অনিন্দ্য রায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। কম্পিউটার স্যায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পড়ালেখা শেষ করে অনিন্দ্য এখন উদ্যোক্তা। সম্প্রতি 'আলফা ব্রেন ল্যাব' নামে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ছেলেটা। কাজ ইতিবাচক মানুষ তৈরি করা। জানতে চাইলাম, তোমাদের সময় কেমন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়? এখন কেমন আছে? অনিন্দ্য অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী উত্তরে বলল, স্যার, সংকট কিছু ছিল। এখনও হয়তো আছে, কিন্তু আমার বিশ্বাস, উত্তরাঞ্চলকে একদিন সত্যি বদলে দেবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। অনিন্দ্য আমার শ্রেণিকক্ষের ছাত্র। সে ও তার মতো অনেকের আবেগ সবসময় আমাকে তাড়িত করে।
রুস্তম বেরোবির দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে পড়ত। এখন পলাশবাড়ী সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করে। ৩৫তম বিসিএসে প্রথমবার এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে চারজন ক্যাডার পদে যোগদান করে, রুস্তম তাদের একজন। অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষক সংকটসহ জন্মকালীন নানান সীমাবদ্ধতার কথা বললেও রুস্তম বলতে ভুলল না, এই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তারও একটি স্ব্বপ্টম্ন আছে। সে খুব করে চায়, এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশসেরা হোক। গর্ব নিয়ে সে যেন নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিতে পারে।
কথা ও মাইশা দু'জনই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী। কথা পড়ে ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে, আর মাইশা ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞানে। কথা বলছিল, 'স্যার, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে খুব স্পর্শ করে। বাইরে থেকে কেউ বেড়াতে এলে তারাও খুব পছন্দ করে। আমার বিভাগে কোনো সেশনজট নেই।' কথার স্বপ্টম্ন, ও শিক্ষক হবে। ও খুব করে চায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এ প্রতিষ্ঠানেই কর্মক্ষেত্র বিশেষভাবে উন্মুক্ত হোক। মাইশা জানাচ্ছিল, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বিশ্ববিদ্যালয় জীবন।
মাইশার ইচ্ছা, সময়মতো সে যেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে পারে। মাইশাও শিক্ষক হতে চায় অথবা অন্য কোনো ক্যাডার পেশা। এভাবেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর স্বপ্টম্নজুড়ে একটি ভূখণ্ড, তার নাম বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। আজ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন।
রংপুরের মানুষের হৃদয়ের খুব গভীরে জন্ম এ বিশ্ববিদ্যালয়ের। এ অঞ্চলের মানুষ বহুদিন তাদের স্বপ্নে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে লালন করেছে। তার জন্য আন্দোলন করেছে; সফলও হয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় তারই বাস্তব রূপ। ২০০৮ সালে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক ব্যতিক্রমী আঞ্চলিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়- একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে রংপুরে। নাম রাখা হয় রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সংসদের অবর্তমানে পাস হয় অর্ডিন্যান্স। তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। ৪ এপ্রিল ২০০৯ সালে স্বর্ণ অধ্যায় শুরু করে এ বিশ্ববিদ্যালয়। ১২ জন শিক্ষক ও ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় এক স্বপ্টম্নযাত্রা। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস। আজ বেরোবি ১৩ পেরিয়ে ১৪-তে পা রাখল।
রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্সটি সংসদে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ২০০৯ আইন নামে পাস হয়। কার্যকর হয় ১২ অক্টোবর ২০০৮ থেকে। রংপুর শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত দুটি ভবনের ময়লার স্তূপ সরিয়ে শুরু হয়েছিল এর একাডেমিক কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য দুটো ছোট্ট কাঠের টেবিল জোড়া দিয়ে অফিস করেছিলেন। অতীতের সেই জীর্ণতা নিয়ে ভাবলে আজকের প্রাপ্তির খাতা একেবারে শূন্য নয়। অনেকটা পথ এগিয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

একসময় বেরোবি ক্যাম্পাসে আলু চাষ হতো, মুলা চাষ হতো। ছেলেরা বিকেলে খেলত। বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণের শুরুতে এটি হয়ে পড়েছিল একরকম মরুভূমি। কোনো গাছ নেই। ছায়া ছিল না। চারদিক কেমন যেন খাঁ-খাঁ করত। আজ সে অবস্থা বদলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ অনেকের সহযোগিতায় এ প্রাঙ্গণে রোপণ করেছেন কয়েক হাজার প্রজাতির চারা। সেসব চারা এখন বড় হয়েছে। ছায়া দিচ্ছে। এখন পুরো ক্যাম্পাস সবুজ। সংস্কৃতিচর্চায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। গড়ে উঠেছে বেশ কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সম্পদ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। শ্রেণিকক্ষ ও এর বাইরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনন্য সম্পর্ক এ বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিদিন এক ঈর্ষণীয় উচ্চতার নিয়ে যাচ্ছে।
মাত্র ১৩ বছরের পথচলায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন অনেক বড়। কোনো কোনো বিভাগ থেকে ইতোমধ্যে সাত-আটটি ব্যাচ বেরিয়ে গেছে। তারা নিজেদের জ্ঞানের আলোয় প্রদীপ্ত করেছে। এখন আলো ছড়াচ্ছে দেশে, আবার কেউবা বিদেশে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের যা কিছু সংকট তা একদিন কাটবে; অন্ধকার একদিন ঘুচবে- এ স্বপ্নম্ন দেখার সাহসই বোরোবির সবচেয়ে বড় সম্পদ। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দুর্বার ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলন এখানকার মূল শিক্ষা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শেখাই এখানকার শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা। এ শিক্ষাই এক দিন তাদের সত্যিকারের মানুষ করে তুলবে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়া উচিত শিক্ষার্থী ঘিরে। হওয়া উচিত শিক্ষার্থীবান্ধব একটি বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তা সবসময় হয়ে ওঠেনি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের দরকার একটি যোগ্য নেতৃত্ব, একজন নিবেদিতপ্রাণ উপাচার্য। গত ১৪ জুন অধ্যাপক ড. মো. হাসিবুর রশীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেছেন। তার কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। আশা করি, তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন যোগ্য অভিভাবক হয়ে উঠবেন। কোনো একটি পক্ষের নয়, সবার উপাচার্য হয়ে উঠবেন। যোগদান করেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বিতর্কিত ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস বন্ধ করেছেন। বন্ধ পরীক্ষাগুলো চালু করেছেন। দ্রুত ফল প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয়ই তার এসব উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তার সব ভালো উদ্যোগ অব্যাহত থাকুক এবং তিনি সবার প্রিয়ভাজন হয়ে উঠুন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি সংকটগুলো নিয়েও তিনি নিশ্চয় ভাববেন, কাজ করবেন। শিক্ষক সংকট দূর করা, শিক্ষকদের গবেষণামুখী করা, অবকাঠামো নির্মাণে গতিশীলতা আনা, নতুন একাডেমিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণসহ শ্রেণিকক্ষ সংকটের সমাধানের পথ তিনি নিশ্চয় খুঁজে বের করবেন। মূলত সবখানে নিয়মের সঠিক পরিপালন করতে পারলেই এ বিশ্ববিদ্যালয় যথাযথ পথ খুঁজে পাবে বলে আমরা আশাবাদী।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষার্থীদের জন্য। এটি পরিচালিতও হওয়া উচিত তাদের কল্যাণে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কর্মকাণ্ড হোক শিক্ষার্থীবান্ধব। শুভ জন্মদিন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

faruque1712@gmail.com