যানজট সমস্যা নতুন কোনো বিষয় নয়। বর্তমানে যানজটের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষও এখন এ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন দু'শ বছর আগেই। ১৮২৫ সালে যখন বাষ্পচালিত রেলগাড়ির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় তখন থেকেই একটা বিষয় বিজ্ঞানীদের নজরে আসে। তারা লক্ষ্য করলেন, যন্ত্রচালিত একটি বাহনকে চলার সুযোগ দিতে গিয়ে অন্য একটি বাহনকে থামিয়ে রাখতে হয়। তখন থেকেই তারা সচেষ্ট ছিলেন, কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই দীর্ঘ সময়ে এসেছে অনেক পদ্ধতি। কিন্তু কোন পদ্ধতি কতটা কার্যকর কিংবা আদৌ কার্যকর কিনা- সে প্রশ্ন রয়ে গেছে আজও।
সড়কপথের যানজট নিরসনে সারাবিশ্বে বেশ কয়েকটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- একমুখী রাস্তা, রিং রোড বা চক্রাকার পথ, গোলচত্বর, উড়ালপথ, পাতালপথ, সুড়ঙ্গপথ ইত্যাদি।
একমুখী রাস্তা, রিং রোড বা গোল চত্বর- এসব তৈরি করা হয় ভূপৃষ্ঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব থেকে কিছুটা উপকার পাওয়া গেলেও যানজট থেকে পুরোপুরি মুক্তিলাভ হয়নি। আর এগুলো সব জায়গায় সব সময় তৈরির বাস্তব অবস্থাও থাকে না। ফলে যানজট সমস্যাও দূর হয় না।
মাটিতে থেকে যখন সমস্যার কোনো সমাধান করা যায় না তখন চিন্তা করা হয় মাটির নিচ দিয়ে এবং মাটি থেকে ওপরের দিকে বিকল্প রাস্তা তৈরি করা যায় কিনা। এমন চিন্তা থেকেই চলে এসেছে উড়ালপথ, পাতালপথ কিংবা সুড়ঙ্গপথ। যদিও রেললাইনের ক্ষেত্রে উড়ালপথ ও পাতালপথ অনেক আগে থেকেই ছিল। পৃথিবীর ক্ষমতাবান ও সামর্থ্যবান রাষ্ট্রগুলো নির্মাণ করেছে বহুতলবিশিষ্ট উড়ালপথ, পাতালপথ বা সুড়ঙ্গপথ। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য দেশেও উড়ালপথ, পাতালপথ তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। এত বিশাল স্থাপনা তৈরির মতো যেসব দেশের সামর্থ্য নেই তারা ঋণ নিয়েও তৈরি করল এসব স্থাপনা। এ দিয়ে চলে মোটরগাড়ি, রেলগাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। এবার বুঝি মুক্তি মিলবে যানজট থেকে। কিন্তু না। মুক্তি মেলেনি। মাটির নিচে কিংবা ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে তৈরি এসব রাস্তা থেকে মানুষকে এক সময় ভূপৃষ্ঠে চলে আসতেই হয়। আর ভূপৃষ্ঠে এলেই তৈরি হয় যানজট। কাজেই ভূপৃষ্ঠের রাস্তাকে যানজটমুক্ত করতে পারলেই যানজট থেকে প্রকৃতপক্ষে মুক্তি মিলবে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে, ভূপৃষ্ঠে এবং মাটির নিচে বিভিন্ন ধরনের রাস্তা ও স্থাপনা নির্মাণ করেও কোনোভাবে যখন যানজট নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না, তখন খোঁজ করা হচ্ছিল নতুন কোনো পদ্ধতির, যা দিয়ে প্রকৃতপক্ষেই যানজট থেকে মুক্তি মিলবে। খোঁজাখুঁজির এ মিশন থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশও। সে সময় যানজটের স্থায়ী ও দ্রুততম সমাধান নিয়ে আমি গবেষণা করতাম। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আমার প্রস্তাবিত 'টার্নিং ইয়ার্ড' পদ্ধতিটি পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। উত্তরা বিমানবন্দর এলাকায় এটা বাস্তবায়নের জন্য বলা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরায় যানজটের সবচেয়ে ভয়াবহ স্থান জসীম উদ্‌দীন মোড়কে টার্গেট করে পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়।
