তথ্য আমার অধিকার, জানা আছে কি সবার- যাত্রা শুরুর এক যুগ পূর্তিতে এই স্লোগান দেখে পাঠক মাত্রই আত্মসমালোচনা করার এবং আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেবেন। নিঃসন্দেহে এক যুগেও দেশের তাবৎ জনগণ তথ্যে তার অধিকার বা মালিকানা সম্পর্কে জানতে পারেনি, যারা জানে তাদের অনেকেই স্পষ্ট বুঝে না, বুঝলেও তার জীবনমান উন্নয়নে তা প্রয়োগ করে না বা করতে পারে না। এখনও সাধারণের ধারণা, তথ্যের মালিক রাষ্ট্র বা সরকার তথা আইনের ভাষায় কর্তৃপক্ষ। এটা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বিষয়, সর্বসাধারণ জানবে ততটুকুই, কর্তৃপক্ষ যতটুকু যেভাবে জানাবে। আবার অনেকের ধারণা, এগুলো উন্নত বিশ্ব বা পশ্চিমাদের বিষয়। অন্যদিকে তথ্য যারা দেবেন বা যাদের কাছে জনগণের তথ্য আছে তাদের অনেকের এক যুগেও তথ্য গোপন রাখার সংস্কৃতি বা মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি, গোপনীয়তার বেড়াজালে আটকে আছেন।
২০০২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ২৮ সেপ্টেম্বর তথ্য জানার অধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে ইউনেস্কো এবং ২০১৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক দিবসটি 'আন্তর্জাতিক সর্বজনীন তথ্যে অভিগম্যতা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে দেশে দেশে পালিত হচ্ছে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য- সব মানুষের তথ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণ। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ পাসের মাধ্যমেই সকল নাগরিকের তথ্য চাওয়া, পাওয়া, প্রয়োজনীয় সকল তথ্যে সাবলীল প্রবেশের এবং এর প্রয়োগে উপকারভোগী হওয়ার আবশ্যিক ও আইনি স্বীকৃতি লাভ করেছে। তথ্যের অবাধপ্রবাহ সৃষ্টি ও জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়নের পথ রচিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্র বিকাশের পথ সুগম হয়েছে। তাই যুগপূর্তিতে এর বাস্তবায়ন নিয়ে চুলচেরা বিশ্নেষণ জনস্বার্থেই প্রয়োজন।
১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয় এবং সংবিধানে জনগণকে সকল ক্ষমতার মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সংবিধানে মানুষের সকল মৌলিক অধিকারের সঙ্গে ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার অধিকার তথা তথ্য অধিকারকে নাগরিকের অন্যতম মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংবিধানের সে শক্তিতে ভর করে পরবর্তীকালে তথ্য অধিকার বিষয়ে আইনের খসড়া তৈরি হয়। ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তথ্য অধিকার আইনটি পাস করে, গেজেট প্রকাশ ও কার্যকর এবং কমিশন গঠন করা হয়।
তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ একটি আধুনিক, অনন্য ও প্রাগ্রসর আইন। এই আইনের মাধ্যমে জনগণ কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে; কর্তৃপক্ষের কাজের, সেবার ও বাজেটের হিসাব চায়। আইনটির বাস্তবায়নে যথেষ্ট ইতিবাচক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। অর্জনও নেহায়েৎ কম নয়। তথ্য প্রাপ্তি, সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, প্রকাশ, প্রচার, অভিযোগ দায়ের, নিষ্পত্তি ইত্যাদি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রায় সকল বিধি, প্রবিধি, নির্দেশিকা, সহায়িকা ইত্যাদি প্রণীত হয়েছে। সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষে ৪২ হাজার ৪৫০ জন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ সকল কার্যালয়ে বিকল্প দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আপিল কর্মকর্তা নিয়োজিত হয়েছেন। তথ্য কমিশন থেকে কেন্দ্র ও সকল জেলা ছাড়াও শুধু উপজেলা পর্যায়েই জনউদ্বুদ্ধকরণ অনুষ্ঠান ৫০৪টি, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ৫০৬টি এবং যথেষ্ট সংখ্যায় মতবিনিময় সভা, সেমিনার সম্পন্ন হয়েছে। তথ্য কমিশন ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি সংস্থা, সংবাদমাধ্যম ও জাতীয় সকল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
জনগণের তথ্য অধিকার বাস্তবায়নে সরকার সকল শ্রেণিপেশার ব্যক্তির সমন্বয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা অর্থাৎ চার স্তরে কমিটি গঠন করে দিয়েছে। তাছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি মন্ত্রণালয়/বিভাগ 'অ্যানুয়াল পারফরম্যান্স অ্যাগ্রিম্যান্ট' বাস্তবায়নে বাধ্যতামূলকভাবে জনগণের তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার আওতায় তথ্যে অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতকরণে তৃণমূল পর্যন্ত ইন্টারনেটের সমন্বিত নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা, শক্তিশালী মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন, অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রামের আওতায় সারাদেশে স্থাপিত প্রায় ৫০০০ ইউনিয়ন/পৌর ডিজিটাল সেন্টার তৃণমূলে তথ্য সেবা দিচ্ছে। তথ্য প্রাপ্তি, সহজ ও নিশ্চিতকরণে ওয়েবসাইট স্থাপন ও সিটিজেন চার্টার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখন তাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ওয়েবপোর্টাল রয়েছে। স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের সকল মাধ্যমকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
করোনা সংকটের শুরুতেই তথ্য কমিশন ভার্চুয়াল শুনানি কার্যক্রম গ্রহণ করে এবং এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। কোনো পক্ষকেই ঢাকায় তথ্য কমিশনে সশরীরে হাজির হওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। এতে অর্থ বা সময় যেমন সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি বিড়ম্বনা এড়ানো যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে তথ্য কমিশনে ১৭১টি অভিযোগের শুনানি সম্পন্ন হয়েছে, তার মধ্যে ১৬৪টি অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ কার্যক্রমকে আরও বেগবান করা হবে এবং সকল স্তরেই চালু করা হবে।
তৃণমূল থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের সম্মানিত জনপ্রতিনিধি কর্তৃক সকল শ্রেণিপেশার লোকজনকে নিয়ে জনগণের তথ্য অধিকার বাস্তবায়নকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারলে তথ্যে সর্বজনীন অভিগম্যতা দ্রুত নিশ্চিত হবে। এতে সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে; রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ রচিত হবে, আস্থার সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সকল প্রতিষ্ঠান আরও সুসংহত হবে।
প্রধান তথ্য কমিশনার, তথ্য কমিশন