চলতি মাসের প্রথম দিন থেকে বাংলাদেশে বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ হওয়ার পর এর সমর্থনে দেশীয় গণমাধ্যম-সংশ্নিষ্টদের মধ্যে যে ঐকমত্য দেখা গেছে, তা স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। কারণ এতে দেশীয় চ্যানেল, সাংবাদিক ও কলাকুশলীদের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। বিদেশি চ্যানেলে সম্প্রচারিত বিজ্ঞাপনের বিপুল বাজার থেকে সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি চ্যানেলের দর্শকদের মধ্যে যদিও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে, বৃহত্তর স্বার্থে এর বিকল্প ছিল না বলে আমরা মনে করি।

আমরা অস্বীকার করি না যে, দেশীয় দর্শকদের মধ্যে বিদেশি বিনোদন, শিক্ষা, সংবাদ ও ফিচারমূলক টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর চাহিদা রয়েছে। দেশীয় চ্যানেলের গুণগত মান উন্নয়নেও প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রচার ব্যবস্থার প্রয়োজনও অনস্বীকার্য। কিন্তু এর জের ধরে দেশীয় চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না। বস্তুত সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো বিদেশি চ্যানেল 'বন্ধ' রাখার কথা বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, 'ক্লিনফিড' তথা বিজ্ঞাপনমুক্ত সম্প্রচার করতে। ফলে পরিস্থিতির দায় কেবল ও ডিটিএইচ অপারেটরদেরই নিতে হবে। এও মনে রাখতে হবে, এই সিদ্ধান্ত আকস্মিকভাবে আসেনি।

২০০৬ সালের 'কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন' অনুযায়ী বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য বিদেশীয় চ্যানেলের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন সম্প্রচার নিষিদ্ধ। তারপরও প্রায় দেড় দশক পর চলতি বছর এপ্রিলে সরকার আইনটি কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তখন কেবল ও ডিটিএইচ অপারেটরদের দাবির মুখে প্রক্রিয়াটি ছয় মাসের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে সরকারের দৃশ্যত 'কঠোর' অবস্থান সংগত। এখন বিদেশি চ্যানেলের বিজ্ঞাপনমুক্ত সম্প্রচারেই নিহিত রয়েছে সমাধান। এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশীরাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই বিদেশি চ্যানেলের 'ক্লিনফিড' সম্প্রচার নিশ্চিত করা হয়। একজন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিদ সমকালের সঙ্গে আলাপকালে যথার্থই প্রশ্ন তুলেছেন যে- ভারত, পাকিস্তান, নেপাল পারলে আমরা পারব না কেন?

অন্যান্য দেশের উদাহরণ আমলে নিয়ে কেবল ও ডিটিএইচ অপারেটরদেরই এই ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও উপকরণ আমদানি করতে হলে সরকারের উচিত হবে প্রণোদনা নিয়ে এগিয়ে আসা। এ ছাড়া বিদেশি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিদেশি বিজ্ঞাপনের বদলে দেশীয় বিজ্ঞাপনও সম্প্রচার করা যেতে পারে। তাতে করে যেমন কর্মসংস্থান তেমনই রাজস্ব আদায় বাড়বে। কিন্তু কোনোভাবেই এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসা উচিত হবে না। মনে রাখা জরুরি, পর্যাপ্ত বিজ্ঞাপনের অভাবে দেশীয় অনেক চ্যানেল সাংবাদিক, কর্মচারী ও কলাকুশলীদের উপযুক্ত ও নিয়মিত পারিশ্রমিক দিতে পারছে না। দেশীয় চ্যানেলের আয় ও বিজ্ঞাপনের বাজার ধরে রাখার স্বার্থেই নিতে হবে শক্ত অবস্থান। এর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা চাপ আসতেই পারে; কিন্তু দৃঢ় অবস্থান নিলে দীর্ঘমেয়াদে সব পক্ষই লাভবান হবে।

তবে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদেশি চ্যানেলগুলো যদি ইউটিউবের মতো 'বিকল্প' মাধ্যমে চলে যায়, তাহলে সকলই গরল ভেল! প্রসঙ্গক্রমে বিদেশি কলাকুশলী দিয়ে নির্মিত বিজ্ঞাপনচিত্র ডাবিং করে দেশীয় চ্যানেলে সম্প্রচার নিয়েও নতুন করে ভাবতে বলি আমরা। অতীতে বহুজাতিক পণ্যের বিজ্ঞাপন নির্মাণে দেশীয় কলাকুশলীর ব্যবহার দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। ডাবিং বিজ্ঞাপন যদি বন্ধ করা যায়, তাহলে কর্মসংস্থানের পুরোনো প্রবাহ ফিরে আসতে পারে। দেশীয় সংবাদমাধ্যমের আধেয় ব্যবহার করে গুগল কিংবা ফেসবুকের মতো অনলাইন প্ল্যাটফরমগুলোর দেশীয় বিজ্ঞাপন আকর্ষণের যে ধারা সাম্প্রতিক সময়ে প্রবল হয়ে উঠেছে, আমরা সেটা নিয়েও ভাবতে বলি।

একই সঙ্গে দেশীয় গণমাধ্যম শিল্পকে যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে পারার সক্ষমতা ও মানসিকতাও অর্জন করতে হবে। টিকে থাকতে হলে এর বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে 'পে চ্যানেল' বা 'পে ওয়াল' চালু করা যেতে পারে। তবে ওই পর্যায়ে উত্তরণের আগে বাড়াতে হবে গুণগত ও কারিগরি মান। অন্যথায় বিদ্যমান ভারসাম্যও বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা সবসময়ই প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পক্ষে; কিন্তু সেটা দেশীয় আইন ও বৈশ্বিক রেওয়াজ মেনে।