পাকিস্তান ছিল একটি আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্র ভেঙেছি। আমাদের নতুন রাষ্ট্রের আর যাই হোক পুরাতন রাষ্ট্রের মতো হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু পশ্চাৎমুখো গতিতে আমরা আবার সেখানেই চলে গেছি, যেখান থেকে শুরু করেছিলাম। অবিকল নয়, অবিকল প্রত্যাগমন ঘটছে না কখনও; ঘটার উপায় নেই। কিন্তু অনেকটাই বটে।
একাত্তরে পাকিস্তানের বাঙালি আমলাতন্ত্র কোন পক্ষে ছিল? ব্যক্তিগতভাবে কোনো কোনো আমলা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই ছিলেন। কেউ কেউ চলেও গিয়েছিলেন মুজিবনগরে, বিশেষ করে তারা, যারা কর্তব্যরত ছিলেন সীমান্তের কাছাকাছি শহরগুলোতে; কিন্তু এরা ব্যতিক্রম। বেশির ভাগ আমলাই এবং আমলাতন্ত্র তো বটেই, ছিলেন পাকিস্তানের পক্ষেই। সেটাই স্বাভাবিক। কেননা, সে আমলাতন্ত্র তো পাকিস্তানি রাষ্ট্রেরই অংশ, তারই বশংবদ এবং সেই অবস্থানে তার বাঙালি-অবাঙালি বিভাজনটা ছিল অবাস্তব। বাঙালি আমলাতন্ত্র বলে আলাদা কিছু ছিল না; সবটাই ছিল পাকিস্তানি।
পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্যের পেছনে বেতন-ভাতা ছিল। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ না মোটেই। বেতন-ভাতার চেয়ে বেশি ছিল উপরি, আরও ছিল ক্ষমতার অংশভাগ। অন্ধকারে বিদ্যুতের মতো জ্বলজ্বল করত ক্ষমতার অহংকার। শীতের দিনে উষ্ণ পোশাকের মতো সুখ দিত তাদেরকেও যারা ছিল ভদ্র কিসিমের, আর যারা উগ্র ও উদ্ধত তারা তো ছোঁকছোঁক করত সর্বদাই, হুঙ্কার দিত থেকে থেকে, হামলা করত নিরাপদ বোধ করলে। এমনকি বায়ান্নতেও তো দেখেছি আমরা- উচ্চশিক্ষিত বাঙালি আমলা গুলি চালানো থেকে মিথ্যা প্রেসনোট লেখা পর্যন্ত সব কাজই করেছে। ঘৃণাভরে করেছে সব সময়- এমন যে বিশ্বাস করবে সে সাহস হয় না। অনেক সময় তো মনে হতো জনগণকে নিপীড়নের কাজ বেশ উপভোগ করেছে। উর্দি পরিহিত হোক কি, না হোক; রাষ্ট্রের সেবা করেছে তারা খুব সুন্দরভাবে। আমি একজন কবিকে জানি, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দৃঢ়ভাবে জাতীয়তাবাদী হয়েছেন, একাত্তরেও ছিলেন অনেকটা, প্রকাশ্যে না হলেও; কিন্তু বায়ান্নতে যিনি ছিলেন উল্টোদিকে। তার মহকুমায় গুলি পর্যন্ত হয়েছিল, তারই হুকুমে। সে নিয়ে বলছিলেন যখন, গলার স্বরে তখন আত্মধিক্কার শুনতে পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। আমলাতন্ত্র মানুষকে মানুষ রাখে না। ইতর করে ছাড়ে।
