আমরা মূল্যবোধ নিয়ে অহরহ কথা বলছি। একটা সমাজে যখন মূল্যবোধের ধস নামে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব কতটা ভয়াবহ হয়ে ওঠে, এর অনেক নজির আমাদের সামনে রয়েছে। ধর্ষণ এর একটি মাত্র দৃষ্টান্ত। ৬ অক্টোবর সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়া আনসার ক্যাম্প এলাকার বাসা থেকে রাগ করে বের হয়ে দুই কিশোরী স্থানীয় বখাটে চক্রের খপ্পরে পড়ে। ঢাকার সদরঘাট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে আটকে রেখে তাদের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। ওই কিশোরীরা নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়। এর পর ডিবি পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।

ধর্ষণের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই প্রকাশিত-প্রচারিত হচ্ছে। ঘটনাগুলো আমাদের সামনে প্রশ্ন দাঁড় করায়- এ কোন অন্ধকার সমাজকে গ্রাস করছে? আমরা জানি, ধর্ষণের ব্যাপকতা বেড়ে যাওয়ায় সরকার চূড়ান্ত দণ্ডের বিধান রেখে আইন করে। বাস্তবতা হলো, এর পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণসহ নানামাত্রিক নারী নির্যাতনের মতো অপরাধের লাগাম টানাই যাচ্ছে না। বিদ্যমান পরিস্থিতি সাক্ষ্য দেয়, সমাজে নারীর নিরাপত্তাহীনতা নিশ্চিত তো হচ্ছেই না, উপরন্তু সমাজবিরোধীরা কৌশল পাল্টে অপরাধ করেই চলেছে। এ কলামেই লিখেছিলাম, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব মুখ্যত এর জন্য বহুলাংশে দায়ী। কেন ঘটছে ধর্ষণের ঘটনাগুলো? সংকটটা আসলে কোথায়? এর সোজাসাপটা উত্তর- বিকৃত মানসিকতা যেমন দায়ী, তেমনি সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ না হওয়াও সমভাবে দায়ী।

অনস্বীকার্য, গত এক দশকেরও বেশি সময়ে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, এই উন্নয়নের সঙ্গে যদি মানবিক বোধের সমুন্নত ধারণা সমাজের মানুষের মধ্যে না থাকে, তাহলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। প্রশাসনের স্তরে স্তরে যারা দায়িত্বরত তারা যদি নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে নির্মোহ ও কঠোর না হন, তাহলে সমাজের মানুষ এর সুফল পাবে কী করে? ধর্ষণসহ নানাভাবে নারী নির্যাতনের সঙ্গে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কারও কারও সম্পৃক্ততার খবর শুনি তখন শুধু বিস্মিত নয়, সঙ্গতই আমাদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। এমন প্রেক্ষাপটে বলা যায়, এর আগে যেসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে হয়তো এ বর্বরতা বন্ধ করা যেত। ব্যতিক্রমী কয়েকটি ঘটনা বাদ দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নানা জটিলতায় ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলার বিচার প্রক্রিয়ার গতি অত্যন্ত মন্থর। আমরা জানি, মামলা সাজানো, গঠন, তদন্ত প্রতিবেদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে যদি গলদ থাকে তাহলে অভিযুক্তদের পার পাওয়ার রাস্তা তৈরি হয়।

এও সত্য, অনেক ঘটনা থেকে যায় অন্তরালে। সাধারণত আমাদের নিকটতম কেউ আক্রান্ত হলে আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাই। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা ও দাবি, ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যূথবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়া, এমন মামলার দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সবার যথাযথ ভূমিকা এবং দণ্ডিতের দণ্ড দ্রুত কার্যকরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যত্যয় ঘটছে। শিশুরা পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। তাদের হত্যা করা হচ্ছে। কোনো কোনো সংস্থা বা সংগঠনের জরিপে যখন উঠে আসে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তখন এ প্রশ্নই তাড়া করে- আমরা মনুষ্যত্ববোধের চেতনায় কতটা পিছিয়ে আছি? এমনটি তো রক্তমূল্যে অর্জিত বাংলাদেশে চলতে পারে না। আমাদের চিৎকার করে সমস্বরে বলতে হবে- মানুষরূপী কোনো দানবের বসবাস মানব সমাজে হতে পারে না।

