বিশ্বে নরপশুতুল্য মাফিয়াচক্রের কদর্য লোভ-লালসার নতুন সংস্করণ হচ্ছে মাদক আগ্রাসন। বিশ্বব্যাপী তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকাসক্তির পরিসংখ্যান ভয়ানক দৃশ্যাদৃশ্য পরিগ্রহ করেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। অতি প্রাচীনকাল থেকে সুরা বা মদপান-সুরাসক্তি সমাজে প্রচলিত রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত পান না করে সীমিত পরিসরে শারীরিক-মানসিক শক্তি-হতাশামুক্তি-আত্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উপায় হিসেবে এসব সুরা পানের প্রবণতা অতিশয় দৃশ্যমান ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এ সুরাপানের ধারাবাহিকতা মাদকের নেশায় পর্যবসিত হয়ে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সমস্যার কদাচাররূপ ধারণ করে। মানসিক চাপ হ্রাস-হতাশা থেকে সাময়িক মুক্তি-একঘেয়েমি অবস্থা থেকে পরিত্রাণ-আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার-সুখানুভূতি লাভে নেশা করার প্রাথমিক কৌতূহল থেকে মাদক ধীরে ধীরে অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে ধাবিত করে। নেশার মাত্রা বাড়িয়ে ক্রমান্বয়ে সকল সৃজনশীলতা ধ্বংস এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে মাদকের নেশা দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ করে। একবার যারা এই মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়; তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলেও এর থেকে পরিপূর্ণ উদ্ধার অসম্ভব ব্যাপার হিসেবে পরিগণিত।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সুদূর অতীতকাল থেকে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার চলমান রয়েছে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লুণ্ঠন বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কয়েকটি ফরমান জারি ও কিছু কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম আফিম চাষ-ব্যবসা শুরু করে। ১৮৫৭ সালে প্রথম আফিম আইন প্রবর্তন করে আফিম ব্যবসাকে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়। ১৮৭৮ সালে আফিম আইন সংশোধনে আফিম অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পর গাঁজা ও মদ থেকেও রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। ১৯৩০ সালে আফিম, মদ, গাঁজা ছাড়াও আফিম ও কোকেনের তৈরি বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যাপক প্রসার নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন সরকার 'দ্য ড্যানজারাস ড্রাগস অ্যাক্ট-১৯৩০' প্রণয়ন করে। একইভাবে সরকার আফিম সেবন নিয়ন্ত্রণের জন্য 'দ্য আফিম স্মোকিং অ্যাক্ট-১৯৩২' এবং ১৯৩৯ সালে 'দ্য ড্যানজারাস ড্রাগস রুলস' প্রণয়ন করে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলমানদের মদপান নিয়ন্ত্রণে ১৯৫০ সালে 'দ্য প্রহিবশন রুলস' তৈরি করা হয়। ১৯৫৭ সালে 'দ্য আফিম সেলস রুলস' প্রণীত হয়।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মদ-জুয়া-ঘোড়দৌড় ইত্যাদি অসামাজিক কুপ্রবৃত্তি নিধন করার লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালে দেশে উৎপাদিত মাদকদ্রব্য থেকে রাজস্ব আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন 'নারকটিকস অ্যান্ড লিকার পরিদপ্তর' প্রতিষ্ঠা করা হয়। আশির দশকে বিশ্বব্যাপী মাদকের অপব্যবহার-অবৈধ পাচার উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশেও এর প্রচণ্ড প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। উদ্ভূত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে মাদকের অপব্যবহার-অবৈধ পাচার রোধ, মাদকের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গণসচেতনতা, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-১৯৮৯' জারি করা হয়। ১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করে 'নারকটিকস অ্যান্ড লিকার পরিদপ্তর'-এর পরিবর্তে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে এখন পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদকের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই-দেশি-বিদেশি মদ, দেশি-বিদেশি বিয়ার, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টি.