনি যতই বলুন; টাকা আনতে গ্রামে লোক পাঠিয়েছি, আজ ব্যাংক বন্ধ- কাল ব্যাংক খুললেই টাকা দেব, অ্যাডভান্স চেক নিন। রোগীর স্বজনদের এমন আকুতি-মিনতিতেও কোনো কাজ হয় না।

আরও একটি বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়বহুল। ব্যাংকক-চেন্নাইয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন, এমন বহু রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছে খরচের কথা শুনেছি। বাংলাদেশের প্রাইভেট হাসপাতালের চেয়ে সেখানে চিকিৎসা ব্যয় বেশ কম। সেখানকার পরিবেশও মানবিক। সময়মতো টাকা পরিশোধ না করতে পারলে অপারেশন বন্ধ থাকে না। চেন্নাইয়ে চিকিৎসা নেওয়া এক ব্যক্তির কাছে শুনেছি, চেন্নাইতে তিনি টাকা হারিয়ে ফেলেছিলেন। টাকা সময়মতো পরিশোধ না করতে পারলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার চিকিৎসা বন্ধ রাখে না। চিকিৎসা শেষে লোকটি দেশে ফিরে হাসপাতালের পাওনা টাকা পাঠিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গক্রমে, ২০১৩ সালে ভারত সরকারের বদৌলতে আমরা বাংলাদেশের একটি সাংবাদিক দল বেঙ্গালুরুতে দেবী শেঠির নারায়ণন হৃদয়ালয় হাসপাতাল পরিদর্শন করি। ওই দলে শাহ হুসাইন ইমাম, আবুল মোমেন, সাইফুল আলম, সোহরাব হাসান, সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, পীর হাবিব, শাহীন রেজা নূর, রেজানুর রহমান রাজা, মাসুদ কামাল, মুজতবা দানিশ ও এস এম আকাশ ছিলেন। শেঠি ভারতের বাইরে থাকায় তার সঙ্গে দেখা হলো না। হাসপাতালের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের কথা হয়। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ভারতের অন্যান্য হাসপাতালের সঙ্গে আপনাদের পার্থক্য কী? তিনি বলেছিলেন, ভারতের বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতাল ধনীদের জন্য তৈরি হয়েছে। কখনও কখনও সেসব স্থানে গরিব মানুষের চিকিৎসা হয়। আর নারায়ণন হৃদয়ালয় গরিবদের জন্য তৈরি হয়েছে; ধনীরাও এখানে চিকিৎসার সুযোগ পান। ভদ্রলোক গড়গড় করে বলে গেলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিনা খরচে বা সুলভে কতজন হতদরিদ্র, সাহিত্যিক, শিল্পী, খেলোয়াড়ের চিকিৎসা করিয়েছেন। যার মধ্যে বাংলাদেশের কিছু নামও ছিল। সে যাই হোক, বাংলাদেশের কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি কি গরিবদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়তে পারেন না? যেমনিভাবে সেবার ব্রত নিয়ে রণদাপ্রসাদ সাহা গড়েছিলেন মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতাল।

আবারও বলতে চাই, সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসার মূল দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। চিকিৎসাসেবা খোলাবাজারের ওপর ছাড়লে সবার জন্য স্বাস্থ্য পরিণত হবে কেবলই স্লোগানে।

সাংবাদিক ও লেখক
ask_bangla71@yahoo.com