পাকিস্তান হওয়ায় এই আমলাতন্ত্রের এক দফা লাভ হয়েছে। আমলারা পদোন্নত হয়েছেন। আগের তুলনায় একটি, দুটি, তিনটি, হয়তো তার চেয়েও বেশি ধাপ ভাঙতে পেরেছেন তারা, লল্ফম্ফ দিয়ে। তার চেয়েও বড় কথা, ব্রিটিশ সিংহরা সরে যাওয়ায় দেশি প্রাণীরা সিংহ হয়ে বসেছে। সেটা কম কথা নয়। কেউ আবার বাঘ হয়েছে। তাই বা কম কিসে! পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা প্রথম থেকেই ছিল বেসামরিক আমলাতন্ত্রের হাতে। পরে সামরিক আমলাতন্ত্র যখন ক্ষমতা দখল করে নিল, তখনও তাদের কোনো অসুবিধা হলো না; হঠকারী ছোট ভাইটির সঙ্গে বিজ্ঞ বড় ভাইয়ের মতো মিলেমিশে সবকিছু নিজের ও সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে অতিপরিচ্ছন্নভাবে ব্যবহার করতে থাকল। অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে এও প্রমাণিত হলো যে, সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আমলাতন্ত্রের কোনো বিরোধ তো নেই। প্রশ্নই ওঠে না থাকার, উল্টো যা আছে তা হলো নিবিড় আঁতাত। লক্ষ্য করার বিষয় যে, আমলাতন্ত্রকে নিরপেক্ষ মনে করা হয়, যার দরুন যখনই দেশে 'বিপ্লব' হয়, সে বিপ্লব সামরিক অভ্যুত্থানই হোক কি মধ্যবিত্তের অভ্যুত্থান হোক [১৯৭৫ কিংবা ১৯৯০-এর] তখন নিরপেক্ষ উপদেষ্টা দেখা যায় খুঁজে পাওয়া যায় ওই আমলাতন্ত্রের মধ্যেই। বিভ্রম সৃষ্টিতে আমলাতন্ত্র অতুলনীয়।


আমলাতন্ত্র সাতচল্লিশে মুনাফা করেছে, বায়ান্নতেও বিপদে পড়েনি; কিন্তু একাত্তরে কিছুটা পড়েছিল। অর্থাৎ তার একাংশ পড়েছিল। তবে পুষিয়ে নিয়েছে। যারা মুজিবনগরে গেছেন, কিংবা 'প্রমাণ' হাজির করতে পেরেছেন- গিয়েছিলেন, তারা অন্য আমলাদের ছাড়িয়ে গেছেন উন্নতিতে। আর যারা যাননি তারাও মুনাফা পেয়ে গেছেন। সেই সাতচল্লিশের মতোই। প্রায় অবিকল। সাতচল্লিশে ব্রিটিশভক্ত আমলাতন্ত্র ক্ষমতা পেয়ে গেল; বাহাত্তরে পাকিস্তানভক্ত আমলাতন্ত্র প্রথমে ক্ষমতার কাছাকাছি রইল, পরে অতিদ্রুত তারাই ক্ষমতার আসল চালক হয়ে দাঁড়াল। একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান সামরিক আমলাতন্ত্র ও তার বড় ভাই বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে। সেই লরেলহার্ভির কায়কারবার, যদিও কৌতুকের অর্থে নয়। রাষ্ট্র স্বাধীন। আমলাতন্ত্র তাই আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় স্বাধীন। ধন্য বাঙালি, তুমি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলে।
বায়ান্নর পরে পশ্চিম পাকিস্তানি লেখক একজন এক অনুষ্ঠানে বেশ ঘটা করে বলেছিলেন তার শ্রোতাদেরকে যে, তারাও আসলে আমাদের পথেরই পথিক। চমকে ওঠার মতো কথা বটে। কৌতূহল প্রকাশ করায় বলেছেন আমরা উভয়েই। পূর্ব যেমন পশ্চিমও তেমনই, ইংরেজবিরোধী। একই যুদ্ধ। শুনে মনে মনে হেসেছি আমি। বেচারা! ঐক্য চায়, দুই পাকিস্তানকে এক রাখার ইচ্ছা রাখে, তাই বলেছে ওই আন্তরিক কথাটা। বুঝতে চাইছে না যে, আমাদের ভাষার লড়াইটা ইংরেজির বিরুদ্ধে ছিল না; ছিল উর্দুর বিরুদ্ধে।