ডি জেসিক ইনজেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইনজেকশন), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন ইত্যাদি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে এলএসডি, ব্রাউনি, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, এমফিটামিন পাউডার, ডায়েমেখিল ট্রাইপ্টেমিন, এস্কাফ ও ম্যাজিক মাশরুমের মতো ভয়ানক আরও বেশকিছু মাদক। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল' এবং 'গোল্ডেন ক্রিসেন্ট'-এর মাঝামাঝি অবস্থানে হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে অরক্ষিত সীমান্ত পথে সবচেয়ে বেশি মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটে। অবৈধ মাদক আমদানির জন্য দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড কর্তৃক বিগত ১২ বছরে উদ্ধারকৃত মাদকের পরিসংখ্যান বিশ্নেষণে জানা যায়- ১২ বছরে উদ্ধার হওয়া মাদকের মধ্যে ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, গাঁজা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ, বিয়ার ও ইনজেক্টিং ড্রাগের প্রচলিত মূল্য অনুযায়ী টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১৪ হাজার ৩১৩ কোটি ৭৯ লাখ ৬২ হাজার ১৩০ টাকা। ওই সময়ে মাদক উদ্ধারে মামলা হয় মোট ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮২টি এবং আসামি করা হয় ১০ লাখ ১০ হাজার ৭১৮ জনকে।
গত ২৪ জুলাই জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) প্রকাশিত বিশ্ব মাদক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে বিশ্বে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ মাদক নিয়ে অসুস্থ হয়েছে এবং মাদক নিয়েছে ২৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। বিশ্বের কিছু অঞ্চলে বিগত ২৪ বছরের তুলনায় শুধু ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় গাঁজা সেবনের হার বেড়েছে চারগুণ। শুধু জনসংখ্যা পরিবর্তনের হিসেবেই ২০৩০ সালের মধ্যে মাদক ব্যবহারকারী ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দেশে প্রায় নিত্যই মাদকদ্রব্য ও মাদক কারবারিদের আটক করা হচ্ছে। এরপরও মাদকের আগ্রাসন বাড়ছে। মাফিয়া চক্রের অভিনব কায়দায় মাদক পাচারের দৃশ্যপট কল্পনাতীত ভয়ংকর থেকে ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। স্বল্প অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গা কিশোর-মহিলা-বিভিন্ন যানবাহনের ড্রাইভারসহ অন্যদের ব্যবহার করে ইয়াবাসর্বস্ব পলিথিন প্যাকেট গিলে পাকস্থলীতে-মলদ্বারে-বিভিন্ন সবজি পরিবহনে বিশেষ চেম্বার তৈরি থেকে শুরু করে নারীর অন্তর্বাসসহ নানা পণ্যের মধ্যে লুকিয়ে-বেদের ছদ্মবেশে নিত্যনতুন প্রক্রিয়ায় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক পাচার করে আসছে মাদক ব্যবসায়ীরা। অর্থলিপ্সু কদর্য চরিত্রের মাদক কারবারির অসহনীয় তাণ্ডবে জাতি সৃজন-মনন-সাংস্কৃতিক-মেধাবী মানবসম্পদ উন্নয়নে দ্রুত নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। অদম্য অগ্রগতিতে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ সমন্বিত কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে অচিরেই দেশ ধ্বংসের তলানিতে গিয়ে পৌঁছবে। সকল উন্নয়ন-অর্জনের গতিপ্রকৃতিকে স্বাভাবিক ধারায় প্রবাহিত করার লক্ষ্যে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে পরিপুষ্ট উদ্যমী-কর্মঠ-দক্ষ-যোগ্য কর্মবীরের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মাফিয়াচক্রের বিস্তৃত অপকৌশল-মাদক সেবনকারী-মাদকাসক্তের অপপ্রয়োগ নির্মূল-সংহার করার যথোপযুক্ত ব্যবস্থার সঠিক-প্রায়োগিক বাস্তবায়নে যেকোনো ধরনের শিথিলতা জাতিকে গভীর অন্ধকারের গহ্বরে নিক্ষিপ্ত করবেই- নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।
শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়