টার্নিং ইয়ার্ড হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে গাড়ি তার গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। রাস্তার ওপরে নির্মিত এই টার্নিং ইয়ার্ডের মধ্য দিয়ে যখন কোনো গাড়ি ঘোরে তখন অন্য কোনো গাড়ির চলাচল বিঘ্নিত হয় না। যানজট নিরসনে এটি ব্যবহূত হয়। টার্নিং ইয়ার্ডের বেশ কয়েকটি প্রকরণ রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- এল ইয়ার্ড, মডারেট টার্নিং ইয়ার্ড, টারশিয়ারি টার্নিং ইয়ার্ড, ফোর্থ জেনারেশন টার্নিং ইয়ার্ড, ফিফ্‌থ জেনারেশন টার্নিং ইয়ার্ড ইত্যাদি। প্রতিটি প্রকরণ আবার কতগুলো উপবিভাগে বিভক্ত। বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যেখানে যে প্রকরণ উপযুক্ত সেখানে সেটা তৈরি করা হয়।
টার্নিং ইয়ার্ড হলো যানজটের সবচেয়ে দ্রুততম ও টেকসই সমাধান। যানজট নিরসনে প্রচলিত যে পন্থাগুলো অবলম্বন করা হয় কিংবা যেসব স্থাপনা তৈরি করা হয় সেগুলো নির্মাণ করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। প্রচুর অর্থ ব্যয় হয় এবং জনভোগান্তি বাড়ে। টার্নিং ইয়ার্ড তৈরিতে এর কোনো ঝামেলাই নেই। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একেকটি টার্নিং ইয়ার্ড তৈরি করা যায়। আন্তরিকভাবে কাজ করলে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ঢাকা শহরের উল্লেখযোগ্য অংশকে টার্নিং ইয়ার্ডের মাধ্যমে যানজটমুক্ত করা সম্ভব। অনেক স্থাপনার নির্দিষ্ট একটা লাইফ টাইম থাকে। এর পর সেটা ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় এবং পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ওজন বহনের কারণে অনেক সময় কোনো কোনো স্থাপনা আবার অল্প সময়েই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে এবং ব্যবহারের উপযোগিতা হারায়। কিন্তু টার্নিং ইয়ার্ডের ক্ষেত্রে তেমন কিছু নেই। এটা মূলত ভূপৃষ্ঠে নির্মিত রাস্তারই একটা অংশ। কাজেই এখানে তেমন কোনো ঝুঁকি নেই। কোনো কারণে রাস্তাটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে টুকটাক মেরামতের মাধ্যমে ঠিক করে নেওয়া যায়। এভাবে এটা বহু বছর পর্যন্ত টেকে।
টার্নিং ইয়ার্ড নির্মাণের পর জসীম উদ্‌দীন মোড়ের অবস্থা পুরোপুরি পাল্টে গেছে। মোড়টি এখন যানজটমুক্ত। এখানে আগের মতো জ্যামে পড়ে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। এখন মানুষ গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় টেরও পায় না, কখন সে জসীম উদ্‌দীন মোড় পার হয়ে গেছে! এখানে টার্নিং ইয়ার্ডগুলো তৈরি করা হয়েছিল পরীক্ষামূলক। নতুন টার্নিং ইয়ার্ডগুলোকে আরও দৃষ্টিনন্দন ও গতিশীল করা সম্ভব।
বিমানবন্দরের দক্ষিণ দিকে কাওলা নামক স্থানে তৈরি করা টার্নিং ইয়ার্ডটিও চমৎকার কাজ করছে। এখানেও কোনো গাড়িকে থামতে হচ্ছে না। না থেমে যে যার মতো যেদিকে প্রয়োজন চলে যাচ্ছে। কোনো যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে না। এ পদ্ধতি শহরের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সেগুলোও যানজট থেকে মুক্ত হবে।
পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যারা অঢেল অর্থের মালিক। আমাদের অবস্থা তাদের মতো নয়। কম ফলদায়ক কিংবা পরিত্যক্তপ্রায় কোনো প্রযুক্তির পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করা আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অপচয় কিংবা বিলাসিতার শামিল। অল্প খরচে দ্রুততম সময়ে যেখান থেকে অধিক ফল আসে, সেটাকেই আমাদের বেছে নেওয়া উচিত। টার্নিং ইয়ার্ড হতে পারে এমনই একটি ক্ষেত্র।
প্রকৌশলী ও গবেষক
enkamrul@gmail.com