তা ছিল বৈকি। নিকট লক্ষ্যে উর্দুর বিরুদ্ধেই ছিল। কিন্তু সুদূর লক্ষ্যে ইংরেজিবিরোধীও ছিল বটে; আমরা খেয়াল করি চাই নাই করি, মানি আর নাই মানি। গণতন্ত্রের মধ্যে যেমন সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য থাকে প্রোথিত; না থাকলে গণতন্ত্র যেমন এগোতে পারে না, এবং সে গণতন্ত্রই থাকে না শেষ পর্যন্ত। আমাদের ভাষার সংগ্রামের ভেতরও তেমনি উর্দু-বিরোধিতা পার হয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল বাংলাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। যার অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো ইংরেজিকেও হটিয়ে দেওয়া। উর্দু হটিয়ে ইংরেজির খপ্পরে পড়ব; পাঞ্জাবি পুঁজিপতিদের বিতাড়িত করে বাঙালি পুঁজিপতিদের জন্য আসন-বাসন তৈরি করে দেব- এই অভিপ্রায়ে আমরা বায়ান্নর আন্দোলনকে একাত্তরের পরিণতিতে নিয়ে আসিনি, অপরিমেয় রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে। অথচ তাই তো ঘটেছে।
আমরা চলে গেছি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়, আমরা পড়েছি সাম্রাজ্যবাদের খপ্পরে। আমাদের পুঁজিবাদ আর ওই সাম্রাজ্যবাদের অধীন। এই সাম্রাজ্যবাদের ভাষা বাংলা নয়; হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এর ভাষা হচ্ছে ইংরেজি। সেই ভাষা আজ ওপরের তলায় চলে এসেছে। আর পুঁজিবাদী সমাজে ওপরে যা আসে, তাই তো নিচে চলে যায়। সে বর্জ্য উচ্ছিষ্ট হোক, আর ভাষাই হোক।
বাংলা ভাষা এখন মধ্যবিত্তের সেই অংশের মানসিক সম্পদ, যে অংশ রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে রয়েছে। আর এদের মধ্যেও যে সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা নেই ইংরেজি শেখার- তাও বলা যাবে না। পারলে শিখত, পারে না তাই শেখে না। সেই ইংরেজ যুগের অবস্থা। সে যুগে বাঙালি মুসলমান ইংরেজি শেখেনি। প্রচার করা হয়েছিল যে, কারণটা মনস্তাত্ত্বিক। অভিমান করে শেখেনি। রাজ্য হারানোর গভীর অভিমানে বাঙালি মুসলমান নাকি ইংরেজি ভাষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, খুব দৃঢ়ভাবে। অথচ আসল খবর এই যে, রাজ্য হারানোর জন্য অভিমানের প্রশ্নটাই সম্পূর্ণ অবান্তর। কেননা, রাজ্য না ছিল বাঙালির, না ছিল বাঙালি মুসলমানের। রাজ্য ছিল অবাঙালিদের হাতেই। যার অমাত্য ও বড় আমলা অধিকাংশই ছিল অবাঙালি। বাঙালি মুসলমানের ইংরেজি না শেখার প্রকৃত কারণ অর্থনৈতিক। তারা বড়ই গরিব ছিল। এ যুগে সে যে বাংলা শিখতে পারছে না, তার জন্য ওই একই দুর্বলতা দায়ী। তারা এখনও বড়ই গরিব। আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনি রয়েছে। আমলাতন্ত্রই 'স্বাধীন' হয়েছে; গরিব মানুষ স্বাধীন হয়নি। যারা সম্পত্তির মালিক হতে পেরেছে, তারা তো আর দেরি করছে না। ভীষণ বেগে ইংরেজি শিখছে। যেন এতদিন না শেখায় প্রায়শ্চিত্ত করছে। ধর্মীয় প্রায়শ্চিত্তের তুলনায় ইহজাগতিক প্রায়শ্চিত্ত যে প্রবল হয়, তা প্রমাণিত হচ্ছে- বুঝি।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়