আমি আর্থসামাজিক প্রতিরোধের জায়গায় ব্যক্তির মূল্যবোধ পুষ্ট করার বিষয়টি পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষরূপে দেখি। যখন সংবাদমাধ্যমে দেখি, ৬০ বছরের এক লোক শিশু ধর্ষণ করেছে, তখন আরও বেশি ক্ষোভের জন্ম দেয়। আমার প্রশ্ন- তার নৈতিকতা, বয়স কিংবা ধর্মীয় অনুভূতি কেন তাকে কুকর্ম থেকে নিবৃত্ত করতে পারল না? এমন প্রশ্ন আরও আছে এবং এসব প্রশ্নের উত্তর জটিল নয়। আমরা দেখছি, কোনো রাজনীতিক বা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী দুস্কর্ম করে সমাজে দাপিয়ে বেড়ায়। এ হলো রাজনীতির নামে যারা অপরাজনীতির চর্চা করে, এরই ভয়াবহ বিরূপ ফল। কারণ, এ অপরাজনীতির চর্চাকারীদের বাহুবল, অস্ত্রবলসহ নানা রকম বল বা শক্তি প্রয়োজন। দেশ-জাতির সামগ্রিক স্বার্থ ও প্রয়োজনে সর্বাগ্রে এ ক্ষেত্রে মনোযোগ গভীর করতে হবে রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের। প্রতিটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের এ ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে মনেপ্রাণে। দুস্কর্মকারীরা রাজনীতির ছায়াতলে থাকতে পারে না। জনকল্যাণের অপর নাম যদি হয় রাজনীতির মূলমন্ত্র, তাহলে এই দুস্কর্মকারী, সমাজবিরোধী কিংবা হীনস্বার্থবাদীদের প্রতিপালন করে কি রাজনীতির মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করা যাবে?

নাগরিক হিসেবে আমাদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের ব্যাপারেও সজাগ হতে হবে; সোচ্চার থাকতে হবে। সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সবাই যদি অপরাধ ও অপরাধীচক্র নির্মূলে উচ্চকণ্ঠ হই তাহলে আশা করা যায়, ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। দুস্কর্মকারী যে বা যারাই হোক তারা দেশের শত্রু; সমাজের শত্রু। তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বয়কট করতে হবে। প্রশাসন ও সমাজ যৌথভাবে এমন উদ্যোগ নিতে পারে, যাতে তাদের মধ্যে ভয় জাগে। একই সঙ্গে এও বলতে চাই, সব প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাই নিতে হবে আইনি পন্থায়। বিশ্বে এমন অনেক নজির আছে, বেআইনিভাবে অপরাধ দমন করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়েছে। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ইত্যাদি নিয়ে নাগরিক সমাজে অহরহ কথা হয়। তারপরও দূর হয় না অন্ধকার। কারণ, যার বা যাদের ওপর জননিরাপত্তা কিংবা জনঅধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে তার বা তাদের অনেকেরই কর্তব্য পালনে দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এর নিরসন করতেই হবে। জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সবারই দায়বদ্ধতা-জবাবদিহির বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখতে হবে। ভুলে যাওয়া যাবে না- ব্যক্তি কোনো একক সত্তা নয়; ব্যক্তি সামাজিক সমষ্টিরই অংশ।

সংবাদমাধ্যমে এও দেখি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতিতা থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে উল্টো বিপাকে পড়েন। আমাদের মনে আছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাতের কথা। সে যখন ওই মাদ্রাসারই অধ্যক্ষ কর্তৃক নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছিল, তখন সে অভিযোগ নিয়ে সংশ্নিষ্ট থানায় গিয়েছিল। সেখানে সে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এর মর্মন্তুদ পরিণতিও আমরা জানি। পৈশাচিক কায়দায় শিক্ষাঙ্গনে তাকে হত্যার আয়োজন করা হয়! নুসরাত হত্যার দ্রুত বিচার হয়েছে। অপরাধী দণ্ডিত হয়েছে। কিন্তু অন্য কয়টি ঘটনার ক্ষেত্রে স্বস্তির দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে? প্রতিকার কিংবা বিচার না পেয়ে অপমান-লজ্জায় কোনো কোনো ভুক্তভোগী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে, এমন মর্মন্তুদ দৃষ্টান্তও আমাদের সামনে আছে। এমনটি হতো না যদি আইনের প্রায়োগিক দিক কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সমাজে প্রতিপালিত হতো। এর দায়-দায়িত্ব যাদের তারা কোনোভাবেই থাকতে পারেন না জবাবদিহির বাইরে। মানবিক সমাজ গঠনে প্রত্যয়ী হতেই হবে। শুভবোধসম্পন্ন সবার মুষ্টিবদ্ধ হাত একত্র করে রুখে দাঁড়ালে শুধু ধর্ষক কেন, যে কোনো সমাজবিরোধীই হাত গোটাতে বাধ্য হবে। পাল্টাতে হবে সমাজের একাংশের দৃষ্টিভঙ্গি। তার সর্বাগ্রে দায় সরকার ও প্রশাসনের। ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকেই বার্তা দিতে হবে- ধর্ষক তোমার রেহাই নেই।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রজস্নাত বাংলাদেশ দুর্বৃত্তদের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে থাকতে পারে না। আমাদের সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে-ডাকে একাত্তরের আত্মদান ও ত্যাগে যে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশকে কিছু কুচক্রী, ক্ষমতালোভী, একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রেতাত্মা পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। সেই যে শুরু হয়েছিল অনাচার; এর সূত্র ধরেই বাংলাদেশ-বিরুদ্ধ অপশক্তি নিজেদের লাভালাভের হিসাব কষে 'নষ্ট'দের বেড়ে ওঠার সুযোগ অবারিত করে দেয়। আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে 'নষ্ট'দের মূলোৎপাটন করতেই হবে।

কথাসাহিত্যিক