চীনে কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়েছিল ১৯২১ সালের ১ জুলাই। সদস্য সংখ্যার হিসাবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, যারা ১৯৪৯ থেকে একচেটিয়া চীনের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তাদের নেতৃত্বেই চীন আজ স্বমহিমায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এক সমাজতান্ত্রিক ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে বিরাজমান। এ সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো, কমিউনিজমকে চীনের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে একাত্ম করা এবং সমাজতন্ত্রের সঙ্গে পুঁজিবাদের মেলবন্ধন ঘটানো। বিগত কয়েক দশক ধরে কমিউনিস্ট সরকারের দ্বারা সমাজের সর্বস্তরের অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনমানের ব্যাপক উন্নতি হলেও সরকারবিরোধী যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনকেই কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। সে কারণে বহির্বিশ্বে চীনের কমিউনিস্ট সরকার অত্যাচারী শাসকের তকমা এখন পর্যন্ত ছাড়তে পারেনি।

কভিড নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব চীনের বিরুদ্ধে যেভাবেই প্রোপাগান্ডা চালাক, চীন শুধু কভিডকে জয় করেছে তা-ই নয় বরং সারা বিশ্বের ব্যবসা যখন কভিডের আঘাতে জর্জরিত, তখন চীন একহাতে সারা বিশ্বে দাপিয়ে ব্যবসা করেছে। কভিড তাই তাদের কাছে অভিশাপ না হয়ে বাণিজ্যে বসতি অনুসর্গ হয়েই ধরা দিয়েছে। গত জুনের শেষ দিকেই জানা গেল, চীনে গত চার বছরে আর ম্যালেরিয়া রোগী দেখা যাচ্ছে না। ২০২১ সালের মে মাসে সরেজমিন তদন্ত করে ম্যালেরিয়া এলিমিনেশন সার্টিফিকেশন প্যানেল। স্বাধীন এই সংস্থার সুপারিশ মেনে স্বীকৃতির সার্টিফিকেট ইস্যু করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। শাসক দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষের সমারোহে যুক্ত হলো আর একটু নতুন রং।

তিন দশকের মধ্যে এই প্রথম পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশকে এমন স্বীকৃতি দেওয়া হলো। এর আগে ১৯৮১ সালে অস্ট্রেলিয়া, ১৯৮২ সালে সিঙ্গাপুর এবং ১৯৮৭ সালে ব্রুনাই জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই কৃতিত্ব অর্জন করে। সারা বিশ্বের দিকে তাকালে ৪০টি দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যালেরিয়া মুক্তির স্বীকৃতি বর্ষিত হয়েছে। তবে আয়তনের দিক থেকে চতুর্থ, জনসংখ্যার দিক থেকে প্রথম এবং অতীতে নিষ্ঠুর ইতিহাসের সাক্ষী চীনের এ সাফল্যকে দেখতে হবে ভিন্ন চোখে। ১৯৪০-এর দশকে তিন কোটি ম্যালেরিয়া রোগী থেকে ৭০ বছরের মধ্যে আজ একটি রোগীও না থাকা নিঃসন্দেহে এক মহাকাব্যিক অর্জন। তাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রকল্প ছিল '৫২৩ প্রজেক্ট'। ১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে ম্যালেরিয়ার নতুন ওষুধ খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে দেশজুড়ে গবেষণা শুরু হয়। ৬০টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০০ বিজ্ঞানী যুক্ত হন এ কাজে। ৭০-এর দশকে আবিস্কৃত হয় কার্যকরী ওষুধ আর্টেমিসিনিন। ১৯৭২ সালে মূলত তু ইউইউর নেতৃত্বে এ ওষুধ আবিস্কার হয়।

চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের অনেক আগেই ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক মাখানো মশারির ব্যবহার শুরু করে। ১৯৮৮ সাল নাগাদ সে দেশে এমন ২৪ লাখ মশারি বিতরণ হয়েছিল। এর ফলে ম্যালেরিয়া রোগের প্রকোপ কমে আসে উল্লেখযোগ্যভাবে। মৃত্যুর পরিমাণ হ্রাস পায় প্রায় ৯৫ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ১-৩-৭ ফর্মুলাও প্রশংসিত হয়েছে। ম্যালেরিয়া রোগের শনাক্ত করতে হবে এক দিনের মধ্যে, তিন দিনের মধ্যে সংশ্নিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ম্যালেরিয়া নিশ্চিত করে রিপোর্ট দিতে হবে এবং সাত দিনের মাথায় আটকে দিতে হবে ছড়িয়ে পড়ার যাবতীয় সম্ভাবনাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৯ সালে বিশ্বে প্রায় ২৩ কোটি ম্যালেরিয়া রোগী ছিল এবং এর মধ্যে মৃত্যু হয় ৪ লাখ ৯ হাজার রোগীর। সংক্রমণের ৯৪ শতাংশই ঘটেছিল আফ্রিকায়। আফ্রিকায় চীনের বিনিয়োগ ১০ হাজার কোটি ডলারের এবং সেখানে বসবাসকারী চীনার সংখ্যা ৩০ লাখ। অন্যদিকে, শুধু চীনের গুয়াংদং প্রদেশেই লেখাপড়া ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে বাস করছে প্রায় সাড়ে চার লাখ আফ্রিকান। মানবসম্পদের এই বিনিময় চীনের বাণিজ্যে সোনা ফলাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার জন্য ম্যালেরিয়ার ভয়ও আছে তাদের। তার পরও তারাই পারল ২০২১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'নো ম্যালেরিয়া' সনদ লাভ করতে। কীভাবে সম্ভব হলো এমনটা? চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ উদযাপনের প্রাক্কালে নাগরিকদের উদ্দেশে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে শাসক দলের আর্জি ছিল- 'দলকে মেনে চলুন, ভদ্র আচরণ করুন'। সেই বার্তা নিয়ে ব্যানার আর বিলবোর্ডে সয়লাব হয়েছিল গলি থেকে রাজপথ। ১৯৮৩ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের বিক্ষোভ থেকে শুরু করে সম্প্রতি উহানে করোনার খবর ফাঁসের ঘটনা- বজ্র আঁটুনিতেই রেখেছে শাসকগোষ্ঠী পুরো চীনকে। আর এ মিশনেই জনস্বাস্থ্যে আনল ছকভাঙা ফর্মুলা, ম্যালেরিয়াকে নির্মূল করল চীন। দম্ভ করে ঘোষণা করে দিল- ম্যালেরিয়া শনাক্ত করতে হবে এক দিনে, ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা জানাতে হবে তিন দিনে, ছড়ানোর সম্ভাবনা আটকাতে হবে সাত দিনে। আর তেমনটাই করে দেখাল চীন।

কেন আমাদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা অবশ্যই বিশ্নেষণের দাবি রাখে। মশাবাহিত রোগ আমাদের দেশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে বহু বছর ধরেই। ম্যালেরিয়ার হাত থেকে আজও আমরা পরিত্রাণ পাইনি। গত কয়েক বছর ধরে নতুন করে যোগ দিয়েছে ডেঙ্গু। করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু আমাদের সমাজজীবনকে আছড়ে-পিছড়ে মারছে। প্রতি বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ডেঙ্গু হানা দেয়। প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, মানুষ সবাই হাহাকার করে; চিৎকার করে, হুমকি প্রদর্শন করে। তারপর প্রাদুর্ভাব একটু কমে গেলেই আবার সব চুপ হয়ে যায়। কিন্তু ডেঙ্গু আবার ঘুরে আসে। না আছে প্রতিকারে কোনো গবেষণা, না আছে স্থায়ীভাবে প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা। এমন অবস্থায় চীনের সেই ১-৩-৭ ফর্মুলার উদাহরণ প্রণিধানযোগ্য বৈকি!

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা; কলাম লেখক
ceo@ilcb.net