তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের এ সময়ে ডিজিটাল জীবনযাত্রায় বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এগোলেও তা কাঙ্ক্ষিত নয়। শনিবার সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশ্বিক নানা সূচকে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার চিত্রই স্পষ্ট। তবে অস্বীকার করা যাবে না, আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী এমনকি ডিজিটাল সংযোগের অগ্রগতিও সন্তোষজনক। কিন্তু মানসম্পন্ন ডিজিটাল জীবনযাত্রা বলতে যে নির্দেশক রয়েছে, সেখানে অগ্রগতি নেই। ই-গভর্ন্যান্স, মোবাইল ইন্টারনেটের গতি, ই-নিরাপত্তা প্রভৃতি ক্ষেত্রে দেশ পিছিয়ে আছে। আমরা জানি, বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ডিজিটালের ছোঁয়ায় অনেক খাতই এগিয়ে গেছে। তাতে মানুষের জীবনযাত্রাও বদলেছে। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সর্বত্র মানুষ এখন মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে; দেশ-বিদেশে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে যেমন কথা বলছে, তেমনি প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করছে। ইন্টারনেট মানুষের জীবন-জীবিকারও অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

আমরা দেখেছি, সরকার করোনা মহামারির টিকা নিবন্ধনে বিশেষ ওয়েবসাইট করেছে। ইতোমধ্যে অনলাইনে গিয়ে অন্তত দেড় কোটি মানুষ নিবন্ধন করেছে। করোনা সংক্রমণের সময় ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশের অনেকে ঘরে থেকেই অফিস করতে পেরেছেন। গ্রামের কৃষকও ডিজিটাল কৃষির ছোঁয়ায় তাদের সমস্যা নিমেষে সমাধান করতে পারছে। তারপরও ডিজিটাল জীবনমানে বিশ্বের সূচকে বাংলাদেশ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারছে না। প্রশাসন হয়তো ভাবছে, দেশ ডিজিটাল সেবায় এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু বিশ্ব যে এ ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে যাচ্ছে, সেদিকেও দৃষ্টি রাখা চাই। দেশে ইন্টারনেটের গতি নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। ইন্টারনেটের সূচকে সবচেয়ে বেশি মানুষ যে ধরনের ইন্টারনেট ব্যবহার করে তার গতি আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের বেশি সংখ্যক মানুষ ব্যবহার করে মোবাইল ইন্টারনেট। কিন্তু সেই গতিতে আদর্শ মানদণ্ড নিশ্চিত হচ্ছে না। এমনকি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের বিস্তৃতি এবং সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রেও সঠিক পরিকল্পনা হচ্ছে না। দেশের মোবাইল ফোন অপারেটররাও এ ক্ষেত্রে কতটা আন্তরিক, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ইন্টারনেট প্যাকেজের নামে মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে উচ্চমূল্য নিলেও অভিযোগ রয়েছে, ইন্টারনেট সেবার মান অত্যন্ত নিম্ন। ইন্টারনেটে ফোরজি বলা হলেও বাস্তবে দেশের অধিকাংশ স্থানেই ফোরজি নেই। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, সরকার তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত বেশকিছু প্রকল্প গ্রহণ করলেও ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতিতে তা কাজে আসেনি। বিপুল ব্যয়ে ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার হলেও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা হয়নি। আবার উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণের জন্য কয়েকটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তার বাস্তব সুফল কতটুকু, তা নিয়ে কখনোই কোনো পর্যালোচনা হয়নি। সরকারি সব সেবা ডিজিটালি সেভাবে চালু হয়নি।

অনলাইনে উল্লেখযোগ্য সেবা চালু করা হলেও শেষ পর্যন্ত মানুষকে সেই দপ্তরের সামনে গিয়েই দীর্ঘ লাইন দিতে হয়। ই-টেন্ডার ব্যবস্থাও এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সফল হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ই-গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রে মৌলিক জায়গাগুলোতেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়ন থেকে আরও কয়েক বছর আগে ই-নিরাপত্তার জন্য সব দেশে ইন্টারনেট প্রটোকল আইপিভি-৬ ব্যবহার করতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

সে অনুযায়ী প্রতিবেশী ভারত ৭১ শতাংশ ও ভুটান ৬ শতাংশ অর্জন করলেও বাংলাদেশ মাত্র দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে! এটা সত্য, প্রশাসনের সর্বত্র ডিজিটালের ব্যবহার স্বচ্ছতা ও জবাবাদিহিতা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ডিজিটাল জীবনযাত্রা নিশ্চিতে সরকারের সদিচ্ছার অভাব নেই। কিন্তু নীতিগত সদিচ্ছা মাঠ পর্যায়ে প্রতিফলিত হচ্ছে না। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে আমরাও বলতে চাই, এখন প্রয়োজন ডিজিটাল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হওয়া এবং দক্ষতা অর্জন করা। আমরা প্রত্যাশা করি, ব্যক্তি, সমাজ ও প্রশাসনের সব পর্যায়ে ডিজিটালের যথাযথ ব্যবহার হোক। ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধিসহ অন্যান্য সাময়িক সমস্যা কাটিয়ে উঠলেই ডিজিটাল জীবনযাত্রায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লাভ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এ জন্য একটু পা চালিয়ে চলতে হবে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়- একটু পা চালিয়ে, ভাই, একটু পা চালিয়ে।