শরৎকালে মানুষের (বাঙালির) মন চনমনে, চোখে-মুখে স্ম্ফূর্তি, আনন্দ প্রকাশিত। অন্তত ভাবেচক্করে। চৈত্র-বৈশাখে গাগতরে আগুন, আষাঢ়-শ্রাবণে মন ভারি, বিষণ্ণ। বসন্তে প্রেম-বিরহ, বুক টোল খায়। চিন চিন ব্যথাও করে। তাও সুখ। সখী বা সখা 'কাহারে বলিব এ কথা।' রবীন্দ্রনাথ অবশ্য যখন শ্রাবণে লিখবেন 'এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরিষায়।' তা যতই বলুন, শরৎ-হেমন্তের ধারেকাছে নেই বাংলার অন্য ঋতু। ভাবুন কত শান্ত! নবান্ন। নতুন ধানের গন্ধ। চাল। পায়েস। এন্তার পিঠে। মুড়ি। খৈ। মুড়কি। কৃষকের মুখে হাসি। সারা বছরই তো দুর্ভাবনায় ম্লান। কাশফুলের মোহনীয় রূপে বাঙালির যে দীপ্তি, কোথায় পাবো? কোন দেশে?
শরৎ বঙ্গীয়দের মিলনকালও। নানা অভিধায়। নানা সংযোগে। নানা আচারে, এথনিক কালচারের পরম্পরায়। পুজোও একটি অংশ। দেশ ভাগের বহু-বহু-বহু বছর আগে থেকেই। ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা জোর পায়নি খুব। দেখেছি পাবনায়।
আমাদের পাবনায় দোহারপাড়ায়, আব্বার জমিদারির জবরদস্ত লাঠিয়াল ছিলেন একজন, আসল নাম কী অজানা, অগ্রজ-অগ্রজাকুলও জানতেন না অতীব বৃদ্ধ হলেও সটান চলাফেরা যে কোনো উঠতি যুবকও তার কাছে কাবু, তাকে বলতুম, 'সাপুড়েদাদা'। গোটা পাড়ায় সম্বোধিত। রহস্য অজানা। জিজ্ঞেসও করিনি কাউকে। দরকারও নেই। দাদার পরিচয় দাদা।
কার কাছে শুনেছিলুম একবার, চোখবুজে হাতে-পায়ে যে কোনো সাপ, হোক তা যতই বিষাক্ত, ভয়ংকর, 'খপ করে ধরতেন'। এই কিংবদন্তি থেকে সম্ভবত লাঠিয়ালের তকমার বদল, লোকমুখে 'সাপুড়েচাচা'। আমাদের 'সাপুড়েদাদা'।
শুনেছি তার কণ্ঠে (৯২ বছর বয়সে একটি দাঁতও পড়েনি, চুল অবশ্য কিছু পাকা। হাত-মুখ-পেশি, গাগতর টানটান) 'তোদের মা-চাচিরা ঈদে এবং দুর্গো পুজোতেও নতুন শাড়ি পেত। এই ছিল তখনকার দিনে আমাদের হিন্দু-মোছলমানের মহব্বত। তোদের বাপ গরিব হিন্দুদের শাড়ি দিত। ছাওয়াল পলের জামাকাপড়ও। সেই দিন আর নেই রে। ভারত কেটেকুটে হিন্দু-মোছলমানের দেশ হয়েছে। হিঁদুরা পালিয়েছে।' প্রত্যেকে নয়। এখনও জন্মভিটে দেশ কামড়ে বহু হিন্দু। স্বভূমির নাগরিক। যারা গেছেন, তারাও বলেছেন দেশ? না।
কলকাতায়, পশ্চিমবঙ্গের নানা অঞ্চলের পুজোয় দেখি হিন্দু-মুসলিম একত্রে, একই মণ্ডপে, একই শামিয়ানায়। ভেদাভেদ নেই। সৌহার্দ্য, পারস্পরিক মিলন। কলকাতার পার্ক সার্কাসে অন্তত দু-তিনটে পূজামণ্ডপের আয়োজক মুসলিম। রাজাবাজারে, মেটিয়াবুরুজে, খিদিরপুরেও।
ভেদাভেদ বিদেশে আরও কম। বরং মুসলিম ছাড়া পুজো আদৌ জমজমাট নয়। বাংলাদেশের মুসলিমদের কথা বলছি। বিদেশে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর চেয়ে বাংলাদেশি মুসলিম দশ গুণ বেশি। পুজো অনুষ্ঠানে জনসমাগম কমতি হলে আকর্ষণও কম।
পুজো কমিটির আয়োজকরা ফোন করে বললেন, 'অবশ্যই আসবেন, না এলে জমজমাট হবে না।' কেন যান? বার্লিনের পুজো কমিটির একজন কর্তা বলেন, 'ওঁরা জিজ্ঞেস করেন, কী কী খাবার থাকবে? গানবাজনা আছে তো? বিনে পয়সায় খাওয়ার। কেউ ইচ্ছে হলে ডোনেট করে। না করলেও বাধ্যবাধকতা নেই। দুর্গাপূজা সর্বজনীন। মেলামেশা, মিল-মহব্বত, সৌহার্দ্য আসল। হিন্দু-মুসলিমের পরিচয় নেই।'
থাকলেই বিপদ। বাঙালির এথনিক কালচারে প্রশ্ন। ধর্ম বাহুল্য। কতটা বাহুল্য, বার্লিনের এই প্রজন্মের হিন্দুবঙ্গীয়কুল নস্যাৎ করেছেন। বয়স্করা পুজো কমিটি থেকে দূরে, দায়িত্বে তরুণ-তরুণী। তাদের আন্তর্জাতিকবোধে মানবতার ধর্ম গৌণ। অনুষ্ঠান, আনন্দোৎসব-মেলা জরুরি। বিস্তর বিদেশি তরুণ-তরুণীর সমাবেশ। কেউ খ্রিষ্টান। ইহুদি। বঙ্গীয় হিন্দু বাঙালির এই প্রজন্মের বন্ধুবান্ধব। তোয়াক্কা করে না ধর্ম। আসল কথা উৎসব। হৈ হুল্লোড়। সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া। সব মিলিয়ে মহার্ঘ্য।
বার্লিনে দুই পুজো। আগে ছিল না। দুই পুজোই তরুণ তথা এই প্রজন্মের কবজায়। ওদের কাছে বাঙালির মিলনই মুখ্য। উপলক্ষ পুজো।
বয়স্কদের যেমন, এই প্রজন্মেরও দুঃখ, দুর্গার ভাসান নেই। জলে ডোবানোও নিষেধ। প্রকৃতি পরিবেশ জল দূষিত হবে। অপরাধ। জরিমানা। কী করণীয় তবে? বিসর্জনের আগে মা দুর্গার শরীরে জল ছিটিয়ে আর্তনাদ :'মা, আসছে বছরে এসো।' মা চলে যান বার্লিন এথনিক মিউজিয়ামে বা কারোর ব্যক্তিগত সংগ্রহে। পুরোহিত বলেন :আবার দেখা হবে। দেখার অপেক্ষায় একটি বছর অপেক্ষমাণ। দুই বাংলার বাঙালি। পুজোর নামে দিনকয়েক আনন্দ। মিলন। সমাবেশ। বিদেশে হিন্দু-মুসলিম বাঙালির এও এক কালচার। অসাম্প্রদায়িক। সহমর্মিতার এথনিক কালচার।
কবি