সমুদ্রভিত্তিক 'ব্লু ইকোনমি' তথা সুনীল অর্থনীতির 'বিপুল সম্ভাবনা' নিয়ে কথাবার্তা কম দিন ধরে চলছে না; কিন্তু সেই সম্ভাবনা যে এখনও 'দক্ষ জনবলের অপেক্ষা' করে আছে, সোমবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এই তথ্য আমাদের হতাশ না করে পারে না। সুনীল অর্থনীতির সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে যে গবেষণা বিলম্বে হলেও শুরু হয়েছে, তাও সীমিত রয়েছে চট্টগ্রাম থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত উপকূলীয় পর্যায়ে। এমনকি সমুদ্র গবেষণা উপযোগী জাহাজ থাকার মতো নূ্যনতম সক্ষমতার অভাবে বিস্তৃত মহীসোপান থেকে একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত গবেষণা শুরু করা যাচ্ছে না। অথচ ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পরপরই এসব বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত ছিল। স্বীকার করতে হবে যে, খোদ সমুদ্রসীমা ও সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়েই পূর্ববর্তী বিভিন্ন সরকার উদাসীন ছিল।

আজকের যে জনবল সংকট, তার মূলে রয়েছে সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষাগত ঘাটতি। এক্ষেত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শিতার প্রশংসা করতেই হবে। স্বাধীনতার পর মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেশে একটি সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ পটপরিবর্তনের পর পরবর্তী ২১ বছর বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করলে সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় প্রকল্প গ্রহণ করেন। সরকার পরিবর্তন হলে সম্ভাবনাময় বিষয়টি ফের তিমিরেই চলে যায়।

স্বীকার করতে হবে, আগের বিভিন্ন সরকারের ঔদাসীন্যে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি করার মতো মৌলিক কাজটিও দশকের পর দশক অনিষ্পন্ন ছিল। কিন্তু ওই বিরোধ নিষ্পত্তির পরও আমরা কাঙ্ক্ষিত গতি আনতে পারছি না কেন? এই প্রশ্নের জবাবও আমাদের পেতে হবে যে, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে নীতিগত ও কারিগরি সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্ত্বেও উদ্যোগটির ধীরগতি কেন? বিলম্বে হলেও ২০১৭ সালে সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হয়েছে, স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এখনও গবেষণায় নেমে পড়তে না পারার বিষয়টি হতাশাজনক। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও বরাদ্দের যে সংকটের কথা সংশ্নিষ্টরা বলছেন, তা মেনে নেওয়া কঠিন। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারের বিষয়টি এভাবে নিছক বিনিয়োগ ও বরাদ্দের অভাবে মাথা কুটে মরবে, আমাদের বিশ্বাস হয় না।

মনে রাখতে হবে, সমুদ্রসম্পদ ও সুনীল অর্থনীতিবিষয়ক গবেষণা নিছক জ্ঞানগত উৎকর্ষের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যেমন রয়েছে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সংরক্ষণ ও আহরণ, তেমনই রয়েছে বিস্তৃত সমুদ্র এলাকা থেকে তেল-গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধানের বিষয়। এর কৌশলগত তাৎপর্যও ভুলে যাওয়া চলবে না। বলা বাহুল্য, এসব সম্ভাবনা বহুল আলোচিত। আমাদের মনে আছে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরেই ঢাকায় অনুষ্ঠিত ভারত মহাসাগরের অংশীদারিত্ব বিষয়ক এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। সমুদ্রসম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ গোটা অঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার তাগিদ তিনি আরও একাধিকবার দিয়েছেন। কিন্তু খোদ দেশের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগই যদি গতি না পায়, তাহলে তো সকলই গরল ভেল! এও ভুলে যাওয়া চলবে না, সুনীল অর্থনীতির সুফল ঘরে তুলতে যৌথ উদ্যোগ জরুরি। এটাও ঠিক যে, অন্যান্য অঞ্চল থেকে এই অঞ্চল খানিকটা পিছিয়ে।

সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে উঠে আসা চিত্র দেখে আমাদের আশঙ্কা, বাংলাদেশ এই অঞ্চলের মধ্যেও সবচেয়ে পিছিয়ে। যদি এখনও আমরা সজাগ ও সক্রিয় না হই, তাহলে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বা যৌথ উদ্যোগেও আমরা পিছিয়ে পড়ব। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা বারংবারই বলেছি- আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমুদ্রসীমা কেবল আত্মবিশ্বাস বাড়ায় না, সম্ভাবনারও সোনালি রেখা হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ সেই সোনালি রেখার সামনে দাঁড়িয়ে। এখন প্রয়োজন কেবল সঠিক পরিকল্পনা ও সুচারু বাস্তবায়ন। বিলম্বে হলেও সেটাই দেখতে চাই। বেলা বয়ে যাচ্ছে।